এ মাসের জাতক

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়

জন্ম: ২৫ নভেম্বর ১৯৩৩ মৃত্যু: ২৩ আগস্ট ১৯৯৫

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী

 

 

পঞ্চাশ দশকের প্রধান কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। প্রথম জীবনে গল্প রচনা করতেন স্ফুলিঙ্গ সমাদ্দার ছদ্মনামে। ‘কবিতা’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয়।

 

তাঁর প্রথম পর্বের কবিতায় নিয়ম শাসিত জীবনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, নিয়ম ভাঙা জীবন যাপনের গৌরবায়ণ দেখতে পাওয়া যায়। তবে তাঁর জীবনের পরবর্তী পর্বে এই উত্তালতা স্তিমিত হয়ে আসে। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে যে চারজন কবিকে হাংরি আন্দোলনের জনক মনে করা হয় তাঁদের মধ্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় অন্যতম । অন্য তিনজন হলেন সমীর রায়চৌধুরী, দেবী রায় এবং মলয় রায়চৌধুরী । শেষোক্ত তিনজনের সঙ্গে সাহিত্যিক মতান্তরের জন্য ১৯৬৩ সালে তিনি হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করেন।

 

বন্ধুত্ব, নারী, মানব সংসর্গ, জীবনের আনন্দ ও ব্যর্থতা বোধ নিয়ে শক্তি’র কবিতা। প্রকৃতির প্রতি তীব্র আকর্ষণ, নারীর ভালবাসা প্রভৃতি তাঁর  কাব্য জগতের  প্রধান উপকরণ। একসময় তাঁর গন্তব্য হয়ে উঠল ভুবনডাঙা-শান্তিনিকেতন। কখনও রামকিঙ্করের ডেরা। কখনও সিউড়ির অনতিদূরে কেঁদুলি।

 

বাউল আখড়ায় দিনের পর দিন পড়ে থেকেছেন শক্তি। দাওয়ায় বসে নবনী বাউল গান ধরেছেন লালনের, ‘‘সময় গেলে সাধন হবে না/ দিন থাকতে দীনের সাধন কেন জানলে না…।’’ চুর হয়ে শুনছেন শক্তি কবিয়াল। গান শেষে আড় ভাঙে কবির। আশমান-উপুড় ভাল লাগায় জড়িয়ে ধরেন নবনীকে। তাঁকে নিয়ে ‘এলেজি’ও লেখেন। জয়দেব-কেঁদুলির মেলায় বাউলরাও প্রায় সকলেই শক্তিকে চিনতেন।

 

১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫। এই তিন বছর, শক্তির দোস্ত আয়ান রশিদ খান ছিলেন বীরভূমের পুলিশ সুপার। এই সময়ের সিংহভাগ শান্তিনিকেতন, সিউড়ি, দুবরাজপুর, জয়দেব, রামপুরহাটে কেটেছে শক্তির। তাঁর সঙ্গে কখনও সঙ্গ দিয়েছেন সন্দীপন-ইন্দ্রনাথ, কখনও সুনীল। কখনও একা ।

 

 

 

রশিদের সঙ্গে গালিব-তর্জমায় মেতেছিলেন শক্তি। প্রকাশিত হয় ‘গালিবের কবিতা’। বইয়ের ভূমিকায় শক্তি লিখছেন, “আজ বছর দেড়েক হলো। এখনো হালে পানি পাওয়া যায়নি। যাবে কী করে? দুরন্ত দিনপঞ্জী বশে এনে তবেই গালিব-তর্জমা!  … বাসে অর্থ খেলো। আমোদে খেলো শতগুণ।” শেষে বোলপুর ট্যুরিস্ট লজ। শান্তিনিকেতনের নিভৃতিতে একদিন শেষ হল অনুবাদের কাজ। শক্তি তত দিনে গালিবে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছেন। রশিদ সেই সময়ের শক্তির কথা বলতে গিয়ে লিখছেন, “দেখেছিলাম গালিবের প্রতিটি পঙক্তি কীভাবে তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। শক্তি-গালিব বা গালিব-শক্তি একাকার হয়েছিল তার অনুবাদে:

কাঁদতে কাঁদতে ফুরিয়ে যাওয়া এমন সহজ আমার কাছে

যেমন সহজ মেঘ ঘনালে ছটফটিয়ে বৃষ্টি বাজে।”

 

শক্তি চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাছে কবি হিসেবে নিজের স্বাতন্ত্র্য পরিচয় তুলে ধরতেই শুধু সক্ষম হননি, নিজের সুদৃঢ় একটা অবস্থানও তৈরি করে নিয়েছিলেন তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে। কবিতার স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে তিনি ছিলেন সচেতন। আর এ জন্যই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল একটা স্বতন্ত্র অবস্থান সৃষ্টি করা। তাঁর সে অবস্থান নড়বড়ে নয়। নামের সঙ্গে তাঁর সে অবস্থানের একটা অদৃশ্য মিলও রয়েছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় কবিতায়ও স্বশক্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। শক্তি তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নিজের জীবনের চিত্র নিজেই তুলে ধরেছেন। কবিতার সেই পঙ্ক্তি থেকে আলাদা করা যায় তাঁর জীবনের ইতিহাস। আবার আলাদা করা যায় তাঁর কবিতার ইতিহাসও।

 

শক্তি শুধু পদ্যে নয় গদ্যেও তাঁর একটা শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করে নিয়েছিলেন। তবে সাহিত্যে তাঁর অনুপ্রবেশটা একটু ভিন্ন পথে। তাঁর শুরুটা কুয়োতলা দিয়ে। তাঁর পর কত কণ্টকময় কবিতার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছেছিলেন কাব্যদিগন্তের শেষপ্রান্তে।

 

এখানেই শক্তি চট্টোপাধ্যায় অন্যদের চেয়ে আলাদা। কারণ তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল কুয়োতলা দিয়ে আর এটা ছিল একটি উপন্যাস। শক্তির সৃষ্টি সম্ভারের ভেতর অন্যতম। কিন্তু কথাশিল্পী হিসেবে তাঁর পরিচয় নেই। কবি হিসেবেই তাঁর পরিচয় ডালপালা মেলে ছড়িয়ে পড়ল দুই বাংলায়।

 

১৯৭৫ সালে সালে শক্তি চট্টোপাধ্যায় আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত হন এবং ১৯৮৪ তে পান সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। ২৩ মার্চ ১৯৯৫ সালে তাঁর আকস্মিক অকালপ্রয়াণের সময় তিনি বিশ্বভারতীর অতিথি অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শক্তি নিজের কবিতাকে বলতেন পদ্য ।