এ মাসের জাতক

কবি অরুণ মিত্র

জন্ম: ২ নভেম্বর ১৯০৯ মৃত্যু: ২২ আগস্টা ২০০০

অমিত সাহা

 

সময়ের থেকে এগিয়ে ভাবতে পারেন বলেই কবি ক্রান্তদর্শী। কবিদের প্রজ্ঞা, প্রতিভা ও মনীষা অসাধারণ হয় বলে তাঁরা অন্যদের চেয়ে আলাদা চোখে জগতকে দেখেন। কবিদের দৃষ্টি অনন্ত আকাশের মতো অসীম। প্রাচীন আচার্য ভরতের মতানুসারেই বলা যায়, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এমন কোনও বস্তু নেই, এমন কোনও ভাব নেই, যা কবিদের হাতের ছোঁয়ায় রমণীয় হয় না! বাংলা সাহিত্যের সৎ কবিদের যে পরম্পরা তাতে কবি অরুণ মিত্র উল্লেখযোগ্য। আবাহমান বাংলা কবিতায় নতুন পথের দিশা তিনিই দেখিয়েছেন। ফরাসি ভাষার বিশেষজ্ঞ অরুণ মিত্র। বর্তমানে যে গদ্যকবিতার দিকে ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়, তার পথপ্রদর্শক তিনিই। সমস্ত রকমের ছন্দে দক্ষ হয়েও কবিতার বাঁধাধরা ছক থেকে বেড়িয়ে এসে তিনিই শুরু করেন গদ্যকবিতার প্রচলন। কবির একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন —“আসলে আমি কবিতার গোড়া থেকেই পথ অনুসন্ধানের চেষ্টা করছিলাম। সেক্ষেত্রে আমার ১৯৪৮-৫১ পর্যন্ত ফ্রান্সের জীবন ও ফরাসী কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা আমাকে অনেক সাহায্য করেছিল। অবশ্য, চেষ্টাটা তার আগে থেকেই চলছিল। আমি ক্রমশ আর চিৎকার পছন্দ করছিলাম না। উচ্চকন্ঠ রাজনীতির কবিতা থেকে বদলে নিতে চাইছিলাম আমার উচ্চারণের ভঙ্গী।”(দেশ, ১৯৯০, ১৭ নভেম্বর)। যে কোনও কবির ক্ষেত্রে এই উচ্চারণ-ভঙ্গির বদলটা খুব প্রয়োজন। আবহমান বাংলা ভাষায় যাঁরাই এটা করতে পেরেছেন তাঁরাই দাগ রেখে গেছেন।

অরুণ মিত্রের কবিতার সাবলীল ভাষা, স্মার্ট শব্দের অকস্মাৎ প্রয়োগ এবং অনবদ্য মৌলিক চিত্রকল্প, পাঠককে ভাবাতে বাধ্য করে। তাঁর কবিতায় বার বার ফিরে আসে গ্রাম-বাংলার কথা। তাই তিনি লিখতে পারেন-“আম জামের গাঁয়ে চুপি/ লাখো হাতের তল্লাস এড়িয়ে চুপি চুপি/ আমার স্বপ্নগুলো আগলাই।” (আমার মুখের দিকে তাকাও)। অপরূপ চিত্রকল্পের সঙ্গে উঠে আসে কবির দেশভাগের যন্ত্রণা ও হতাশা। ‘অমরতার কথা’ কবিতায় লিখছেন, “বাসনগুলো এক সময়ে জলতরঙ্গের মতো বেজে উঠবে। তার ঢেউ দেয়াল/ ছাপিয়ে পৃথিবীকে ঘিরে ফেলবে। তখন হয়তো এই ঘরের চিহ্ন পাওয়া যাবে না।/ তবু আশ্চর্য জেনো। জেনো এইখানেই আমার হাহাকারের বুকে গাঢ়/ গুঞ্জন ছিল।” প্রথম বাক্যের উপমা যেমন পাঠকের আকর্ষণ বাড়াবে তেমনি শেষ লাইনে এসে কাঁসার বাসনে টোকা মারার মতোই ঘা দিয়ে যাবে পাঠকের চেতনার দরজায়।

দৃষ্টিগ্রাহ্য জগত ও মানস জগতের মিলিত বাস্তবতার ভেতরে কবি অরুণ মিত্র আবিস্কার করেন এক আবছায়া আলোর অমোঘ রহস্য। তাঁর কবিতার বোধ নাড়া দিয়ে যায় পাঠক মনে। তাই আজও তিনি সমান প্রাসঙ্গিক।  কেননা, তিনি লিখতে পারেন ‘মাঝরাত্তিরটা ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে’, লিখতে পারেন, ‘দুপুরের সূর্য গুঁড়িয়ে গেল আর আমি অনুভব করলাম/ তোমার স্পন্দন থমথমে রাতের মতো’। সময়ের চেয়ে কতটা এগিয়ে থাকলে এমন বাক্যবন্ধ লেখা সম্ভব হয়, তার টুকরো প্রমান। তাঁর কবিতায় দেশজ ও তদ্ভব শব্দের প্রয়োগ তাঁকে অন্যমাত্রা দিয়েছে। অযথা জটিল শব্দ দিয়ে কবিতাকে তিনি রুদ্ধ করতে চাননি। তাঁর কবিতার দুরন্ত গতির সঙ্গে পাঠক-মনও ছুটে চলে। তাঁর একটি কবিতার কাছে চুপ করে বসে থেকে ভেবেছি, কবি অরুণ মিত্র ‘আধুনিক’, ‘উত্তর আধুনিক’ বা ‘পুনরাধুনিক’ এই সমস্ত ধারণা যেন একার হাতেই ফল্গু ধারার মতো বয়ে নিয়ে গেছেন।

“রোদবৃষ্টি শুষে সোনা হয়েছে গম

এখন চুরচুর হচ্ছে দানা,

মুখ টিপে হাসছে মেশিন আর ভাঙছে

ক্ষেতময় রক্তের ছোপ অথচ একটু ছিটেও নেই এখানে

এই তো আসল কেরামতি

ঝকমক দানা

ঝিকমিক গুঁড়ো

কত স্বপ্ন ঝলমলাবে পালংকে”

হে তরুণ প্রজন্ম অনুভব করো, তাঁর শব্দচয়ন ও চিত্রকল্পের কেরামতি !