অগ্রজের চোখে

নতুন কবিতার আলো

জয়দেব বাউরী

 

এই যে সকালবেলাটির দুপাশেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ফুল, লতাগুল্ম আপন আনন্দে জ্বলজ্বল করছে, আমাদের স্বার্থমগ্ন চোখ তার কতটুকু দেখতে পায়! নিত্যকার চলাচলের পথে এক পলক চোখ আটকালেও চলার গতি সামান্য শ্লথ হওয়া ছাড়া, তার সামনে কয়েক মুহূর্তও স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারি কি! অথচ এই ফুল, এই লতাগুল্ম আমাদের আশেপাশেই জন্ম নিচ্ছে অহরহ। ঠিক তেমনিভাবে কবিতাও প্রতিমুহূর্তে জন্মে চলেছে চরাচরে,তার কতটুকুই বা আমরা পড়ে উঠতে পারি? তার আলোর আভাস কতটুকুই বা পাঠকের কাছ অবধি পৌঁছে দিতে পারি?

 

কিন্তু আপন আনন্দে ফুটছে এই ফুল, এই কবিতা। এরকমই কিছু ফুলে সেজে উঠল ‘কবিতা আশ্রম’ হেমন্ত সংখ্যা। প্রায় সকলেই নবীন কবি। লিখছেন অল্পদিন। কিন্তু এরই মধ্যে তাদের কবিতায় মেধা ও হৃদয়ের সংমিশ্রন আমাদের চমকিত করে যায়। শরীর, শরীরের প্রসাধনীর চেয়ে কবিতার মনটির প্রতি যেন বেশি যত্নবান তারা।

 

বন্যা লোহার। পদার্থবিদ্যার ছাত্রী। বয়সের তুলনায় যেন অনেক বেশি পরিণত তাঁর লেখা। অলংকার প্রয়োগে তাঁর নিপুনতা লক্ষ্য করাবার মতো। তাঁর কবিতার স্বরটি নম্র, শান্ত। এক রকমের কোমলতা লেগে আছে এই কবিতাটির পরতে পরতে। সে লিখছে – “ফুলটি দুষ্প্রাপ্য। প্রেমিকার মতো নরম”। হ্যাঁ, দুষ্প্রাপ্যই তো। সে ‘ফুল’কে চেনার জন্য আলাদা একটা চোখ লাগে, স্পর্শ করতে গেলে লাগে আলাদা একটা সাধনা। কিসের সাধনা? – ‘সহজ’ হবার। কেননা, কবি জানাচ্ছেন ‘ফুল’টি শুধু দুষ্প্রাপ্যই নয়, ‘প্রেমিকার মতো নরম’। আর এই ‘নরম’ এর ধর্ম পেরিয়ে ‘প্রেমিকা’ শব্দটির দিকে তাকালেই অন্য এক আকাশ খুলে যায়; চোখ হারানোর আবেশ তৈরি হয়।

 

শৌনক দত্ত। আলাপ-পরিচয় নেই। দেখতে পাচ্ছি, তিনি কবিতায় নিমজ্জিত এক তরুণ। ছোট ছোট চিত্রকল্পে বিন্যস্ত হতে হতে পূর্ণতা পায় তাঁর কবিতা। অন্তরের জানালা থেকে এই কবি দেখতে পান- “ঘুঘুমারির সেই পুকুরে অরুনেশ ঘোষ কবিতা লেখেন”। অথচ জানালায় ‘নতজানু’ থাকা নয়, কবিটির তো যাবার কথা ‘নদীর নৈবেদ্যে’। আহা ‘নদীর নৈবেদ্য’। এরকমই আছে- ‘মেঘলা পকেট’, ‘সংসারী বোতাম’, ‘খুচরো ডাক’ – এর মতো চমৎকার উপমা। কবিতাটির একদিকে আছে ‘অরুনেশ ঘোষ’,’একাকী মৃত্যু গাছ’, ‘বিষন্নতার জপমালা’। আর অন্যদিকে কবিতার সত্ত্বাটি ধরে রেখেছে ‘মায়ের আঁচল মশলাঘ্রাণ’, ‘পিতলের কাজলদানী’, ‘নদীনালা ও অরণ্য জলছবি’ আর ‘হ্যাজা’ খোঁজা ‘সন্ধ্যার চাতাল’।

 

প্রাণেশ ভট্টাচার্য। এক কল্যাণকামী চোখ জেগে থাকে তার লেখার ভিতরে। যেহেতু সময় নিষ্ফলা তাই কোনো ‘নবজন্ম নেই’, নেই ‘বিচ্ছেদের ঘোর’। ক্ষয়িষ্ণু সময়ে দাঁড়িয়ে ব্যঙ্গের শর নিক্ষেপ করেন কবি – ‘শরীরে ড্রয়িংরুম পুষে রেখে, মনে মনে সকলেই বাঘ’। সমাজ-চরিত্র সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতনও তিনি। তাই বুঝতে পারেন এখন ‘প্রয়োজন তীব্র নয়’। নয়তো, ‘কৃষ্ণচূড়া’ মাথা দোলাতো পথে। ‘ল্যাম্পপোস্ট’এ থাকতো ‘মেদ ঝরানোর বিজ্ঞাপন’। কিন্তু প্রত্যাশা ছেড়ে যায় না তাকে। তাই, ‘কল্যাণবেলা ছুঁয়ে ছুঁয়ে’ থাকতে পারেন।

 

সুদীপ রাহা। এই নবীন কবির কবিতায় প্রেম আর প্রেমহীনতা মিলেমিশে থাকে। বিন্দুবৎ প্রাপ্তি ঘটলে, অপ্রাপ্তি থাকে সমুদ্র-সমান। সম্পর্কের অভিমুখে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে পারস্পরিক নীরবতা, আড়ষ্টতা- এককথায় থেমে থাকার বিষয়টিকে কী চমৎকার দুটি শব্দবন্ধে ফুটিয়ে তুলেছেন –‘বাক্যহীন ক্রিয়াপদহীন’। অথচ পারস্পরিক ‘ইচ্ছে’টি বর্তমান। আর তা যে কতখানি প্রগাঢ়, কতটা প্রখর, অথচ অসহায় -তা ব্যক্ত করে তোলেন আরও চমৎকারভাবে। তিনি লিখছেন- “ক্ষুধার্ত মুখের সামনে অন্নহীন থালার মতো/ আমরা একে অপরের দিকে চেয়ে থাকি।” উপমাকে, চিত্রকল্পকে সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে তিনি যে যথেষ্ট নিপুণ, তার পরিচয় পাওয়া যায় ছোট এই কবিতাটিতে।

 

প্রত্যয়ী দত্ত। তীব্র গতিময় এই সময়ে দাঁড়িয়ে সম্পর্কের ভেতর থিতিয়ে থাকা চোরা টানাপোড়েন, লুকোনো সংকট উঠে আসে তাঁর কবিতায়। উঠে আসে সংকটের বাইরে থাকা বহমান জীবনও। সূক্ষ্ম বলেই বারান্দা জুড়ে, ঘর জুড়ে যে ‘ব্যথা’ ছড়িয়ে পড়ে আটকে থাকে, তা ‘নরম আলোর’ মতো। ঘরে নয়, ‘প্রেম’ যেন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে বাইরে। অথচ বেশি দূর যেতে পারেনি সে এখনো, ছড়িয়ে আছে, দাঁড়িয়ে আছে ‘ঘরের সামনে বড় রাস্তার পাশে’। কিন্তু তাকে ‘খুঁজে’ পাওয়া যাচ্ছেনা, তার কাছে পৌঁছাতে গেলে যার হাত ধরে এগোতে হবে সেই ‘বিশ্বাস’ই তো উধাও হয়ে গেছে সম্পর্কের মাঝখান থেকে। হয়তো সেজন্যই কবিতাটিকে পরিসমাপ্তির দিকে নিয়ে যায় আরও একটি বিষাদমাখা চিত্রকল্প-“ কোনো শীতের ভোরে ঘুম ভাঙে প্রথম ট্রেনের ছেড়ে চলে যাওয়ার আওয়াজে।”

 

আম্রপালি দে। রূঢ় বাস্তবতাকে ধরতে চান আরও রূঢ় চিত্রকল্প দিয়ে।তিনি দেখতে পান এক ‘রত্নসভা’। দেখাটি এই অবধি হলে কবিতার ভেতর চারণের মতো ঘুরে বেড়াতো না এত বিড়ম্বনা। কিন্তু বিড়ম্বনা দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। কারণ,তাঁর চোখ সেই ‘রত্নসভায়’ দেখতে পায়, ‘কাকপক্ষীদের মুজরো করা’। আর সেজন্যই অনিবার্যভাবে কবিতাটিকে এক বিদ্রুপাত্মক পরিসমাপ্তির দিকে টেনে নিয়ে যায়। তিনি লেখেন- “রমণরত কুকুরের পাশে বসে/শিল্পীকে দিতে হয়েছিল চাকুরির পরীক্ষা/ উজ্জ্বল আকাশে তার এটুকুই ফাঁকি…”

 

খুরশিদ আলম। বিশ্বচাকাটির ‘ঘুর্ণন’ দেখছেন তিনি। দেখছেন, তার কক্ষপথের পরিবর্তন হয়নি কোনও। আর সেই চাকায় পিষ্ট হওয়া মানুষের অসহায়তাও আছে তেমনই। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার আঁচ এসে পড়ে খুরশিদের কবিতায় – “ শূন্যের ভেতর তীব্র গতিতে ছুটছে হাওয়া/ উদ্বাস্তু শিবিরগুলো ক্রমাগত ছটফট করছে।’ আর এই দৃশ্যপট কবিকে স্মৃতিতে জাগিয়ে দিয়ে যায় এই একই ধরণের কষ্টকে। কবি লিখছেন –“গতজন্মের কষ্ট এক একটি পাথরের মতো শুধু নীরবতা খুঁজছে।”

 

ভাস্কর সুতার। কয়েক বছর হল কবিতা লিখছে। কঠোর জীবন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছে তার কবিসত্তার প্রদীপটি। ‘শব্দ’কবিতায় উত্তরাধিকার সূত্রে তার প্রাপ্তি বলতে, ‘বিকেলবেলা’, ‘হাওয়ায় রোদ্দুরে পলাতক ছিল যা কিছু’ আর ‘বৃষ্টি এসে অবুঝ করে যাওয়া চোখ’। আর শূন্য হয়ে যেতে যেতে দেওয়া ‘শব্দ’। আর কিছু নয়। একজন কবির আর চাওয়ারই বা কী থাকতে পারে। শব্দের ভেতরে ঘুমিয়ে আছে প্রাণ। তাকে জাগ্রত করে তোলাই তো কবির কাজ।

 

কনক মণ্ডল। বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র। কবিতা আশ্রমের পাঠক ইতিমধ্যে পড়েছেন তার কবিতা। যাপিত জীবন, তার ওঠা-পড়া,তার চারপাশ থেকে উঠে দাঁড়ায় কনকের কবিতা। তার দেখার চোখটি বড়ো সূক্ষ্ম। তাই উপমাও তার চোখে নতুন হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে ব্যঞ্জনাধর্মী – “উইপোকাদের উড়ে আসতে দেখি বাঁজা গৃহবধূর মতন।” যথেষ্ট ইন্দ্রিয় সচেতন বলেই লিখতে পারেন – “উইপাখিদের ডানা অদ্ভূত কান্নায় যেন ভরা।”

 

এই সব কবিতা পড়তে পড়তে মন আনন্দে ভরে যায়। হে নবপুষ্পদল !