মেঘবতী

আগে যা ঘটেছে…

নদীগর্ভ থেকে অপ্রাকৃত মকরমুখী এক নারী উঠে এসে কশ্চিৎ নামক আজকের এক সেবাব্রতীর মনে জাগিয়েছিল পূর্বস্মৃতি… বারোশো বছর আগেকার এক কবি উত্তিয় দেখেছিল, শব্দ বড়ো প্রতারক। যা সে ভাবে, শব্দে তাকে অনুবাদ করতে পারে না। শব্দপীড়িত এই কবি জনপদবধূ বিদূষী অনঙ্গসেনার কাছে জেনেছিল শব্দ ও ভাবের  অদ্বৈততত্ত্ব। কিন্তু মীমাংসা হয়নি তার সমস্যার, অন্তরের ক্ষতমুখে প্রলেপ দিতে পারেনি বান্ধবী আত্রেয়ীর সাহচর্যও। অবশেষে পথে নেমেছিল উত্তিয়। দেখা হয়েছিল এক গ্রাম্য গায়কের সঙ্গে। এবং  দুশো বছর পরের এক চরিত্র চর্যাপদখ্যাত নৈরামণি স্বপ্নে দেখা দিয়ে উত্তিয়কে রেবাতটে পুষ্পাবসান গ্রামে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। সেখানে  নাকি এক বৃদ্ধ ও এক বালিকা উত্তিয়কে পথ দেখাবে। তারপর…            

সপ্তম অনুবাক 

বালিকা নয়, কিশোরী বলা যেতে পারে। অথবা যে-বয়সে কৈশোরের সারল্যমায়া সম্পূর্ণ অপসৃত হয় না, আবার যৌবনের আরক্তিম আভা তনুলতায় সবেমাত্র ফুটে ওঠে—জীবনের সেই আচ্ছন্ন গোধূলিমদিরতার আলো মেখে মেয়েটি দাঁড়িয়ে রয়েছে মনে হল। তার নাম মেধাকথলিকা। বৃদ্ধ বিরূপাক্ষের পরিণীতা স্ত্রী। রেবাতটের পুষ্পাবসান গ্রামে এই অসমবয়সী দম্পতির বাস। খড়ে ছাওয়া মাটির ঘরটি তাদের। নিতান্ত দরিদ্র অবস্থা।

তবে গ্রামের লোক যত বলেছিল, বিরূপাক্ষ তত বৃদ্ধ নয়। বয়স পঞ্চাশের উপর হবে। শরীর এখনও শক্তসমর্থই আছে। আর এর আগে তার যে তিনবার বিবাহ হয়েছিল, তাও সত্য নয়। উত্তিয় অনুসন্ধান করে জানল, বিরূপাক্ষের বাল্যকালে একবার বিবাহ হয়। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই তার স্ত্রীবিয়োগ ঘটে। তারপর  মধ্যবয়সে আরেক কন্যার সঙ্গে বাগ্‌দানপর্ব অবধি অগ্রসর হয়েছিল। কিন্তু লোকটি মন্দভাগ্য! কন্যাটি কোনো এক মেলা হতে প্রত্যাবর্তনকালে দস্যুদের দ্বারা অপহৃতা হয়। নিরাশ বৃদ্ধ নিতান্ত একাকী অবস্থায় কালাতিপাত করত। আরও একবার বিবাহের সম্বন্ধ পাকা হতে হতে ভেস্তে যায়। অবশেষে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সে একাকী জীবনে ছেদ টেনে দিয়ে সে মেধাকথলিকাকে বিবাহ করে। মেধা এক গ্রামীণ জাদুকরের কন্যা।

অসম বয়স সত্ত্বেও বৃদ্ধ ও তার তরুণী ভার্যার ভিতর ভাব যথেষ্টই। কিন্তু বিরুদ্ধ কপাললেখন। এক বৎসর আগে রেবানদী তাদের গেরস্থালি, জমি-জিরেত গ্রাস করে নেয়। পুনরায় গৃহহারা দম্পতি গ্রামের প্রান্তে এই খোড়ো ঘর তুলে বসবাস করতে আরম্ভ করেছে। মানুষের জীবনীশক্তি তুলনারহিত। মেধা তার পিতার কাছ হতে জাদুর খেলা শিখেছিল। তারই এক বিশেষ প্রকারভেদ এই লাঠির খেলা। গ্রামে গ্রামে ওই খেলা দেখিয়ে তারা এখন দিন গুজরান করে।

উত্তিয় ঘরের দাওয়ায় কাঁঠাল গাছের ছায়ায় বসে আছে। বেলা দ্বিপ্রহর। মুন্দি গাছের অনুচ্চ বেড়া দিয়ে গেরস্থালিটি কোনোমতে ঘেরা। সেই বেড়া পেরিয়ে দৃষ্টি চলে যায় অদূরে রেবা-তীরবর্তী বালুকাভূমির দিকে। ওখানে চাষিরা বাঁশের মাচানে সীমলতার চাষ করেছে দেখা যাচ্ছে। সবুজ হয়ে আছে সীমের মাচান। মাচানের থেকে মধ্যে মধ্যে হালকা বেগনী-সাদা সীমের ফুল মুখ উঁচু করে আছে। কতগুলো প্রজাপতি নদীর দিক থেকে  উড়ে এসে সীমের মাচানের উপর বসছে, আবার উড়ে যাচ্ছে। উত্তিয় বসে বসে প্রজাপতিদের ওই খেলা দেখছিল।

একটা ঘড়া কাঁখে নিয়ে মেধা সীমলতার মাচানের পাশ দিয়ে এইদিকেই আসছে, উত্তিয় দেখল। তার শরীরটি নতুন তৈরি নৌকার মতো সুচ্ছন্দ। একটা মেঘরঙের কাপড় পরেছে সে। ভেজা চুলের রাশ পিঠের উপর ছড়ানো। হাতে দুটি কঙ্কনবলয় ছাড়া আর কোনো অলংকার নেই তার। নিরলংকৃত সদ্যোযৌবনা কিশোরীর রূপের আভার মতো সীমলতার মাচার উপর, রেবাস্রোতের উপর ছড়িয়ে পড়ে আছে আজ মধ্যাহ্নের আকাশ।

পায়ে খড়মের খটখট শব্দ তুলে ঘরের থেকে বেরিয়ে কাছে এসে দাঁড়াল বিরূপাক্ষ। হাতে একটা বাঁশের হুঁকা। উত্তিয়র দিকে তাকিয়ে শব্দ না করে হাসল। তারপর উত্তিয়র পাশেই মাটির উপর বসল সে। হুঁকায় আস্তে আস্তে টান দিয়ে কাঁঠাল গাছের গায়ে হুঁকাটি ঠেসিয়ে রেখে ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, ‘মশায়ের আহারাদি বিশ্রাম ঠিকমতো হচ্ছে তো? একটু তামাকু ইচ্ছা করবেন? পৃথক হুঁকায় সেজে দেব।’

উত্তিয় সহাস্যে উত্তর দিল, ‘আহারাদি একেবারে সম্যক…কিন্তু আমি তামাকু পান করি না। আপনি আমার জন্য উদ্বিগ্ন হবেন না।’

—উদ্বিগ্ন কি আর হই সাধ করে, মশায়? আমাদের নিতান্ত অসহায় দরিদ্রাবস্থা। আপনি আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করেছেন, সে আমাদের কতো যে সৌভাগ্য! কিন্তু এ গ্রামে এতোজন বর্ধিষ্ণু গৃহস্থ থাকতে আপনি যে কেন এত কষ্টস্বীকার  করে আমাদের গৃহেই এসে উঠলেন, সেই কথাই ভাবছি।

লোকটি বেশ সুন্দর শব্দচয়ন করে বিনয়সহকারে কথা বলে। হয়ত এর পূর্বপুরুষেরা সম্পন্ন কুলপতি ছিলেন। বিরূপাক্ষ যদিও নিতান্ত দরিদ্র, তবু পূর্বপুরুষের সেই সম্পন্ন সংস্কৃতির রেশ তার ভাষায় থেকে গেছে।

উত্তিয় বলল, ‘আমি জানি, আমি নিশ্চয়ই আপনাদের অসুবিধায় ফেলেছি…’

লোকটি হাঁ-হাঁ করে উঠল, ‘সে কী কথা বলেন, মশায়! তা নয়। আমি ভাবছি আপনার অসুবিধার কথা। আমরা তো আপনার যথোপযুক্ত আপ্যায়ন করতে পারছি না। দেখলেই বোঝা যায় আপনি নাগরিক, সদ্বংশজাত। আমাদের এই অতি দীন ব্যবস্থায় আপনার সেবায় হয়ত নানা ত্রুটি ঘটছে…’

—ওকথা আপনি স্বপ্নেও মনে স্থান দেবেন না। আমি দিব্য আছি। আমার শুধু কয়েকটি জিজ্ঞাসা আছে।

লোকটি হুঁকায় একবার তামাক টেনে চক্ষুদ্বয় উজ্জ্বল করে বলল, ‘জিজ্ঞাসা আছে? আমার নিকটে? বলুন মহাশয়, কী জিজ্ঞাসা আপনার।’

বৃদ্ধকে কী জিজ্ঞাসা করতে হবে, উত্তিয় কিছুই জানে না। স্বপ্নে নৈরামণি শুধু বলেছিল, রেবাতটের এই পুষ্পাবসান গ্রামে আসতে। এই গ্রামে এক বৃদ্ধ ও এক বালিকার সঙ্গে দেখা হবে। তাদের কথা মতো কাজ করতে। এছাড়া নৈরামণি স্বপ্নে আর কিছুই বলেনি। বিরূপাক্ষ ও মেধাই যথাক্রমে সম্ভবত সেই বৃদ্ধ ও বালিকা। কিন্তু এদের কী প্রশ্ন করতে হবে, এরাই বা কী বলবে তাকে, উত্তিয় জানে না। কিছু না বলে উত্তিয় আত্মগতভাবে বসে ছিল।

মেধা মুন্দিবেড়ার আগড় ঠেলে উঠানে এসে ঢুকল। গায়ে কাপড়টি কোনোমতে জড়ানো। নদীঘাট হতে সবেমাত্র স্নান সেরে আসছে। উত্তিয়কে দেখে মাথা নীচু করে উন্মুক্ত বাহুটির উপর আঁচল চাপা দিয়ে দ্রুতবেগে মাটির দাওয়ায় সিক্ত পদচিহ্ন ফেলে ঘরের ভিতর চলে গেল।

বৃদ্ধ সেদিকে তাকিয়ে হেসে উত্তিয়কে বলল, ‘এই এসে গেলেন জাদুকরী ঠাকুরান। এখনই আমাদের আহারের জোগাড় হবে…তা কী যেন প্রশ্ন করবেন বলছিলেন?’

কিছু একটা দিয়ে কথা শুরু করা যাক ভেবে উত্তিয় বলল, ‘শুনেছি, এই রেবাতটেই আপনাদের ঘরবাড়ি জমিজিরেত ছিল। সেসব কি রেবার পেটে গেছে?’

—আর বলেন কেন, মশায়? এ রেবা কি এমন থাকে? বর্ষাকালের সে রেবা এ রেবা নয়। একেবারে রাক্ষসী হয়ে ওঠে। আগে বসতবাটি নদীর আরও কাছাকাছি ছিল। নদীর এত কাছে বাড়ি করাই কেন বাপু? পিতৃপুরুষেরা কেন যে এত নদীঘেঁষা বাড়ি করেছিলেন, কে জানে! কথায় বলে, তোদের নদীর ধারে ঘর, তোরা বানের জলে মর!

—হয়ত নদী তখন আরও অনেকটা দূর দিয়ে বহে যেত। এখন হয়ত রেবা আরও কাছে সরে এসেছে।

—তাই হবে হয়ত। যাই হোক, সে ঘর, জমিজমা সব তো রেবা খেয়ে নিল। তারপর এখন নদী থেকে কিছুটা দূরে এই জায়গাটুকু পেয়ে ঘরটুকু তুলেছি। তাও কি আমি আর এই পরিণত বয়সে একলা হাতে পারতাম? মেধা পাশে না থাকলে? মাটি কেটে কাদা ছেনে দেওয়াল তুলে খড় ছেয়ে মেধা গ্রামের লোকজনের সহায়তায় বাড়িটি তুলেছে। তারপর এই উঠান, এই দাওয়া, এই মুন্দির বেড়া—সব পরিপাটি। সাধে কি বলি জাদুকরী?… জমিজমা নাই, গ্রাসাচ্ছাদন করব কী উপায়ে? মেধা তার বাপের কাছ থেকে যেটুকু বিদ্যা শিখেছিল, সেটুকুই গ্রামের হাটে হাটে দেখিয়ে সামান্য উপার্জন করি। চলে কোনোমতে…

স্বল্পপরিচিত লোকের সামনে স্বীয় পত্নী সম্পর্কে অনেক কথা বলা হয়ে গেছে খেয়াল করে বিরূপাক্ষ লজ্জিত ভঙ্গীতে হঠাৎ থেমে গিয়ে ধীরে ধীরে তামাক খেতে লাগল।

উত্তিয় বলল, ‘আপনারা কী ধরনের খেলা দেখান?’

—লট্‌ঠিক্রীড়া।

—সে খেলা কীরূপ?

—আজই তো গ্রামের হাটবার। বৈকালে হাটে খেলা দেখাতে যাব। আপনিও আসবেন। নিজের চোখেই দেখবেন, কীরূপ।

নিকোনো দাওয়ার উপর পাশাপাশি দুটি আসন পেতে বিরূপাক্ষ ও উত্তিয়কে খেতে দিল মেধা। কলার পাতায় আশু চাউলের ভাত, হিঞ্চে শাকের ব্যঞ্জন, সর্ষপ তৈল দিয়ে মাখা ওলভর্তা, মৌরলা মাছের টক—এই ব্যবস্থা। উত্তিয় তার স্বেচ্ছাবৃত ভ্রামণিক জীবনে এমন সামান্য আহারে অভ্যস্ত হয়েছে ইতোমধ্যেই। তবু ওলসিদ্ধ খেতে খেতে গলা অল্প জ্বলছিল। সর্ষপ তৈল দিয়ে মাখা, তাই জ্বালা কমে এল কিছুক্ষণ পর।

আহারাদির পর কাঁঠালগাছের ছায়ায় কিলিঞ্জক পেতে শুতেই ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল। ঘুম ভাঙল বিরূপাক্ষর ডাকাডাকিতে।

‘ও মশায়, ও মশায়! বলি, এখন কি ঘুমাবেন, নাকি হাটে যাবেন? ঘুমাবেন তো উঠান থেকে উঠে ঘরের ভিতরে গিয়ে শয়ন করুন। এখানে অপরাহ্নবেলায় গোসাপ প্রভৃতি রাজপাট পরিদর্শনে আসে!’

উত্তিয় উঠে এক বিচিত্র দৃশ্য দেখতে পেল। বিরূপাক্ষ গাঁতি দিয়ে পরা একটি কার্পাস বস্ত্রের উপর নীল বর্ণের আঙরাখা পরেছে। পক্ক গুম্ফ তৈলমর্দিত। চোখে কাজল, কপালে চন্দনের বিন্দু, শিরোদেশে গাঢ় কমলা বর্ণের উষ্ণীষ। উষ্ণীষের অন্তরাল হতে দুয়েকটি পলিত কুন্তলগুচ্ছ উঁকি দিচ্ছে। গলায় কেতকী পুষ্পের মালা। এক হাতে একটা অতি বৃহৎ বংশদণ্ড। অন্য হাতে একটি ভারী বস্ত্রপুটিকা পরিদৃশ্যমান।

তারই সঙ্গে মেধাকে দেখে আরও বিস্মিত হল উত্তিয়। মেধার সে সলজ্জ কান্তি আর নাই। সে একটি নীল বর্ণের শাটিকা কচ্ছ দিয়ে পরেছে। ঊর্ধ্বাঙ্গে বকপক্ষের মতো শুভ্র উত্তরীয়। উত্তরীয়ের অন্তরাল হতে তার কুচকুসুমের আভাস অনুমিত হয়। কর্ণে বজ্রকুণ্ডল। গলায় জাতী পুষ্পের মালা। নয়নে সুনীল কজ্জল। কপালে উজ্জ্বল সিন্দুর। শিরোদেশে কেশপাশ চূড়াকৃত, একটি কেতকী ফুলমালা কেশচূড়ায় বিলগ্ন হয়ে আছে। তার দুই হাতে দুটি বৃহৎ তরবারি।

চোখ কচলে উঠে বসে উত্তিয় সশব্দে জৃম্ভন পরিত্যাগ করে জড়িত কণ্ঠে বলল, ‘এমন রাজবেশে কোথায় চললেন, ভদ্র?’

বিরূপাক্ষ বলল, ‘আগেই বললাম না আজ বৈকালে হাটে লট্‌ঠিক্রীড়া দেখাতে যাব? আপনি যাবেন নাকি, মশায়?’

—হ্যাঁ, তা যাব বৈকি!

—তবে ত্বরা করুন। আমরা অগ্রসর হচ্ছি। এমনিতেই বেলা সংক্ষিপ্ত। আপনি রেবার ঘাটে মুখহাত ধৌত করে আমাদের পরে আসুন।

এই বলে তারা বাহির হয়ে গেল। যাওয়ার আগে মেধা শুধু অপাঙ্গ দৃষ্টিতে উত্তিয়কে একবার দেখে নিল।

কিছুক্ষণ পর উত্তিয় নদী হতে মুখমণ্ডল ও হস্তপদ ধৌত করে ত্বরিত পদে হট্টের পথে চলল। পায়ে চলা ধুলার পথ। দুপাশে বন্য ঝোপ ও অতিমুক্তলতার জঙ্গল। মধ্যে মধ্যে চূতপাদপ। বসন্তবৌরি পাখির উদাস করা ডাক। পত্রান্তরালে কোনো বৃক্ষশাখায় কাষ্ঠকুট্টের অবিরত চঞ্চুচালনার শব্দ। পথিমধ্যে স্থানে স্থানে হট্টগামী মানুষের উপস্থিতি। নদীর বাতাস। দিগন্তে বিলগ্ন অস্তায়মান সূর্য। মেধাকথলিকার সিন্দুরের মতো রাঙা।

মনে হচ্ছিল, সময়ই বড়ো ঘাতক। সে হনন করে নিঃশব্দে। কর্তন করে না, তুলে নেয়। চিন্তাগুলিকে সে এক এক করে তার ঝুলিতে তুলে নেয়। চিন্তাকে, অভিজ্ঞতাকে। নাহলে কোথায় ছিল উত্তিয় এ সময় গত বৎসর! শ্রেষ্ঠী স্যমন্তকের সুপুত্র সে। কবি হতে গিয়ে সে শব্দপীড়িত হল। হল প্রশ্নশীল। নটী অনঙ্গসেনা…প্রিয় বান্ধবী আত্রেয়ী…জনকপুর গাঁয়ের সেই গায়ক… স্বপ্নদৃষ্ট শবরী নৈরামণি… বিরূপাক্ষ, মেধাকথলিকা… শরতের ছিন্ন মেঘের মতন সে এক মানুষের থেকে অন্য মানুষের কাছে ভেসে চলেছে। এক অভিজ্ঞতা থেকে অন্য অভিজ্ঞতার দিকে। কিন্তু মেঘের মতো উদ্দেশ্যহীন নয় তার মন। তার জিজ্ঞাসার একটি নির্দিষ্ট রূপ আছে। আছে তার সুনিয়ত আকার। কে তার উত্তর দেবে? নৈরামণি বলেছিল, উত্তর দেবে এক বৃদ্ধ আর বালিকা। কই ওরা তো তেমন কিছু বলল না এখনও? এরপর কোথায় যাবে?

ভাবতে ভাবতে হাঁটতে হাঁটতে কিছুদূর যাওয়ার পর হাটের মানুষের সম্মিলিত শব্দ কানে এল। কয়েক পদ অগ্রসর হয়ে সে হট্টমধ্যে উপস্থিত হল। বৈকালবেলায় রেবাতটে পুষ্পাবসান গাঁয়ের হাট বেশ জমে উঠেছে।

অষ্টম অনুবাক   

রেবাতীরে একটি সুবৃহৎ অশ্বত্থবৃক্ষের নিম্নে হাট বসেছে। অশ্বত্থবৃক্ষটি তার বহুলপ্রসারী শাখা হতে অগণ্য ঝুরি নামিয়ে দিয়েছে। সেই সমস্ত শাখামূল অতি প্রাচীন হওয়ায় সম্প্রতি স্থূলাকৃতি স্তম্ভের মতো হয়ে গেছে। ওই স্তম্ভগুলির অন্তরালে একেকটি অস্থায়ী বিপণি বসেছে। ধুলামাটির হাট। বারাণসীর বারবধূরা যে-চন্দনচূর্ণ দ্বারা মুখমণ্ডল প্রসাধিত করে, হাটের ধুলাও সেইরূপ—ঈষৎ রক্তাভ ও সূক্ষ্ম। মানুষের পায়ে পায়ে ও গোশকটের চাকায় চাকায় সেই ধুলা বাতাসে উড়ে গ্রামের আকাশ আরক্তিম করে তুলেছে। হট্টস্থ মানুষের মুখে, নাসারন্ধ্রে, দেহকাণ্ডে, পরিধানের সর্বস্বতায় লাল ধুলার আস্তর।

তৈলভর্জিত খজ্জ, ক্ষীরের মঠ, লড্ডুক ও অন্যপ্রকার নানাবিধ বর্ণিল মিষ্টান্নের বিপণি। কৃষিক্ষেত্র কর্ষণের উপযোগী হলি, গোদারণ, খনিত্র, মুদ্গরের বিপণি। বেতনির্মিত সম্পুট, মঞ্জুষা, চালনী-আদি সুসজ্জিত। তণ্ডূল হতে তুষাদি শোধনের নিমিত্ত প্রস্ফোটন, তণ্ডূলাদি কাঁড়ানোর জন্য অবঘাতের বিতানও আছে। ঢেঁকির মুষল ও উদুখল, গৃহ পরিষ্কার করার জন্য শোধনী, সম্মার্জনী, বহুকরী বহুলপরিমাণে সুবিন্যস্ত রয়েছে। কটাহ, গর্গরী, কলস, সূর্প, পাকপাত্র, ভ্রাষ্ট প্রভৃতি বহুবিধ রন্ধনকার্যের নিমিত্ত প্রয়োজনীয় তৈজসসামগ্রীরও আয়োজন বড়ো কম নয়। সর্বত্র ক্রয়বিক্রয় ও দরকষাকষিজনিত বাগ্‌বিনিময়ে সমস্ত হট্টটি তুমুল শব্দমুখর।

চূতপত্র নির্মিত একপ্রকার পাতার বাঁশি খুব বিক্রয় হচ্ছে। কতগুলি গ্রাম্য বালকবালিকা সেই বাঁশিতে এমন তীক্ষ্ণ ‘পী-ৎ, পী-ই-ৎ’ আওয়াজ তুলছে যে, মনে হয় কলহাস্যমুখর এ হংসপংক্তির কর্ণপটহভেদকারী হংসধ্বনি হতে কখন বহির্গত হব। তারই সম্মুখে শিশুতোষ ক্রীড়নক, বিচিত্র খেলনী, মাটির পুদ্‌গল ও মৃচ্ছকটিকের পণ্যবীথিকা।

কার্পাসবস্ত্র, বারাণসীখ্যাত ক্ষৌমবস্ত্র, শাটিকা, আঙরাখা, উত্তরীয়, অন্তরীয়, স্তনপট্টিকা, দুকূলের বহুবর্ণরঞ্জিত আবরণ-আপণের সম্মুখে এবং কর্ণভূষণ-তাটঙ্ক-কেয়ূর-কাঞ্চী-কিঙ্কিণী-উষ্ণীষ-কুঙ্কুম-লাক্ষারসের আভরণ-আপণের সমীপে বহুভাষিণী কৌতূহলী সুশ্রী পুরললনা ও সুরম্যা বারাঙ্গনাদের সমারোহ।

তারপর গোহট্ট। বৃষভ, গাভী ও ষণ্ডের রম্ভনে পরিপূর্ণ। অপেক্ষাকৃত বলশালী বৃষভসমূহের শৃঙ্গগুলি তাম্র ও হেমমণ্ডিত। স্থানটির বাতাস গোময় ও গোমূত্রের দুর্গন্ধে আবিল হয়ে আছে। সেসব উপেক্ষা করেই ক্রেতা ও বিক্রেতাকুল উত্তপ্ত ও প্রোৎসাহপূর্ণ বাদানুবাদে ব্যাপৃত।

গ্রামের লোক গোধনের প্রকৃতি বিলক্ষণ জানে। যে-বৃষভ বা গাভীর পুচ্ছের নিম্নে হাত রাখলে  দ্রুতবিলম্বিত ছন্দে লম্ফ দিয়ে ওঠে, সে-বৃষ বা গাভী উত্তম মানের অর্থাৎ কৃষিকার্যে, গর্ভধারণে বা দুগ্ধ-ক্ষরণে সমর্থ। আর যে-গোরুর পুচ্ছের নিম্নে হাত রাখলে নড়ে না, চড়ে না, সে নির্জীব নিম্নমানের গোধন। নিম্নমানের গো কৃষিকার্যাদির জন্য কেউ কেনে না। পীতোদক, জগ্ধতৃণ, দুগ্ধদোহ, নিরিন্দ্রিয় গোসমূহ একপাশে পড়ে থেকে পরস্পরের গাত্র লেহন করে আর খড়বিচালি চিবোয়। সেগুলির একমাত্র গতি কসাইখানা। সুপক্ক সুকোমল গোমাংস উত্তম মৈরেয় সহযোগে অতিথিসৎকারে বহুল আদৃত হয়। সম্পন্ন ধনিকের গৃহে অতিথি এলেই অতিথিসৎকারের নিমিত্ত এমন গোবৎস নিধন করা হয় বলে আর্যাবর্তে অতিথির অন্য নামই দাঁড়িয়ে গেছে ‘গোঘ্ন’।

কিন্তু এ শব্দস্রোত, বর্ণস্রোত, জনস্রোতের মধ্যে বিরূপাক্ষ ও বিরূপাক্ষগেহিনীই বা কোথায়? অনেক খুঁজবার পর উত্তিয় হাটের একপ্রান্তে অগণিত যূথবদ্ধ জনতার কলহাস্য ও ‘হো-হো’ শব্দ শুনতে পেল। ওহ, লোকগুলি একেবারে মধুচক্রে মধুমক্ষিকার মতো পুঞ্জীভূত। তারা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে কী যেন দেখে হাততালি দিচ্ছে। সেই ভিড়ের মধ্যে প্রবেশ করে কনুই দিয়ে দুপাশে লোক সরিয়ে অগ্রসর হয়ে উত্তিয় দেখল, জনতার বৃত্তের মধ্যে অনেকটা স্থান পরিষ্কার করা হয়েছে। আর পরিষ্কৃত সেই মণ্ডলের কেন্দ্রে বিরূপাক্ষ ও মেধা দণ্ডায়মান।

বিশেষ এই, বিরূপাক্ষ সরবে কী সব ঘোষণা করছে আর মেধা চক্ষু মুদিত করে জোড়হস্তে চিত্রার্পিতের মতো স্থির মুদ্রায় দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হয়, সে ধ্যানস্থ। চতুর্পার্শ্বস্থ জনতার উল্লাপন বা তার স্বামীর বজ্রনির্ঘোষ—কোনো কিছুই তার কর্ণে প্রবেশ করছে না।

বিরূপাক্ষ উচ্চৈঃস্বরে বলছে, ‘মহাশয়, মহাশয়াগণ! এখন আপনারা কাষ্ঠকন্দুকের ক্রীড়া দেখবেন। স্থির হয়ে দেখবেন, ভদ্রভদ্রাগণ। হাতের কন্দুক হাতেই থাকবে, হাত থেকে পড়বে না। আমার সুন্দরী স্ত্রী আপনাদিগকে এই খেলা দেখাবে। মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করুন।’

এই বলে সে পার্শ্বে রক্ষিত বস্ত্রপুটিকাটি উন্মোচিত করে চারটি গোলাকার কাঠের কন্দুক বাহির করল। তারপর উচ্চনাদে ‘হো-যায়, হো-যায়’ বলতে বলতে প্রথমে দুটি, এক মুহূর্ত পরে আরও দুটি কন্দুক সবলে শূন্যে ছুঁড়ে দিল। আর তখনই মেধা এতক্ষণের ধ্যানমুদ্রা ভেঙে চিত্রল হরিণীর মতো এঁকেবেঁকে দাঁড়াল। শূন্যে দুই হাত তুলে লীলাচ্ছলে আকাশ থেকে দুটি কন্দুক লুফে নিয়ে এক হাত থেকে অন্য হাতে কন্দুক দুটি চালাচালি করতে লাগল। ওই হাত চালাচালির অণুপল অবসরে আকাশ হতে নেমে আসা আরও দুটি কন্দুকও সে অবলীলায় ধরে নিল। এখন সর্বমোট চারটি কন্দুক মেধার দুই হাতের তালুর মধ্যে বৃত্তাকারে ঘুরছে। কোনোটি কোনোটির সঙ্গে ঠোকাঠুকি লাগছে না। চঞ্চল হাতের পাতাদুটি একবার রিক্ত হচ্ছে, পরমুহূর্তেই পূর্ণ হচ্ছে। এইভাবে কতক্ষণ যে চলতে লাগল, বলা যায় না! জনতা সহর্ষে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল। মেধার কৃৎকৌশল দৃষ্টে উত্তিয়ও চোখের পাতা ফেলতে পারছিল না। মেধার দেহকাণ্ড একেবারে স্থির  অথচ করপত্র দুটি বিদ্যুতের রেখার মতো সঞ্চরমাণ।

কিছুক্ষণ পর মেধা একটি একটি করে চারটি কন্দুক সময়ের সামান্য ব্যবধান রেখে রেখে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিতে লাগল। একটি একটি করে চারটি কন্দুক আকাশ বেয়ে এসে ক্রমান্বয়ে বিরূপাক্ষর হাতের তালুবন্দী হল। তখন মেধা পুনরায় নিঃশ্বাস ফেলে পূর্ববৎ চক্ষু নিমীলিত করে চিত্রার্পিতের ন্যায় ধ্যানের ভঙ্গিমায় ফিরে গেল।

বিরূপাক্ষ হাঁপাচ্ছিল। যতই হোক, সে বৃদ্ধ হয়েছে। খেলার উত্তেজনা ও উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণার চাপ বৃদ্ধের ফুসফুস নিতে পারছিল না। কিছুক্ষণ হাঁপানোর পর তার শ্বাস স্বাভাবিক হল। মেধা কিন্তু ঋজু, অকম্প দীপশিখার মতো দণ্ডায়মান। এবার বিরূপাক্ষ পূর্ববৎ উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করতে লাগল, ‘দেখলেন তো, মহোদয়- মহোদয়াগণ! কন্দুক-ক্রীড়া দেখলেন তো? এবার হবে লট্‌ঠিক্রীড়া। তার আগে একবার পূর্ণমাত্রায় করতালি হয়ে যাক!’

বিরূপাক্ষর কথা শেষ হতে না হতেই জনতা সহর্ষ করতালিতে ফেটে পড়ল। সেই চটাপট শব্দ ক্ষণপরে স্তিমিত  হয়ে এলে বিরূপাক্ষ আবার শুরু করল, ‘এ খেলা কিন্তু ভয়ংকর। মুহূর্তের অসাবধানতায় প্রাণসংশয় হতে পারে। তাই আপনাদিগের নিকট বিনীত অনুরোধ, যতক্ষণ না আমরা পূর্ণ ভঙ্গিমায় উপনীত হচ্ছি, ততক্ষণ আপনারা যথাসম্ভব নৈঃশব্দ্য অবলম্বন করবেন।’

জনতা তুষ্ণীম্ভাব ধরে দাঁড়াল। তবু একেবারে নিঃশব্দ নয়। অল্পবিস্তর গুঞ্জন চলছেই। সেই গুঞ্জনের ভিতর মেধা ধ্যান ভেঙে বস্ত্রপুটিকার ভিতর হতে দুটি শানিত তরবারি বের করে দুই কোমরে কোষবদ্ধ করে তার স্বামীর নিকটে সরে এল। বৃদ্ধ বিরূপাক্ষ কেন জানি পদদ্বয় দুইপাশে সামান্য প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে সেই বৃহৎ বংশদণ্ডটি। কাছে আসামাত্রই বিরূপাক্ষ মেধাকে নিম্নস্বরে কিছু বলছে মনে হল। উত্তিয় একেবারে সামনের সারিতে খুব কাছে দাঁড়িয়েছিল বলেই তাদের কথালাপ শুনতে পাচ্ছিল।

বিরূপাক্ষ বলছে, ‘বউ, শোন! এ সব্বোনেশে খেলাটা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, সে তুই ভালই জানিস। একটু সাবধান থাকবি।’

মেধা উত্তর দিল, ‘কিচ্ছু হবে না। তুমি চিন্তা কোরো না তো!’

বিরূপাক্ষ বলল, ‘না রে বউ চিন্তা হয়। আমার আর কী! আমার বয়স হয়েছে। তোর এই কাঁচা বয়েস! শোন, বলি কী, আমি তোর দিকে নজর রাখব আর তুই আমার দিকে খেয়াল রাখবি। তাহলে আর বিপদ হবে না।’

মেধা হেসে ফেলে বলল, ‘তা নয় গো! ওকথা ঠিক নয়। কথাটা ঠিক ওর উলটো। তুমি তোমার হাত-পায়ের দিকে নজর রাখবে আর আমি আমার হাত-পায়ের দিকে নজর রাখব। তাহলেই সব ঠিক থাকবে… তা হ্যাঁ গো, তোমার শরীরটা ভালো তো? আমার ওজন নিতে পারবে? একটু যেন মোটা হয়েছি আগের থেকে।’

বিরূপাক্ষ মেধার হাসিতে যোগ দিয়ে বলল, ‘কী যে বলিস, খুকি? এই তো সেদিন তোকে উনুনের পাশ থেকে তুলে সটান পাঁজাকোলা করে শয্যায় নিয়ে গেলাম! তুই তো পালকের মতো হাল্কা রে!’

একথায় মেধা লীলাকৌতুকী বিদ্যুতে ‘খিল্‌ খিল্‌’ করে হেসে উঠল।

জনতার ধৈর্য আর বাঁধ মানছে না দেখে মেধা সহসা তার স্বামীকে জড়িয়ে ধরল। মনে হল, সে যেন বিরূপাক্ষকে আলিঙ্গন করছে। জনতাও ওই কথা ভেবেই ঠা-ঠা হেসে উঠল। কিন্তু না, আলিঙ্গন নয়। আদিম সর্পিণীর মতো সে বিরূপাক্ষর দেহ বেয়ে উপরে উঠছে। কিছুটা খর্জুর বা তালবৃক্ষ বেয়ে রস-আহরণকারীরা যেভাবে ওঠে, অনেকটা সেইরকম। ইতোমধ্যে বিরূপাক্ষও শিরোদেশ পশ্চাদ্দিকে হেলিয়ে সেই দীর্ঘ বংশদণ্ড বা লট্‌ঠিটি নিজের মুখগহ্বরে উলম্বভাবে আকাশমুখো করে স্থাপন করেছে। এদিকে লোকজন উচ্চরোলে গলা ফাটাচ্ছে। এমন সময় কে একজন বয়স্ক লোক সেই হৈহৈকারের ঊর্ধ্বে গলা তুলে সজোরে ধমক দিয়ে বলল, ‘চোপ! চোপ! একদম চোপ! একটু আগে কত্তা কী বলল, তোদের খেয়াল নাই? একদম চুপ করে থাকবি। বুড়া বাঁদরগুলিই সব থেকে বেশি চ্যাঁচায় বটে!’

লোকটির কথায় কাজ হল। কী দুচার কথা বলেই সবাই চুপ করল। মেধা ততক্ষণে তার স্বামীর কাঁধের উপর দুই পা দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। তারপর সে বিরূপাক্ষর মুখগহ্বরে স্থাপিত আকাশমুখী উলম্ব বংশদণ্ড বেয়ে উপরে  উঠতে লাগল। উপরে উপরে আরও উপরে… অবশেষে মেধা বংশদণ্ডের একেবারে অন্তিম প্রান্তভাগ দুই পা দিয়ে জড়িয়ে উদ্যত ফণা দুধরাজ সর্পের মতন সোজা হয়ে দাঁড়াল। বিরূপাক্ষর বৃদ্ধ শরীর থরথর থরথর করে কাঁপছে।  মেধা কটিদেশ থেকে তরবারি দুটি  বের করে দুই হাতে নিয়ে পাখির ডানার মতো শূন্যে দুটি হাত ছড়িয়ে দাঁড়াল। এক পা সেই বংশদণ্ডের অন্তিমভাগ জড়িয়ে, আরেক পা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে দাঁড়িয়েছে। তাকে দেখাচ্ছে এখন সূর্যাস্তবেলায় নীড়ে প্রত্যাবর্তনরত  পাখিটির মতো। কিছুক্ষণ ওইভাবে থেকে সে পুনর্বার তরবারি কোষবদ্ধ করল। তৎপশ্চাৎ পূর্ণ চক্রাসনে ধনুকের মতো দেহকাণ্ডটি বাঁকিয়ে দুই হাত দিয়ে নিজপদদ্বয় স্পর্শ করল। আবার উঠে দাঁড়িয়ে সোজা হয়ে সেই দুহাতে দুই তরবারি নিয়ে পাখির মতো বাঁশের উপর ভেসে থাকল। তার চোখদুটি ঈগলের মতো লাল ও উজ্জ্বল। নীচে বিরূপাক্ষর মুখ যন্ত্রণায় নীল। ওই অবস্থায় মেধা মুখে বিচিত্র শব্দ করতে লাগল, ‘ডম্‌, ডম্‌ ডমড্ডম্‌! দম্যতে, দীয়তে, দয়ধ্বম্‌! দ-দ-দ!’

জনতা ইঙ্গিত বুঝে এবার সানন্দে করতালিধ্বনিতে ফেটে পড়ল। আর এক মুহূর্তও কালক্ষেপ না করে ত্বরিত বিজুরির মতো, জ্যামুক্ত ধনুকের মতো, নিষ্ক্রান্ত বাঘিনীর মতো শূন্যে লাফ দিয়ে মেধা বংশদণ্ডের উপর হতে মাটির উপরে উড়ে এসে ঘুরে দাঁড়িয়ে পড়ল। সমবেত লোকজন প্রশংসাবাক্যে মুখর হয়ে স্বতঃস্ফুর্তভাবে মাটির উপর মুদ্রা  নিক্ষেপ করতে লাগল। কিছুক্ষণ শ্বাস নিয়ে বিশ্রাম করে মাটি হতে কড়ি, মুদ্রা কুড়িয়ে নিতে শুরু করল মেধা। এই তাদের আজকের পারিশ্রমিক। বৃদ্ধ, পরিশ্রান্ত বিরূপাক্ষ জানু মুড়ে একপাশে বসে পড়েছে। অবনত হয়ে মুদ্রা আহরণ করতে করতে জনতার ভিড় ক্রমশ লঘু হচ্ছে দেখে কাছে সরে এসে বিরূপাক্ষকে আলগোছে জড়িয়ে ধরে মেধা বলল, ‘কী গো! তোমার ব্যথা লাগেনি তো বেশি?’

বিরূপাক্ষ চোখ মটকে হেসে বলল, ‘আরে, না, না! বলেছিলাম না, তুই পাখির পালকের মতো হালকা।’

রাত্রি গাঢ় হয়েছে। বিরূপাক্ষগৃহের রন্ধনশালায় স্তিমিত প্রদীপ জ্বলছে। মেধা-বিরূপাক্ষর লট্‌ঠিক্রীড়ায় আজ ভালোই উপার্জন হয়েছে। হট্ট হতে অন্যান্য দ্রব্যের সঙ্গে তারা দুটি তাল ও চাউলচূর্ণ ক্রয় করে এনেছে। বিরূপাক্ষ ও উত্তিয় উনুনের ধারে আসন করে বসেছে। মেধা নিভন্ত উনুনে তালের পিঠা প্রস্তুত করছে ও তাদের পাতে গরম গরম পিঠা পরিবেশন করছে। সঙ্গে তালের ক্ষীরও আছে। খেতে খেতে বিরূপাক্ষ বলল, ‘কী, মশায়? লট্‌ঠিখেলা কেমন দেখলেন?’

তালপিঠা চর্বন করতে করতে উত্তিয় বলল, ‘অপূর্ব! আপনাদের দক্ষতা আমাকে মুগ্ধ করেছে।’

—দক্ষতা তো আমার জাদুকরীর। আমি তো ভারবহন করি মাত্র।

—সেই আর কম কী? শুধুই কি ভারবহন? ভারসাম্য রক্ষা নয়?

—তা আপনি বলতে পারেন। তবে গাঁয়ের লোক একে জাদুবিদ্যা বললেও এ খেলা কিন্তু জাদুবিদ্যা নয়।

—ঠিকই। এখানে ইন্দ্রজাল-মায়া নাই। এ হল অসাধারণ শারীরিক কসরৎ এবং ভারসাম্য রক্ষার খেলা।

—আমার জাদুকরীর শারীরিক সামর্থ্য এবং ভারসাম্যবোধ কেমন দেখলেন?

—অনন্যসাধারণ। আচ্ছা, উনি কি এ খেলা ওঁর পিতার নিকট শিখেছিলেন?

—তা ওঁকেই জিজ্ঞাসা করুন না!… কী বউ, বল!

মেধা একটু সলজ্জ হেসে চাটুতে করে আরেকটি পিঠা উত্তিয়র পাতে দিয়ে সুমিষ্ট স্বরে বলল, ‘আপনি কিছুই খাচ্ছেন না। কেবল কথা বলছেন। পাতে এখনও অনেকগুলি পূপ পড়ে আছে।’

হয়ত হাটে খেলা দেখানোর পর বা অন্য কোনো কারণে উত্তিয়র সম্মুখে মেয়েটি সামান্য লজ্জাভাব পরিত্যাগ করেছে। উত্তিয় বলল, ‘তা না হয় খাচ্ছি। তালের পূপ আমার খুবই প্রিয়। কিন্তু আপনি তো আমার কথার উত্তর দিলেন না?’

মেধা হেসে বলল, ‘আপনি যে এ খেলাকে সম্পূর্ণ শারীরিক কসরতের খেলা ভেবেছেন, তা কিন্তু সত্য নয়। এ খেলা যত না শারীরিক, ততোধিক মানসিক। আগুলফশিরোদেশ দেহের প্রতিটি অঙ্গ এবং মনের উপর পূর্ণ আধিপত্য প্রয়োজন।’

—আচ্ছা! আমি কিন্তু আপনাদের একটি কথা শ্রবণ করে ফেলেছি। আপনি বলছিলেন, দুজন মানুষ—এ ওর দিকে নজর রাখলে চলবে না। যে যার নিজের দিকে খেয়াল রাখলে তবেই স্বসচেতন দুটি মানুষের সমবায়ে এ খেলা সম্ভব।

তাদের দুজনের নিভৃত বাগ্‌বিনিময় অতিথি শুনে ফেলেছে জেনে মেধা সামান্য লজ্জিত হল। কিন্তু তারপরেই লজ্জা কাটিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, এই কথাটাই তো উনি বুঝতে চান না। কায়-বাক্য-মনের সকল কাজের উপর সদা মনোযোগী হলেই একাধিক মানুষের সমবায়ে সফলতা পাওয়া যায়।’

উত্তিয়র মনে হল যেন আলো আসছে মেধার কথায়। কিন্তু এও মনে হল, একথা মেধার নিজস্ব নয়। যদিও মেধাকথলিকা এটি অভ্যাস করেছে, তথাপি এ তত্ত্ব সে আর কারও কাছে শুনেছে।

বিরূপাক্ষ বলল, ‘মেধা এ খেলার কৌশলটি তার পিতার কাছে শিক্ষা করেছে ঠিকই। তবে এখন যে-কথাটি বলল, সেটি ও অন্যত্র শিক্ষা করেছে…ওর গুরুর নিকট হতে…’

উত্তিয় অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কে ওঁর গুরু, আমি কি জানতে পারি?’

কটাহে পিষ্টক পাক করতে করতে অন্যমনস্ক সুরে মেধা বলল, ‘তাঁর নাম জ্ঞানপ্রভ আরণ্য। যোগীপুরুষ। নর্মদাতীরে গিরিগুহাশয়ী তাঁদের মঠ। আমাদের গ্রামে পরিব্রাজক হয়ে এসেছিলেন। তিনদিন আমাদের গৃহেও ছিলেন। আমি তখন বালিকা। তিনিই আমাকে এই মনঃসংযমের শিক্ষা দেন।’

উত্তিয় একেবারে চমৎকৃত হয়ে গেল।

খাওয়ার পর কাঁঠালতলায় অন্ধকারে সে আর বিরূপাক্ষ বসে ছিল। ঘরে বেশ গরম। বাহিরে হাওয়া দিচ্ছে। আকাশে চাঁদ আছে। কখনও কখনও মেঘের পালক ঢেকে দিচ্ছে চাঁদের মুখ। আবার হাওয়া লেগে মেঘপালক সরে যাচ্ছে। চাঁদ মেঘের অন্তরাল থেকে কৌতুকপ্রবণ শিশুর মতো উঁকি দিতে দিতে বেরিয়ে এসে যেন বলছে, ‘এই আমি এখানে। ধর না, ধর!’

চাঁদ আর মেঘের লুকোচুরি খেলা দেখছিল উত্তিয় বসে বসে। বিরূপাক্ষ কাছে বসেই তামাক টানছে। কিছুক্ষণ পর চাঁদ-জলদের খেলা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে উত্তিয় অনুচ্চস্বরে বিরূপাক্ষকে ডাকল, ‘ও মহাশয়, শুনছেন?’

বিরূপাক্ষ তামাক খেতে খেতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। সহসা উত্তিয়র ডাকে সম্বিৎ ফিরলে সে বলে উঠল, ‘অ্যাঁ—? হ্যাঁ। কিছু কি বলবেন, মশায়?’

—বলছিলাম, আমি কল্য প্রাতে চলে যাচ্ছি।

—সে কী! আর বুঝি আমাদের ভালো লাগছে না?

—না, না। তা নয়। এখানে আমি এত ভালো আছি যে, মাসের পর মাসও থেকে যেতে পারতাম। কিন্তু আমার এক জায়গায় যাওয়ার আছে। কাল প্রাতেই রওয়ানা হব।

—কোথায় যাবেন? বলা সম্ভব?

—ভাবছি, নর্মদাভিমুখে যাব।

—জ্ঞানপ্রভ আরণ্যের আশ্রমে?

—আশ্চর্য! আপনি কী করে বুঝলেন?

—দেখুন, মশায়, আমার অনেক বয়স হয়েছে। আমার যদি যথাকালে পুত্র হত, তবে সে এতদিনে ঠিক আপনারই বয়সী হত। লোক দেখেছি জীবনে কম নয়। আপনার চক্ষু দেখে মনে হয়, আপনি কিছু খুঁজছেন। সে বস্তু এ জগতের কোনো বস্তু নয়। আমার জাদুকরীর কথায় আপনার জ্ঞানপ্রভ আরণ্যের আশ্রমে যাওয়ার ইচ্ছা হয়েছে। যদি তিনি আপনাকে সে-বস্তুর সন্ধান দিতে পারেন। কেমন কিনা?

—ঠিক। আপনার অনুমানশক্তির প্রশংসা করতে হয়। আমি আর এখানে বিলম্ব করতে পারব না। নর্মদাই যাব স্থির করেছি।

‘বেশ’, এই বলে কয়েক মুহূর্ত বিরূপাক্ষ অন্ধকারের ভিতর স্থির হয়ে রইল। তারপর আশ্চর্য কোমল কণ্ঠে বলল, ‘তবে আমারও আপনাকে একটি কথা বলার ছিল। একটি অনুরোধ।’

উত্তিয় বিস্মিত হয়ে অন্ধকারে চোখ মেলে বলল, ‘বেশ তো, বলুন না। আমি আমার যথাসাধ্য…’

বৃদ্ধ সতর্কস্বরে বলল, ‘এখানে নয়। মেধা এখনও ঘুমোয়নি। রাত্রিকালে শব্দ দ্রুত ভ্রমণ করে। চলুন, বাহিরে যাওয়া যাক।’

বিরূপাক্ষকে অনুসরণ করে উত্তিয় মুন্দিবেড়ার আগড় পেরিয়ে অস্পষ্ট গ্রামপথে বেরিয়ে এল। বিরূপাক্ষ তার সামনে সামনেই হাঁটছে। পথের দুপাশে বন্যঝোপের উপর দিয়ে জোনাকি উড়ে যাচ্ছে, ফিরে এসে বসছে। কী জানি, বিরূপাক্ষ তাকে কী বলবে।

গৃহ থেকে বেশ কিছুটা দূরে এসে একটা প্রায়ান্ধকার গাছতলায় দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ শান্ত স্বরে বলল, ‘এখানে বলা যায়। আপনাকে দেখে আমার খুবই বিশ্বস্ত ও সজ্জন মনে হয়েছে। তাই আপনাকেই বলছি।’

—বলুন।

‘আপনাকে একটা দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অনুরোধ করব’, বৃদ্ধ বিরূপাক্ষর কণ্ঠে সকরুণ আর্তি।

‘আপনি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন কী দায়িত্ব’, উত্তিয় বলল।

—দেখুন, আমি বৃদ্ধ হয়েছি। জ্যোতিষীগণ বারংবার বলেছেন, আমার মৃত্যু সন্নিকট। ষাটের উপর আমি বাঁচব না। দীর্ঘকাল আমি একাকী জীবনে অভ্যস্ত হয়েছিলাম। তারপর মেধা এল। তাকে ভালোবাসলাম, ঘর বাঁধলাম। তারই উৎসাহ বেশি। আমাকে বড়ো ভালোবাসে। আমার একার জীবনে সে অনেক শান্তি, অনেক সেবা দিয়েছে। দিচ্ছেও। আমিও তাকে ভালোবাসি, কিন্তু ভালোবাসার থেকেও গভীরতর স্নেহ আমার তার প্রতি। সে আমার স্ত্রী, স্ত্রীরূপেই তাকে ভালোবাসি। কিন্তু সে আমার কন্যার বয়সী। এখনও ছেলেমানুষী পূর্ণমাত্রায়…

বিরূপাক্ষ দম নেওয়ার জন্য থামল। উত্তিয় কিছু বলছিল না। মনে হচ্ছিল, বৃদ্ধ আরও কিছু বলবে। কিন্তু কী বলবে, উত্তিয় বুঝতে পারছিল না। উত্তিয় অপেক্ষা করছিল।

বিরূপাক্ষ বলল, ‘এই সরলা মেয়েটি মেধা! আমার মৃত্যুর পর তার কী হবে, কোথায় যাবে? কিছুই তো তার সাধ মিটবে না। অথচ তখনই তো আসবে তার যৌবনকাল। চতুর্দিকে শ্বাপদসম হিংস্র মানুষ। আমি চলে গেলে সে কী করবে, কীভাবে থাকবে, এই চিন্তাই আমাকে আকুল করে তোলে। বড়ো স্নেহের কাঙাল এই মেয়েটি আমার… তাই বলছিলাম, আমার মৃত্যুর পর আমার স্ত্রীর দায়িত্ব নিতে পারবেন আপনি? মেধা যাতে সুখে থাকে, আনন্দে থাকে, তাকে যেন কেউ অপমান না করে, সে যেন আদর-যত্ন-ভালোবাসা পায়, তার সাধগুলি যেন মেটে… আপনি দায়িত্বশীল, উদারহৃদয়, সজ্জন…’ বলতে বলতে বিরূপাক্ষ উত্তিয়র হাতদুটি চেপে ধরে। উত্তিয় অন্ধকারে অনুভব করে, বৃদ্ধ অঝোরধারে কাঁদছে।

কী আশ্চর্য মানুষের সঙ্গে দেখা হল আজ তার! ভালোবাসা এমন হয়? এত ভালোবাসা, এত কান্না, এতরকমের কান্না ঈশ্বর মানুষের বুকের ভিতর যে দিয়েছেন কেন!