গল্প  

লেজ   

অমিতকুমার বিশ্বাস

 

মানসে মল্লি পরে তার পরানডারে ঝুলায় ঢুকায় নিতি কালাপানা ম্যাঘ ওই আসমান থিক্কা নাইমা সু-উ-উ-উ-জা এই জমিনে চইলা আসে, হুলহুল! দিনিদুপুরি তখন দ্যাখবা মান্দারবনে আন্ধার ঘনাইচে। চাদ্দিকি কী বিষ্টি কী বিষ্টি! তাই মানসে মরতিচে ট্যার পালিই কলাম ম্যাঘ ছুইটা আসে। মরণের ঘিরান যারে কয়। কিন্তু হজ্ঞল টেমে ম্যাঘে হেই ঘিরান ট্যার পাবে হেইডা ভাবলি হবে নানে কলাম। মাঝে-মাঝে তারেও ট্যার পাওয়াতি হয়, বুজলা। আর তা পাওয়াতি গিলি গানবাজনা করবার লাগে। নাচাও লাগে। ‘আল্লাহ ম্যাঘ দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই,/ আল্লাহ ম্যাঘ দে…’ বলেই কালো এক জোব্বায় জুলফি ঝাঁকিয়ে নাচতে শুরু করে খালেক। রসিক ও আলতাফ শুনছিল হাঁ-করে। এবারে তারাও একহাত শূন্য ও অন্যহাত কোমরে রেখে শরীর দোলায়। এই উপভোগ্য দৃশ্যে পান্তার গামলা নিয়ে বাজাতে থাকে আরও দুই শ্রোতা, উনাই-গুনাই। তবে তারা আদৌ শুনতে পায় কি না কেউ জানে না। উনাইয়ের যদিও-বা দু-একটা কথা বোঝা যায়, গুনাইয়ের সবটাই অস্পষ্ট! দুজনেই নাকিসুর টানে। তবে এই নাচ দেখে বুঝতে পারে কীসে কোন তালের প্রয়োজন। তালে তালে দুজনে বাজাতে থাকে। গান চলে। নাচ চলে। ‘আল্লাহ ম্যাঘ দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই,/ আল্লাহ ম্যাঘ দে…’ চাষের মাঠের ভিতর তালগাছ-ঘেরা রাস্তায় এহেন দৃশ্যে দাঁড়িয়ে পড়ে আরও দু-একজন।

কিন্তু কোন মানসে মল্লি ম্যাঘ আসপেনে? গরিব না বড়নোক? বলে রসিক হালদার।

এই দুনিয়ায় মানসে কলাম ম্যালা। মরলিই হলোগে। তাতে আবার গরিব-বড়নোকের কী আচে? আলতাফ বলে।

অঁ অঁ  মঁ ওঁ লঁ ইঁ ইঁ  হঁ লঁ… বলে ওঠে উনাই।

অঁ অঁ অঁ উঁ উঁ উঁ…উনাইকে সমর্থন করতে প্রায় সবসময় এমনই ধ্বনি বার করে গুনাই।

ওই থাম! যেনো দুইখান ভূতি ডাহে। পাডার পো পাডা, অষ্টরম্পা, হুম্পাজুড়ে নাগাইচ্যাগা! খালি-খালি কি গেরামডার নাম ভূতনিপুর হইচে? খালেকের চিৎকারে সকলে থামে। শোন, কই কী, এই গেরামের থিক্কা নিদেন পক্ষে অ্যাকজনার মরবার চাই, হুলহুল! কিন্তু মরবে কিডা হেইডা কও দিকি আমারে?

আলতাফ ইয়া এক লাফ মেরে বলে, রসুলির বাপ?

না! জুলফি নাড়ে খালেক।

রসিকও ইয়া লাফ মারে, খগেনের ঠাউদ্দা?

না! ফের জুলফি নাড়ে খালেক।

রানির দেদমা? লাফায় আলতাফ! তর্জনী মহাশূন্যে।

না! খালেক বিরক্ত।

রসিকও তর্জনী ছোঁড়ে, ঘণ্টিবুড়ি?

না না না! এরা কেউ আসচে শীতির আগে মরবে নানে, হুলহুল! এমন ভাবে হাত-পা-লাঠি উঁচিয়ে বাবড়ি ঝাঁকিয়ে খালেক বলতে থাকে, যেন সে-ই সাক্ষাৎ ত্রিকালদর্শী! তাঁর চোখের দিকে তাকালেই বুঝি গোটা জীবন দেখা যায়। সে আরও বলে, শীত আসপে আর মানসে টপাস-টপাস কইরা ঝরবে, আলিপুকুরি সকালসন্ধে বোরোই ঝরার নাহান। তহন পাখি আইসা খপাৎ কইরা নে যাবেনে আসমানে। তারপর পরানগুলারে ঝুলাইয়া রাখপেনে ওইইইইই বুড়াবটের মগডালে। সকলের চোখ তখন খালেকের খ্যাংড়া তর্জনীর দিকে, যেন তাদের চোখের সামনে দূর-বটের মগডালের ঝুলন্ত আত্মারা জ্বলজ্বল করছে। ফের বলে, একদিন ম্যাঘ আইসা ছোঁ মাইরা উড়াইয়া নে যাবেনে অগো। তালি দ্যাখো তুমরা, পেত্থমে ছোট্ট পাখি, তারপরে ম্যাঘপাখি, এইভাবে উইড়া গ্যালো মানসের পরানপাখি। ‘পোষা পাখি উড়ে যাবে সজনী একদিন ভাবি নাই মনে…’

বাহ্‌ ওস্তাদ বাহ্‌! সুর থামলেই হাততালি দিয়ে লাফিয়ে ওঠে রসিক-আলতাফ।

কিন্তু এট্টা পাক্কা কতা কই, জগতে মানসে না-কমলি ম্যাঘ আর আগের নাহান আসপে নানে! হঠাৎ দু-হাত শূন্যে তুলে খালেক যেন দার্শনিক!

পাশে আরও দু-চারজন গ্রামচাষা দাঁড়িয়ে পড়েছে। সাইকেল থামিয়েছে। তারই একজন সদাপ্রশ্নবাদী আনসার মণ্ডল। সে-ই হঠাৎ ভীমরুলের চাকে ঢিলটা ছোঁড়ে। আইচ্চা খালেক, এট্টা কথা জিগাই— এই গাঁজাখুরি কিস্‌সাডা পাইচো ক’নে কোতি পারো আমারে?

চড়াত করে রেগে গিয়ে একটা কেটে-নেওয়া তালগাছের গোড়ায় উঠে দাঁড়ায় খালেক। হাতের লাঠিটা মহাশূন্যে। উচ্চগ্রামে বলে, গাঁজাখুরি? হে হে! এই রসিকভাই, আমাগো আনসারচাচা কী কয়?

শকুনির অভিশাপে গোরুর কবে আর কী হয়? রসিকের দু-হাত প্রসারিত, মাথা অবনত, যেন নবাবজাদাকে কুর্নিশ করছে সে।

চাচা আমার মাথায় থায়ে। তারে শকুন কওয়োন কি ঠিক হয়? না রে না, ঠিক না ঠিক না! একদম ঠিক না। আর এট্টাবারও এইকথা কলি আমি কলাম আর বরদাস্ত করব না! কিন্তু এই আলতাফভাই, আনসারচাচা কী কয়?

বুকার কথায় কবে আর কী হয়? আলতাফেরও কুর্নিশ।

ব্যস! ব্যস! তুইও যহন মানসেরে সনমান করতি পারিসনে, তহন আর কথা বাড়াসনে, মাথা নুয়াসনে। আমাগো আনসারচাচা কি জানে এই ঘোর ছিরাবনেও বিষ্টি ক্যান বেঘোরে ঘুমায়? জানে? হ্যাঁ কি না? গোড়া-টিলা থেকে লাফ মারে নীচে। খালেকের তর্জনীটা এবার যেন নাইন এমএম পিস্তল!

না! আলতাফ মাথা তুলে পেন্ডুলামের মতো দোলায়।

আমাগো আনসারচাচা কি জানে, যে ভূতনিপুরির মাঠ নদীর জলে ডুবাডুবি করার কথা আছিলো, তা আইজ ক্যান ঘুঁটের নাহান শুকনো খড়খড়ে? জানে? হ্যাঁ কি না?

না! রসিকও পেন্ডুলাম।

এই পুয়াতি বর্ষাকালে নদীনালা-খালাবিলায় জল নাই ক্যান কোতি পারবে আমাগো চাচা? পারবে? হ্যাঁ কি না?

না! রসিক-আলতাফ যেন এবারে জোড়া পেন্ডুলাম!

চাচাগো আর কী! ইদিকি গরিবির খুলতিছে কাছা, আর এই চাচারা কয়, আপন পরান বাঁচা! হ, এই আনসারচাচার নাহান লোকগুলান-ই কলাম নদীর পাড়ে ঢালাই মাইরা ঘর বানাচ্চে, আর না-হলি নদীর চরাবুক খুঁইচা-খুঁইচা ধান বুনতিচে। নদী তো নারী। তালি তার দিকি অগো এত কুনজর ক্যান কোতি পারবে? হ্যাঁ কি না?

না! ফের পেন্ডুলাম দুটো নড়ে ওঠে।

না না না! ব্যাবাক উত্তরডা ‘না’। ফাজিলগুলান খালি কয়, ‘আনসার’ নাই, ‘আনসার’ নাই। হে হে! শুধু পইড়া আছে ‘আনসার’ ছাড়া ‘চাচা’! চা-পাতা ছাড়া বেওয়া চা’র নাহান! হে হে! তা চাচা, এইবার কই আমার এই গাঁজাখুরি কিস্‌সাডা আমারে কিডা কইচে!

কিডা কইচে? রসিক এক লাফ দিয়ে বলে।

আমারে কইচে আমার নানা। না, কিডা কইচে? ডানহাত কানের কাছে নিয়ে খালেক প্রশ্ন ছোঁড়ে।

ভ্যাঙানো সুরে আলতাফ বলে, না না!

আর তারে কইচে তা-আ-র নানা। না, কিডা কইচে? এবারে বাঁ-হাত কানের কাছে নিয়ে খালেক।

না না! ভ্যাঙায় রসিকও।

আবার তারে কইচে তা-আ-আ-আ-র নানা। না, কিডা কইচে? দুই হাত কানের কাছে।

রসিক ও আলতাফ উভয়েই ভ্যাঙানোর সুরে বলে ওঠে, না না!

হে হে! বড্ড বেশি ফাজিল হইচো দুইজনেই। আমি কই ‘নানা’, আর ফাজিলদুডো কয় ‘না’ ‘না’! ‘না’-ডা কলাম অগো মাথার গুড়ায় বোইসা গ্যাছেগা। পেরেক তুলা শাপল দিয়া অ্যাকখান চাড় দিতি হবেনে দেকতিচি। একচাড়েই কাম সারা। হই আলতাফ, হই রসিক, কুথায় আমার আনসারচাচা? ওই, ওই যায়…ও চাচা, যাচ্চো ক্যান? কিস্‌সাডা শুইনা যাও গে আর অ্যাকখান!

পাগল খ্যাপায়ে কাম নাই আর। পাগলের স্যাঙাতও পাগল! সাইকেলে চেপে সবুজ দুনিয়ায় অদৃশ্য আনসারচাচা। সেদিকে চেয়ে বাকিদের সমবেত হাসি।

কিডা কারে খ্যাপায় চাচা? পাল্লি তুরা দুনিয়াডা বাঁচা! আমার আছে এই শ্যাষের মাডি আর ওই আল্লাহ্‌র চোখের পানি। ওই পানি দিয়া মাডি ছেনি আর জেবন বানাই। চুল্লির মুখি রাখি। ঘুরায়-ঘুরায় পুড়াই। ফুডা-ফাডা থাকলি হেইডারে বাদ দিয়া ফেত্তে বানাই। ফেত্তে পুড়াই। অ্যামনেই তো তৈয়ের হয় কলসিখানা। আমি হেইডারে বাজাই। ধিকানিকা-ধিকানিকা! আর এই গলার নালিতি যেটুকু জেবনের বাতাস ফাঁইসা আছে, তা দিয়া জেবনেরই গান গাইয়া যাব, কইয়া রাখলাম! বলেই গান ধরে,  ‘আল্লাহ্‌ ম্যাঘ দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই,

আল্লাহ্‌ ম্যাঘ দে…

আসমান হইল টুডা টুডা

জমিন হইল ফাডা

ম্যাঘ রাজা ঘুমায়া রইছে

ম্যাঘ দিবো কন কেডা…

আল্লাহ্‌ ম্যাঘ দে…’

 

দুই

ক’দিন ধরে উনাই আকাশের দিকে চেয়ে-চেয়ে মেঘ দেখে শুধু। চোখে রোদ পড়ে। চোখ ফেটে জল পড়ে। আসমানে ম্যাঘ কই আর? আগুনির গোলাগুলান ব্যাবাক চাইটাপুইটা খাইচে! বলেছিল রসিক। তবু কখনও-সখনও মেঘের চোখে-চোখ পড়লেই উনাইয়ের মনে হয়, এই বুঝি মেঘ তার মৃত্যুর কথা টের পেয়ে গেছে নির্ঘাত! আর সে তাই সেখান থেকে উন্মাদের মতো দ্রুত পালাতে থাকে। পালাতে-পালাতে চলে আসে তালতলার ছোট্ট জমিটায়। এসে দেখে, গুনাই বসে বিড়ি টানছে। মাঠ ফেটে চৌচির। তার উপর ধানের চারা। আর ক’টা দিন জল না-পেলে সেগুলো শুকিয়ে যাবে। উনাই বোধহয় ভেবেছিল, তার মাথায় আজ মেঘ ভেঙে পড়বে। আর যদি ভেঙে পড়তেই হয়, তবে পড়ুক তাদের এই জমিতে এসে, ঝুঁকে-পড়া তালগাছের মাথায়। দু-ভাই গাছের ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে পড়বে কোথাও না-হয়।

না, ভাঙেনি। মেঘ তাদের জমিতে দু-একবার ফুলুক-ফালুক মেরেই পালিয়ে যায়। অগত্যা দুজনে গান ধরে, ‘আল্লা ম্যাঘ দে, পানি দে…’ কিন্তু কয়েকটি চন্দ্রবিন্দু-ধ্বনিসমষ্টি ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। ভরসন্ধেবেলা রাস্তা দিয়ে যারা যায়, এমন সুরে তারা ভয় পেয়ে উট্টেপুট্টে পালায়। সূর্যাস্তের পর তালতলার দিকে যদিও কেউ আর আসে না খুব একটা। যারা বিষয়টা জানে, তাদের কথা আলাদা। তবুও ভাবে, কবে যে উনাই-গুনাইয়ের ছদ্মবেশে তেনারা নেমে আসবেন!

সন্ধে নামলে, ঝিঁঝি ও শেয়াল ডাকলে দু-ভাই মাঠ থেকে উঠে আসে। বাড়ি ফেরে। একটা মাটির হাঁড়িতে চাল ফোটায়। নুন-হলুদ-লঙ্কা দিয়ে মেখে খায়।

সেদিন এমনই এক রাতে দুর্গাচরণ বাড়িতে হাজির। একযুগ পর বোধহয়!

তোরা তো বে-শাদি কোল্লিনে আর। তা জমিডা আমারে লিখে দে যা। দশহাজার নগদ দিবানে। যদ্দিন তুরা আছিস, তদ্দিন চাষ কোরবি। খাবি। আমারে দুডো ভাগের-ভাগ পাল্লি দিবি, না-পাল্লি দিবি নে। তুরা মাটি নিলি পর জমিডা না-হয় তহন আমার। আমি তো আর থাকপো নানে তদ্দিন। কিন্তু আমার নাতিপুতিরা তগো আশীর্বাদ পাবেনে। আমরা-তুরা চোখবুজার আগে এট্টা ফয়েসলা কোরে দিতি চাই আসলে। রাস্তার পাশের জমি তো। তুরা মোল্লি তগো শরিক হজমিয়াঁ অ্যাক্কেবারে ফিরি-ফিরি জমিডা পাবেনে। আমি হইলাম গে দিলদার মানুষ। ফিরির ব্যাপারডা এট্টুও মানতি পারিনে কলাম। হেইদিন বুজলি, ওই কেইলে হজো আমারে কয়, যা খোস-পাঁচড়া উনোপাঁজারিগো গা ভত্তি হইচে, কোনদিন দ্যাখপা হাত-পা খইসা গ্যাছে! হালায়, শকুনির মতো চাইয়া আছেগা কহন গোরুডা মরে! আইচ্চা, তার চাইতে আমার পোস্তাবডা ভালা না? ট্যাকাও তগো, জমিনডাও তগো। হে হে!

উনাই মুচকি হাসে। মাথা নাড়ে। ‘না’ বলে, না ‘হ্যাঁ’ বলে— তা বোঝা বড়ই দুষ্কর। দুর্গাচরণ আরও কিছু সময় ধরে বোঝায়। ভয় দেখায়। লোভ দেখায়। বলে, ‘ধুর’-গে তো এহন সরকার ওইদ্যাশে খ্যাদাবার চায় শুনতিচি। তা তগো নাম্বার তো অ্যাক্কেবারে সামনে, খিয়াল কোরিচিস? দাঁত ক্যালাস ক্যান, অ্যাঁ? দাঁত ক্যালানোর কথা কই বুজি? তা আমি কইকি আমারে জমিডা দিলি এট্টা ব্যবস্থা কিন্তু কইরা দিতাম। সে-লাইন আমার জানা আছে। শ্যাষে কিন্তু কিছুই পাবিনে কলাম।

তবুও ফের সেই রহস্যময় হাসি হাসে উনাই। গুনাই ভূতের মতো আওয়াজ করে গান ধরে, ‘আল্লা ম্যাঘ দে পানি দে…অঁ অঁ অঁ উঁ উঁ উঁ…’

ওই চোপ র!! দুর্গাচরণ হঠাৎ ক্ষেপে ওঠে। পূর্বপুরুষের শাসন আর শোষণের অতৃপ্ত আত্মাটা বুঝি-বা চেপে বসেছে তার ঘাড়ে।

উনাই-গুনাইয়ের মুখে গান কিন্তু চলতেই থাকে। দুর্গাচরণ তিতিবিরক্ত। শেষে উনাই মুখে উঁ উঁ শব্দ করলে গুনাই চুপ করে। চারিদিকে অন্ধকার। হৃদয় ফুটো করে ঝোপাঝাড়ের সকল পোকামাকড় ডাকছে যেন। হঠাৎ গুনাই কুপিটা ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দেয়। ব্যস! দুইভাইকে আর দেখতে পায় না দুর্গাচরণ। দুজনেই ফের গান শুরু করে। ‘অঁ অঁ অঁ উঁ উঁ উঁ…’ মনে হচ্ছে যেন ঝিঁঝি-বাদুড়-তক্ষক-শিয়াল-জোনাকিদের অলৌকিক উপদ্রবের ভিতর ঘন বাঁশঝাড়ের নীচে পাটকাঠির চালাঘরটায় দুটো হাড়-শিরা বের-করা জীবন্ত কঙ্কাল দু-হাত তুলে নাচছে আর গাইছে। দুর্গাচরণ দুলছে। আর-একটু হলেই বোধহয় মাথাঘুরে সেখানেই পড়ে যাবে সে। শেষে ‘জয় দুর্গা’ বলে অশরীরীদ্বয়ের কবল থেকে ইয়া লাফ মারে উঠোনে।

ভয় দেখানো লোকটা ভয় পেয়েই পালাতে থাকে…

 

 

তিন

ধানের মাঠে বসে আছে উনাই-গুনাই। মাঠ এখন এতই শুকনো যে, লোকে এরইমধ্যে সেখানে দিব্যি এক হাঁটাপথ বানিয়ে ফেলেছে। সেটাকে বন্ধ করতে গুনাই হেঁসো হাতে খেজুর গাছে চড়ে কয়েকখানা বেগো কেটে নীচে ফেলে। উনাই নীচে দাঁড়িয়ে ঘ্যাঁচাঘ্যাচ কোপ মেরে সেগুলোকে পাশে গাদা মারতে থাকে। তারপর দুজনে মিলে বেগোর কাঁটাযুক্ত-অংশগুলো পুতে দেয় ওই হঠাৎ-তৈরি-হওয়া পথ-বরাবর। কাজটা শেষ হবে-হবে, ঠিক সেই মুহূর্তে দুর্গাচরণ-কে বাজার-বাতিল-করা ‘বাজাজ এম-৮০’ চড়ে আসতে দেখেই পাশের গাঁদাফুলখেতে ঢুকে পড়ে উনাই, ঠিক যেমনটা এইখানেই একদিন নীলকর সাহেবকে দেখে নালু পালেদের মতো সাধারণ প্রজারা ফসলের মধ্যে লুকিয়ে পড়ত। গুনাই সবসময় উনাইকে অনুসরণ করে থাকে। কিছুক্ষণ গাড়িটা নিয়ে দাঁড়ায় দুর্গাচরণ, দেখে মনে হয় না-খেকো গাঁধার পিঠে আধবুড়ো হাতি বসে আছে। বিড়ি ধরায়। আনসার মণ্ডলের সঙ্গে দেখা হয়। হজ’র সঙ্গে দেখা হয়। তাদেরও বিড়ি দেয়। তারপর বিড়বিড় করে বলে, ছেলো তো এইহানেই! গ্যালো কোয়ানে দুডো? শেষে উনাই-গুনাইদের জমিটার দিকে তর্জনী ছুড়ে হাসতে-হাসতে বলে, এই দুডো মোল্লিই কলাম হজ’র পুয়া বারো!

এইডা তুমি ক্যামন কথা কইলা? জ্যান্ত মানসেরে নে এই কতা কোতি আচে নেকি দুগ্‌গাদা? জমিজমা আইজ আমার, তো কাইল ওর, পরশু তার। জমিজমার সাতে জেবনের কতা কও ক্যামনে বুজিনে! লেহাপড়া শিখা কী যে কল্লা তা আল্লাতালাই জানে! হজ গজরাতে থাকে ভিতরে-ভিতরে।

আরে জমিজমার জন্যিই তো গোটা দুনিয়ায় এত্ত ঝামেলা, খুনখারাপি! কুরুক্ষেত্রে গণ্ডগোল। কাশ্মীরি গণ্ডগোল। ফিলিস্তিনিতি গণ্ডগোল। আফগানইস্তানে গণ্ডগোল। আগে এট্টা কথা-আছিল, ‘লাঠি যার, জমিনডা তার’, আর এহন হেইডা হইচে, ‘লাঠি, বাটি আর কাঠি যার, জমিনখান কলাম তার’। ওই জমিনখান আমার চাই, এইডা তুমারে কোয়ে রাখলাম হজো! ছোটো হও, ভাই কই— এই দাদার সনমানডা রাখপা কলাম।

নিয়েনে। পারলি নিয়েনে! এহন তফাৎ যাও তো। ম্যালা কামকাজ আছে। বলে হজ ফুলখেতের দিকে হাঁটা দেয়। খেতের দিকে যেতে-যেতে বিড়বিড় করে বলে, হালায়, বাঘ গ্যাছে, কিন্তু তার বুঁটকা ঘিরানডা যায় নাই। ঘিরান ছুটোয় দিবানি অ্যাকদিন। তহন বোজবেনে কত ধানে কত চাল। ওদিকে দুর্গাচরণের বেরিয়ে যাবার শব্দ!

ফুলখেতে ঢুকেই আঁতকে ওঠে হজ। আলে এসে হেঁসোটা বাগিয়ে ধরতেই দেখে শুকনো কুমিরের মতো বুকে হেঁটে খেতের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে অদ্ভুত এক প্রাণী!

কুমির নয়, টিকটিকি।

টিকটিকির কোটরাগত চোখগুলো একবার হেঁসোর দিকে, আর-একবার রাস্তার দিকে।

না, রাস্তায় দুর্গাচরণ আর নেই। যদিও তার এম-৮০’র মুমূর্ষু কান্না টের পাওয়া যাচ্ছে এখনও।

ও হালায়, দেহো কাণ্ড, আপদডা দেহি লুকাবার আর কুনো জায়গা পায় নাই! ওই খাড়া! খাড়া কই তরে! পালানোর কী আছে, অ্যাঁ? দুগ্‌গাচরণ বাঘ না ভালুক যে খাবে? অ্যাকদিন এই হেঁসো দিয়াই কাইটা ফেলুম কলাম! অরে, তরে— সবক’ডারে!

একটা না-খেগো টিকটিকি এবারে দু-পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ায়। হাত দুটো আকাশে তুলে দেয়, যেন সারেন্ডার করেছে!

ওই হাত নামা। নামা কলাম! যত্তসব! তোর আবার পিছনে কিডা? গুনাই না? ও শাউয়ো, তুমি তালি ল্যাজা সাজিচো?

 

চার

এর কিছু পরেই খালেক হাজির। সঙ্গে দুই স্যাঙাত। তিনজনের হাতেই একটা করে বাঁশের লাঠি, সেগুলো লাঠিখেলার মতো হাতে নিয়ে ঘুরোচ্ছে আর লাফাচ্ছে। আজ তিনজনই কালো জোব্বা পরা।

ওই দেহো, তিনখান কাকতাউড়া হাজির! হালায়,কুত্থাও এট্টু শান্তি নাই! বলেই হেঁসো দিয়ে অকালমৃত ফুলগাছগুলো কোপাতে থাকে।

তিনটে লম্বা বাঁশের লগা জোগাড় করে খালেকরা। সেগুলো দিয়ে কোঁটা বানায়। তারপর বড়বড় তিনটে গাছের মগডালে বেঁধে রাখে। হজ আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারে না। আরে করো কি তুমরা খালেকভাই?

ম্যাঘ ধরবার ব্যবস্থা কোরতিচি, হজোভাই।

ম্যাঘ ধরবা? হে হে, কী যে কও না তুমি আইজকাল!

ক্যান, তুমরা জাল ফেইলা বিলার মাছ ধরো না বুঝি?

ধরব না ক্যান? ধরি তো। কিন্তু…

হে হে! কুনো কিন্তু নাই। আমরাও হেইরোম ম্যাঘ ধরি। ম্যাঘ ধরতি গিলি বড়বড় গাছ লাগপেনে। হেই গাছে লগা বাইন্দে রাখতি হবেনে। লগার মাথায় থাকপে জাল। ম্যাঘ উপরদে গিলিই খপাৎ কইরা জালে ফাঁইসা যাবেনে।

ও। ভালা ভালা! তা ব্যাবাকে এই কালাজামা পরছ ক্যান আইজ? যাত্রায় যাবা নেকি?

আরে যাত্রা-ফাত্রা কিচ্ছু না। কালাজামা দেইখা ম্যাঘরাজ ভাববেনে তার বিবিরা তারে না-কইয়া ব্যাবাক ভাইগা গ্যাছেগা। যহন দ্যাখপে, চড়চড় কইরা তহন তার বুক ফাটপে। শ্যাষে এইহানে আছে ভাইবা সটাং চইলা আসপেনে। এই, এই জমিনে। আসপে আর কুঁটা দিয়া, জাল দিয়া তারে ফাঁসামু। এই দেহো কুঁটার মাথায় খ্যাপলাজাল!

ভালা ভালা ভালা! খালেকের কথায় হজমিয়াঁর চোখদুটো ছানাবড়া!

ফের নাচগান শুরু হয়—

‘ফাইট্টা ফাইট্টা রইছি যত

খালা বিলা নদী।

পানির লাইগ্যা কাইন্দা ফিরে

পঙ্খি জলদি

আল্লা ম্যাঘ দে, পানি দে, ছায়া দেরে তুই,…’

গানে-নাচে জুড়ে যায় উনাই-গুনাই।

 

পাঁচ

বিকেলের সুনিবিড় ছায়াতলে ঘুমিয়ে আছে গুনাই। সেখানে ছুটতে-ছুটতে চলে আসে উনাই। চুল যেন খাড়া হয়ে আসছে তার। স্নায়ু-জুড়ে তীব্র এক চৌম্বক-প্রভাব। আজ কি তবে সত্যিই মেঘে তাড়া করেছে তাকে? গুমমেরে আসে চারিদিকে। মহাজগতের গুমোট ষড়যন্ত্রের ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে চরাচরে!

ঘুম ভাঙে গুনাইয়ের। চোখ বড়বড় করে ভূতের মতো চেয়ে থাকে— চেয়ে থাকে উনাইয়ের দিকে, আকাশের দিকে, মাটি ও পৃথিবীর দিকে। করোটি ও বিশ্বকরোটির মাঝখানে নিরীহ দুটি চোখ পিটপিট করে যাচ্ছে অবিরাম। এক জগতের সংকেত পাঠিয়ে দিচ্ছে আর-এক জগতে।

উনাই বলে, বিঁ ইঁ  খাঁ বিঁ?

অঁ অঁ অঁ  উঁ উঁ উঁ! দাঁত বের করে মৃদু হাসে গুনাই। দাঁতে বিড়ির কালোছোপ। উত্তর একই, কিন্তু অভিব্যক্তি ভিন্ন। উনাই উত্তরের গভীরতা বোঝে।

ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেও বৃষ্টি নামে না দেখে মাঠে বসে বিড়ি ধরায় দুজনে। বিড়ি থেকে ধোঁয়া ওড়ে আকাশে। অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখে ধোঁয়ার ওড়াউড়ি। কুণ্ডলীপাকানো ধোঁয়া ক্রমশ বিশালের সঙ্গে মিশে যায়। উনাই হাত দিয়ে কুণ্ডলী ভেঙে দেয়। দেখাদেখি উনাইও তাই করে। হেসে ওঠে দুজনেই।

সকালে হজ-কে বলেছিল শ্যালোর জল দিতে। কবে যে বৃষ্টি নামে! দিনকে-দিন উনুনের পিঠের মতো হয়ে যাচ্ছে জমিটা। কিন্তু বাকিতে দেবে না সাফ জানিয়ে দিয়েছে হজ। তেলের দাম, ভূতির ঘাম! বলেছিল হেসে। কী করবে তবে?

ফুলখেতের ওপাশে একটা কাকতাড়ুয়া, পটলের মাচা শুকিয়ে যাবার পরেও পড়ে আছে। কিন্তু আশ্চর্য, তার হাত দুটো আকাশে!

হ্যান্ডস-আপ? কার সামনে?

উপরে কালো হয়ে আসছে ক্রমশ— মেঘের কারণে নয়, দিনান্ত বলেই। তবে, কেন এই সহজ আত্মসমর্পণ?

একটা কাক উড়ে এসে বসে কাকতাড়ুয়ার মাথায়। সঙ্গে-সঙ্গে আরও দুটো, ওই দুটো হাতের উপর। শেষে অস্তিনে ঢুকে পড়ে সে-দুটো কাক।

কাকতাড়ুয়া গোলগোল চোখ পাকিয়ে চেয়ে থাকে উনাই-গুনাইয়ের দিকে। তারাও চোখ পাকায়। কিন্তু তাদের পাকানো চোখগুলো নিমেষেই ছোট হয়ে আসে খুব। শেষে চোখমুখ কুঁচকে যায়। হাত উঁচু করে উনাই। দেখাদেখি গুনাইও। আরও দুটো কাক কাকতাড়ুয়ার দু-হাতে এসে বসে।

চরাচরে ঘোর আন্ধার। বিবিধ প্রজাতির চেনা-অচেনা গাছপোকা ও মাটিপোকা রহস্যময় কাহিনির আবহসংগীত বুনে চলছে। সবটাই এক অদৃশ্য মহাসুরকার দ্বারা কী অদ্ভুতভাবে নিয়ন্ত্রিত! এরই ফাঁকে উনাই গান ধরে, ‘আঁ ল লাঁ  ম্যাঁ গ  দেঁ,  পাঁ নিঁ  দেঁ,  ছাঁ য়াঁ  দেঁ রেঁ  তুঁ ইঁ…’

গুনাইও তালে-তালে, ‘অঁ অঁ অঁ  উঁ উঁ উঁ…’

ভূতনিপুরের মাঠে হঠাৎ-ই ভূতের উপদ্রব!

অদূরেই চড়চড় করে পাটকাঠির বেড়া-ভাঙার-শব্দ, যেন গোপনে আন্ধার ভাঙে কেউ! হঠাৎ তাতে আগুন লাগে। মশাল! আঁকাবাঁকা পথ ধরে মশালটা এগিয়ে আসে তালতলার দিকেই। প্রকাণ্ড কৃষ্ণদৈত্যের জিভের ভিতর আলোর ফুটকিতে আন্ধার আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। দৈত্যের মুখ থেকে মানুষখেকো ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে চরাচরে।

চরাচর স্তব্ধ! থেমে যায় উনাই-গুনাইও। সাক্ষাৎ মৃত্যুর ঘ্রাণ টের পেয়ে মশালটি দ্রুত অন্যদিকে হারিয়ে যায়। আলো আর আন্ধারের সুতীক্ষ্ণ খেলা, শব্দ ও নৈঃশব্দ্যের সুনিপুণ কারুকার্যের ভিতর জীবন মাটিতে শুয়ে থাকে সরীসৃপের ল্যাজের মতো। কে নাড়ায় তাকে?

আবার নৈশ-শব্দ। আবার নিস্তব্ধতা। গুম-মেরে-থাকা গ্রহটা ধৈর্য হারিয়ে এখনই রাগে ফেটে পড়বে বুঝি-বা!

এবারে চরম নিস্তব্ধতা। হঠাৎ প্রকাণ্ড এক বিদ্যুৎ ঝলকানি…! পৃথিবীটা দিনের মতোই স্পষ্ট! খড়খড়ে মাঠের পাঁজর দেখা যায় বহুদূর পর্যন্ত। দেখা যায় তার শিরা-উপশিরা, এবং কোটরাগত চক্ষু!

ভয়ে ছুটতে থাকে উনাই। গুনাই তবু দাঁড়িয়ে।

এবারে প্রকাণ্ড শব্দ। যেন পৃথিবী মায়ের কোলে ভেঙে পড়ল সদ্য!

এবারে কোঁটা-সমেত মাটিতে মেঘ ভেঙে পড়ে বুঝি-বা।

বৃষ্টি…সারারাত….

সারারাত… বৃষ্টি…

বিদ্যুৎ-বজ্র-বৃষ্টি…

আবার একটা কোঁটা ভেঙে পড়ে গাছ থেকে। মাটি থেকে গাছগুলো উপড়ে গিয়ে সমগ্র আকাশজুড়ে হাডুডু খেলছে যেন। কারা জিতছে? উনাই চেয়ে আছে সেই অতিপ্রাকৃত খেলার দিকেই। বটগাছ থেকে ছুটে গিয়ে গুনাই-কে ডাকতে যেতে পারছে না কিছুতেই। হাওয়া আর জলের স্রোত তার হাড়গোড়-চামড়াকে ধাক্কা মেরে বটগাছের গোড়ায় ছুঁড়ে ফেলছে বারবার। ঝোড়ো হাওয়ায়-হাওয়ায় সে বুঝি তখনও শুনতে পায়, ‘অঁ অঁ অঁ উঁ উঁ উঁ…’

গুনাইয়ের গান কি তবে শেষ হয়নি এখনও?

মহাতাণ্ডবলীলার পর ঝড়বৃষ্টি থামল শেষে, ভোরে। হইহই করতে-করতে সেই ভোরেই গ্রামের লোকজন নিয়ে হাজির খালেক। সঙ্গে দুই স্যাঙাত। এসেই বলে, খালেকমিয়াঁর কথা মিছা যায় না, হুলহুল! এই রসিকভাই, ম্যাঘ ধরা পড়ছে?

পড়ছে? ইয়া লাফ মেরে বলে রসিক।

মানসে মরছে?

মরছে। লাফ মারে আলতাফও।

বৃষ্টি নামছে?

নামছে! দুজনেই লাফায়!

নামছে? তা কুথায় নামছে রসিকভাই? আলতাফভাই? মাঝরাত্তিরি ম্যাঘ নামছে, বিষ্টি নামছে, মিত্যু নামছে, জন্ম নামছে এই, এই জমিনডায়, হুলহুল! এই জমিন বড়ই পবিত্র! এহন থিক্কা এই জমিনে গুনাইপীরের থান হবে, হুলহুল! এইহানেই দফনানো হবে তারে। কারো কুনো আপত্তি আছে? আছে? হ্যাঁ কি না?

না-আ-আ-আ-আ-আ-আ-আ…!! গ্রামের সকলেই চিৎকার করে ওঠে!

শান্ত মুখোশের মতো দুর্গাচরণ ক্রোধ সামলে নিচ্ছে। ক্রোধ সামলাচ্ছে হজমিয়াঁও।

আর কুনো শোরগোল না। আইজ আমাগো আনন্দ আর দুক্কের দিন! আইসো! বলেই কেঁদে ফেলে খালেক। দেখাদেখি দুই স্যাঙাতের চোখেও জল। খালেক বলে, আইসো, ব্যাবাকে মাটি দ্যাও গুনাইপীররে। তাঁর মহান আত্মাডা শান্তিপাক। আমিন…!

উনাইয়ের ল্যাজডা কিন্তু খইসা গ্যাছে, দ্যাখছেন দুগ্‌গাদা? হঠাৎ বলে ওঠে হজ।

হেইডাই তো দেক্তিচি। কিন্তু তুমার আর আমার কি যে খসলো, ভাবিচো অ্যাকবারও? হেই কবে থিক্কাই তো তুমি-আমি হালায় ল্যাজকাটাগো দলে। আমি চাই, এইরোম টিকটিকিগুলানের ফেত্তে ল্যাজ গজাক, নালি আমাগো কপালে কলাম ম্যালা দুক্ক আছে! বলেই একে-অপরের মুখের দিকে চায়।

উনাই বুকচাপড়ায় খালি। সে আকাশের দিকে চায়। মেঘের দিকে চায়। গাছপালা-মানুষজনের দিকে চায়। ওপরওয়ালার নিষ্ঠুরতা আর মানুষের আনন্দের কোনও কিছুই বোধগম্য হয় না তার। শিশুর মতো বোকা হতে-হতে সেও বুঝি বোবা হয়ে যায়!

রোজ একটা লেজের কাহিনি সবার অলক্ষ্যে খসে যায় এভাবেই। এভাবেই দো-পেয়ে হওয়া আর কী! উনাইও কি তবে শেষে…? এভাবেই…? সে ভাবে। আর ভাবতেই তার বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। উনাইয়ের কানে তখন ভেসে আসে, অঁ অঁ অঁ উঁ উঁ উঁ…! দ্যাখে, উত্তর দেবার পর অদূরের কাটা লেজটা বার-দুই কেঁপে থেমে গেছে চিরতরে। সেই একই উত্তর।

সদ্য সন্তানহারা বেড়াল-মায়ের মতো উনাই নখ দিয়ে ভিজেমাটি খোবলাতে থাকে শুধু। তার মনের অতল আন্ধারে জন্ম নেওয়া প্রশ্নটির যে উত্তর দিয়ে বিদায় নিল গুনাই, সেই উত্তরের অভিব্যক্তি তাকে উদ্ধার করতে হলে হাতের দশটি নখ দিয়ে এভাবেই হয়তো তাকে মাটি খুবলে যেতে হবে বহুযুগ! খুঁড়তে-খুঁড়েতে হয়তো একদিন বেরিয়ে পড়বে সেই প্রথম সরীসৃপের লেজখানা!