অমৃতরতি 

রূপায়ণ ঘোষ 
মধ্যরাত্রি প্রায় সমাগত সমস্ত জনপদ নিদ্রার গভীরে আচ্ছন্ন তথাপি শীতল বাতাসের আবহে ঝিরঝির বর্ষণ এই রাত্রিকে আরও অধিক রহস্যময় করে তুলেছে। গ্রামের অভ্যন্তরে বাশুলী মন্দির; সংলগ্ন কুটিরের ভিতর থেকে প্রদীপের মৃদু আভা ভেসে আসছে। জনৈক ছায়ামূর্তি মানুষের জাগ্রত উপস্থিতি লক্ষ্য করে সতর্ক হল।
অন্ধকারে মিশে ধীরে ধীরে সে পৌঁছয় জানালার কাছে। হাতের সামান্য চাপে সেটার কিছুটা অংশ ফাঁক হল, ঘরের ভিতর রেড়ির প্রদীপ জ্বলছে, আলপনাকৃত দেয়ালগুলিতে শোভা পাচ্ছে শর, পাট দ্বারা প্রস্তুত বিবিধ ক্ষুদ্র সামগ্রী। মাঝখানে চৌপায়ার উপর বসে নিমগ্ন চিত্তে কলম চালনা করে চলেছে অনিন্দ্যকান্তি এক পুরুষ। ছায়ামূর্তিটি ভালো করে চেয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ; তাহলে ইনিই সেই! গ্রামে গ্রামে, লোকমুখে যাঁঁর কথা শুনে এসেছে, যাঁঁর পদের মাধুরীতে আচ্ছন্ন এই তামাম রাঢ়ভূমি। জানালার আর একটু নিকটে সরে এসে চিনতে বিন্দুমাত্র ভুল হল না তার। বর্ণনার সাথে পরিপূর্ণ মিলে যায় ওই অপূর্ব মুখমণ্ডলখানি। ইনিই বহুখ্যাত বাশুলী সেবক চণ্ডীদাস আর এটিই নান্নুর গ্রাম। মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালো সে; প্রবল বর্ষণ ও আঁধারেও পথ ভুল হয়নি। ছায়ামূর্তিটি কিন্তু বেশ হতাশ হয়েছে বোঝা যায়। সম্ভবত সে আশা করেছিল অসংখ্য পার্ষদসহ চণ্ডীদাস আপন গৃহে অবস্থান করছেন। অথচ প্রায় জঙ্গলাকীর্ণ অর্ধভগ্ন মন্দির পার্শ্বে এতখানি নিঃশব্দতায় তাঁকে নিবিষ্ট দেখে আগন্তুক বিস্মিত হল। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়- তার উপর ঝিরিঝিরি জলের প্রবাহ এবার বদলে যেতে শুরু করল মুষলধারায়, মৃদু বাতাস ক্রমশ দমকা হাওয়ার রূপ নিতে আরম্ভ করেছে! অর্ধোন্মুক্ত জানালা ভেদ করে প্রবল বাতাস ভিতরে ঢুকতেই লেখনী সামগ্রীগুলি ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে। ব্যতিব্যস্ত চণ্ডীদাস আসন ত্যাগ করে জানালার দিকে তাকালেন।আধো-অন্ধকারে তখনই তার দৃষ্টিগোচর হল কৃষ্ণকায় ছায়ামূর্তিটিকে; সম্ভবত বর্ষণমুখর রাত্রির দাপটে ক্লান্ত পথিক। নিশ্চয়ই আশ্রয় প্রত্যাশী।
বাতায়নের আর একটু নিকটে এসে তিনি উচ্চকণ্ঠ প্রয়োগ করলেন, “বাহিরে কে? যদি পথিক হউ, ভিতরে এসো, ভয় নাই।”
জনৈক ব্যক্তি ধীর পদক্ষেপে সেখান থেকে সরে দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হল। মুহূর্তের মধ্যে কড় কড় শব্দে বজ্র পতনের নিনাদ শোনা গেল।
অর্ধসিক্ত অবস্থায় কুটিরে প্রবেশ করতেই হতভম্ব হয়ে পড়ল সে। অপূর্ব রুপ-লাবণ্য খোদিত এমন পুরুষ সে ইতিপূর্বে দেখেনি।
চণ্ডীদাস মৃদু হাসলেন, “তোমার বস্ত্রগুলি সিক্ত হয়ে পড়েছে, বদলে ফেলা ভালো। নয়তো অসুস্থতার কারণ হতে পারে।”
পাট ভাঙা ধুতি পড়ে ব্যক্তিটি চণ্ডীদাসের সম্মুখে উপস্থিত হল। ইতিমধ্যে বায়ু চলাচলের সমস্ত পদগুলি বন্ধ করে লেখার সামগ্রীগুলি পুনরায় সাজিয়ে, কবি আবার নিজ আসন গ্রহণ করেছেন। অভ্যাগতকে বসবার নির্দিষ্ট স্থান দেখিয়ে স্মিতহাস্যে প্রথম কথা বললেন, “তোমার নামটি তো জানা হল না। কোথা হতে আসছ?”
ধুতি এবং উত্তরীয়র আড়ালে অস্ত্রখানি গোপন রাখতে বেগ পেতে হচ্ছিল, তবুও কোনোক্রমে সেটা লুকিয়ে রাখা আবশ্যক। শরের আসন গ্রহণ করতে করতে আগন্তুক উত্তর দিল, “আমি গৌড় হতে আসছি ঠাকুর। আহমেদ আফগানি নামেই নবাবের ফৌজে আমি সমধিক পরিচিত।”
“নবাবের সেনানী!”- চণ্ডীদাস সভয়ে চেয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর আস্তে আস্তে হাত জড়ো করলেন, “আমি কি কিছু অন্যায় করেছি? নয়তো নবাবের সেনা এই ভগ্ন কুটিরে কেন?”
হুকুম ছিল এই বিধর্মী কবিকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়ার কিংবা বিপদের আশঙ্কা তৈরি হলে বিনা বাক্যব্যয়ে হত্যা করার। কিন্তু আহমেদ আফগানি সেই প্রবল আদেশ যেন বিস্মৃত হল!
অপরূপ এই মানুষটিকে প্রত্যক্ষ করবার পরমুহূর্ত থেকেই হৃদয়ের গভীরে অদ্ভুত এক আলোড়ন টের পাচ্ছে সে। তার কথনভঙ্গিতে ব্যস্ত হয়ে উঠল আফগানি, “তৌবা ঠাকুর এ আপনি কী করছেন। আমার মতো সামান্য একজন সৈন্যের কাছে হাতজোড় করা আপনার উচিত নয়।”
চণ্ডীদাস সামান্য হাসলেন, “তোমাতে আর আমাতে কী ভেদ খুঁজে পাচ্ছ গো? ধম্ম আর পদ আলাদা হলে বুঝি মানুষও পৃথক হয়?”
আহমেদ মাথা নত করে মাটির দিকে চেয়ে রইলেন; তার হৃদয়ের মধ্যে তোলপাড় চলছিল। সত্যিই তো, আল্লাহর কাছে সকলেই পাক-এ-আজিম্। মানুষের নিকট প্রতিটি মানুষই তো সমান, সুন্দর। চণ্ডীদাস ততক্ষণে তাঁঁর পদটি মোহময় কন্ঠে ধারণ করেছেন। আফগানির দিকে গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে চলেছেন তিনি, “শুনহ মানুষ ভাই/ সবার উপরে মানুষ সত্য/ তাহার উপরে নাই।” তারই মাঝে মুহুর্মুহু বজ্রবিদ্যুতের যুগপৎ শব্দ-দাবানলে চতুর্দিক পরিব্যাপ্ত হয়ে উঠছিল। চণ্ডীদাসের উদাত্ত কণ্ঠে তখন একই পদ বারংবার ধ্বনিত হচ্ছে। অশ্রুসিক্ত আফগানি কাতরস্ব‍রে নিবেদন করে চলেছে, “ঠাকুর আর একটিবার শুনি, তৌবা করি। এ যে আল্লাহর বাণী! তিনি মহাশূন্য হতে আপনার শরীরেই নেমে এসেছেন; ইবাদতে-রহেম-খুদা…” বলতে বলতে প্রার্থনারত আহমেদ আফগানি কবির পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল।
                                       ।।দুই।।
রাত্রির তৃতীয় প্রহর ছুঁয়ে নিশাচর পক্ষীগুলি উড়ে যাচ্ছে অবিরাম। ভবনের বাইরে দুইটি কুকুর কোথাও কেঁদে চলেছে এক সুরে। কিলগির খাঁ-র চক্ষুদ্বয় অনিদ্রাজনিত কারণে উন্মুক্ত। শয্যায় ছটফট করতে করতে একসময় তিনি উঠে বসলেন- নাহ, এভাবে পরাজিত হওয়া শাসকের শোভা পায় না। বিস্মিত হয়ে পড়েছেন তিনি-  সামান্য এক  ঠাঁইনাড়া কবি, সে পরাস্ত করছে রাঢ়াঞ্চলের জায়গিরদারকে! তাও অস্ত্র নয়, শস্ত্র নয়- কেবল সাধারণ খাগের কলমে!
ক্ষুব্ধ কিলগির খাঁ শয্যা ত্যাগ করে অলিন্দে এসে দাঁড়ালেন। বর্ষণ স্থগিত হয়ে এসেছে, মেঘের নাগাড়ে জেদ সরিয়ে খণ্ড তরমুজের মত চাঁদ স্পষ্ট হচ্ছে। শীতল চন্দ্রালোকে দেওয়ান সামান্য শান্ত হয়ে এলেন যেন। চতুর্দিক কী অসামান্য! এ সময় তো প্রকৃত ভালোবাসার…
মুহূর্তে মতিবিবির কথা মনে পড়ল তার। কিলগির দৃপ্ত পায়ে যনানখানার ভিতরে প্রবেশ করলেন। মতিবিবির কক্ষের সম্মুখে এসে কয়েক পলের জন্য থমকে দাঁড়ালেন তিনি। ভিতর থেকে দু-তিনটি কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে গুনগুন করে। প্রবল সতর্ক পদক্ষেপে ঢুকে এলেন কিলগির, অজস্র রঙিন পর্দার আড়ালে হারাতে সময় লাগল না তাঁঁর। অতি নিকট হতে তিনি ক্রুদ্ধ, বিস্মিত ভঙ্গিতে চাক্ষুষ করলেন মতিবিবি ও অন্যান্য বেগমদের। তাঁঁর আপন নারীরা ধ্যানস্থ। মৃদুমন্দ স্বরে বিভোর ভঙ্গিমায় গেয়ে চলেছে চণ্ডীদাসের পদগান; তাদের সকলের চোখ আশ্চর্য অশ্রুময়!
ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছিল এই দৃশ্য। ধীরে ধীরে হারেম থেকে বেরিয়ে এলেন দেওয়ান-ই-হুকুম।
অলিন্দ জুড়ে দীর্ঘ অন্ধকার। প্রহরীরা ক্লান্ত, রাত্রি জাগরণের শ্রম তারা পুষিয়ে নিচ্ছে শেষ প্রহরে। কোনওখানে জনমানব নেই। তবু কেমন এক অস্বস্তি উপলব্ধ হচ্ছে কিলগিরের; মনে হচ্ছে চারপাশে কারোর ছায়া যেন শৃঙ্খল বন্দি করতে চায়ছে তাঁকে। যেন ছায়ামূর্তির মধ্যে থেকে ভেসে আসছে এক অপার্থিব রিনরিনে সুর, তুলসীর মালার ছপছপ শব্দ। নিশ্চয়ই, এ নিশ্চয় চণ্ডীদাস- ক্রোধোন্মত্ত ব্যাঘ্রের মতো অসীম শূন্যে হাতে ছুড়তে থাকলেন তিনি, প্রতিটি পদক্ষেপে যেন এক সামান্য গেঁয়ো কবি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী! শাণিত অস্ত্রের মতোই যেন সম্মুখে দণ্ডায়মান সে।
অস্থির কিলগির খাঁ গলদঘর্ম দেহে নিজ কক্ষে ফিরে এলেন। দেহরক্ষীদ্বয় ব‍্য‍স্ত হয়ে উঠল, “হুজুর তবিয়ত খারাপ? কোবরেজকে খবর দিই?”
হাতের ইশারায় ওদের স্তব্ধ করলেন কিলগির। শুষ্কপ্রায় কন্ঠে থেমে থেমে উচ্চারণ করলেন, “পানি।”
জল পান করে শরীরে স্থিরতা এল। অনেকটা সময় পেরিয়ে প্রায় শব্দশূন্য কণ্ঠে বললেন, “আক্রম খাঁ-কে খবর পাঠাও, বলো সশস্ত্র যেন আমার সম্মুখে উপস্থিত হয় এখনই। সসৈন্য তাকে দক্ষিণে নান্নুর যাত্রা করতে হবে। চণ্ডীদাসকে আমার চাই জিন্দা নয়তো মুর্দা।”
                                      ।।তিন।।
সমস্ত রাত্রিকাল বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একের পর এক পদ শুনে যাচ্ছিল আহমেদ আফগানি- বিভোর, মন্ত্রমুগ্ধ। ধারাবর্ষণ সমাপ্ত হয়েছে, ক্ষীণ আলো ফুটে উঠছে চরাচরে। তার উজ্জ্বল ভাব-গভীর মুখাবয়বের দিকে চেয়ে ক্রমশ মন্দ্র হয়ে এলেন চণ্ডীদাস। সামান্য থেমে মৃদু শব্দে আফগানিকে ডাকলেন তিনি। ভাবে লীন আফগানি যেন সংবিৎ ফিরে পেল, “এ কি শুনালেন ঠাকুর, প্রাণ শীতল হয়ে আসছে। কিন্তু এত এত লেখায় কোথাও আদমি আর আওরতের মহব্বঁতের কথা নাই। মহব্বঁত কি সাচ্চা জিনিস নয় ঠাকুর?”
ঈষৎ হাসলেন চণ্ডীদাস, “তুমি ঠিক বলেছ আহমেদ, প্রেম অবশ্যই সত্য,শিব। নারী ও পুরুষ মিলেই তো সৃষ্টি। কিন্তু সেখানে যে কামের বাসা, মোহের বিচরণ, আকাঙ্ক্ষার উল্লাস- সেখানে ঈশ্বরের সাধনা কোথায়!” কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি, দুজনেই সতর্ক শ্রবণে তীব্র হিসহিসানি অনুভব করলেন ঘরের মধ্যে। কিছু দূরে দেওয়ালের ফাটল ঘিরে দুটি শ্বেত-গোখরো- পরম আশ্লেষে পরস্পরকে জড়িয়ে মগ্নশিস্ হাওয়ার গতিপথে ফণা দুলিয়ে চলেছে। বড় অদ্ভুত সেই দৃশ্য! নিস্পন্দ তাঁরা বহুক্ষণ সেদিকে চেয়েছিলেন, ক্রমশ সর্পযুগলের দেহ-দু’খানি পরিপূর্ণ মৈথুনের আকারে সজ্জিত হচ্ছিল এবং সেভাবেই শ্লথ গতিতে মাটির নরম ফাটল বেয়ে  তারা হারিয়ে গেল একসময়। আফগানি স্মিতহাস্যে চণ্ডীদাসের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল, “এ সোহাগে কি ছিল ঠাকুর, কামনা?”
“ছিল না?”- শিহরিত চণ্ডীদাস প্রতিপ্রশ্ন করে বসলেন।
“নাহ”- সামান্য নীরব থেকে পুনরায় উত্তর করল আহমেদ আফগানি, “বরিষা তো সাপেদের মিলনকাল। তাদের প্রেম, মহব্বঁত কেবল কামনার জন্য নয়, আওলাদের জন্য, নতুন জীবনের জন্য- তফলিফের কারণে।”
কবি অপলক নেত্রে তার দিকে তাকিয়েছিলেন, চমক ভাঙলো অপরিচিত একটি কণ্ঠস্বরে। অস্ত্রধারী একজন সৈন্য দ্বারপ্রান্তে দণ্ডায়মান। বাইরে তাকালেন চণ্ডীদাস; ব্রহ্মালোকে ভেসে যাচ্ছে প্রকৃতি। অরূপ নক্ষত্রগুলি হীরকখণ্ডের ন্যায় চূর্ণীকৃত আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবী লক্ষ্য করে। বড় স্নিগ্ধ এই বর্ণাতীত দৃশ্য, প্রশান্ত ভঙ্গিতে চোখ দুটি বন্ধ করলেন তিনি।
কথা বলে উঠল ভীত সৈন‍্য‍টি, “দুঃসংবাদ রয়েছে সিপাহ-সালার। দেওয়ান-ই-হুকুম কিলগির খাঁঁর সেনা নান্নুর আক্রমণে অগ্রসর হয়ে পড়েছে। রুবহত হ্যায় কাতিল-ই-আম্। ঠাকুরকে বন্দি নয়তো হত্যা তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।”
বস্ত্রের আড়াল থেকে আহমেদ আফগানির অস্ত্রটি ঝনঝন করে উঠল। কোমল দৃষ্টি মুহূর্তে পরিণত হল অগ্নিপিণ্ডে। প্রস্থানের আগে চণ্ডীদাস প্রশান্ত নেত্রে চেয়ে রইলেন তার দিকে, “হত্যা নয়, আত্মরক্ষার্থে লড়াই-ই শ্রেয়।”
তার দেখা সুফিতুল্য এক পুরুষ; সংগীত যাঁঁর দেহবজ্র! সেই অনিন্দ্য পুরুষকে প্রণাম জানিয়ে ঝড়ের গতিতে অশ্ব ছুটল আফগানির।
পূর্বাকাশ ক্রমশ রক্তিম হয়ে উঠছে, পাখ-পাখালিরা জেগে উঠছে দীর্ঘ কলরবে। অথচ চণ্ডীদাস পদ সৃষ্টিতে নিমগ্ন, বাহ্যজ্ঞানশূন্য। এক- একটি শব্দের আঁঁচড়ে তার দু’চোখে ভেসে উঠছে অহি-যুগলের মিলনদৃশ্য; কামনাহীন, বাসনাহীন দুটি দেহ-প্রাণ কেবল অপূর্ব সৃজনে মত্ত। লিখতে লিখতে চেতনা-বিলুপ্ত এক পৃথিবীতে যেন ভেসে চলেছেন তিনি। অকস্মাৎ নুপূরের ক্ষীণ শব্দ ও শাড়ির খসখস আওয়াজে সংবিৎ ফিরল তাঁঁর। মুখ তুলে দেখলেন সম্মুখে বসে রামমণি।
অপার মুগ্ধ দৃষ্টিতে তিনি চেয়ে রয়েছেন চণ্ডীদাসের মুখপানে। এভাবেই স্থানুবৎ দু’জনে; কিছু সময় পর রামী কোমল স্পর্শ রাখলেন কবির হাতে, “এত কী লিখে চলেছ তুমি, যে বাহ্যজ্ঞান নাই! আমার উপস্থিতিও অনুভব করতে পারোনি আজ।”
লেখার সামগ্রী সরিয়ে রামীর কণ্ঠলগ্ন হলেন চণ্ডীদাস, “আশ্চর্য এক পথের সন্ধান পেয়েছি রামমণি; সেখানে কাম ও আকাঙ্ক্ষাশূন্য প্রেমের উৎসব রয়েছে নিরবধিকাল। সে উৎসবের কোনও শেষ নাই, সে অযুত-আদি-অনন্ত। মানুষের পৃথিবী ছাড়িয়ে যা পৌঁছে যায় মহানির্মাণ শিখরে অথচ মানুষই তার নির্মাতা!”
বিহ্বল রামী গভীর আশ্লেষে বক্ষলগ্না হলেন, “সে পদ কি তুমি লিখেছ? শুনাও, শুনাও তবে নাথ।”
আলতো স্নেহে তার কৃষ্ণবর্ণ কুন্তল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিলেন চণ্ডীদাস; শ্রাবণাকাশে তখন পুনরায় মেঘবজ্ররাজি। গহন গম্ভীর শব্দে আঁঁধারকৃত প্রকৃতি উত্তাল প্রায়। সেই মায়ামুগ্ধ প্রত্যুষারম্ভে নির্ঝরের মতো নিক্ষেপিত হল চণ্ডীদাসের কণ্ঠ, “রজকিনী রূপ/কিশোরী স্বরূপ/কামগন্ধ নাহি তায়/রজকিনী প্রেম/নিকষিত হেম/কাম গন্ধ নাহি তায়।”
প্রতিটি শব্দে রামী কেঁপে কেঁপে উঠছিলেন, বাইরের প্রবল ঝঞ্ঝা ভিতরের প্রেমিক যুগলের হৃদয়ে প্রোথিত করে যাচ্ছিল অবিশ্রান্ত ঢেউ!
তেমনই এক ঢেউ আছড়ে পড়ছিল কিলগির খাঁঁর প্রাসাদে। এ তরঙ্গ হৃদয়ের- ভক্তের তার পরম আরাধ্যের প্রতি, প্রেম ও করুণার প্রতি।
অদ্ভুত এই উপলব্ধি! প্রায় তিমিরাচ্ছন্ন আলোয় সুসজ্জিত দেহলিতে কিলগির তার ছায়ার পাশে দেখলেন, ফুটে উঠছে আর এক বৃহৎ ছায়া- সেই রিনরিনে অলৌকিক সুর, সেই তুলসীর মালা!
ছায়াটি ক্রমশ অন্দরমহলের দিকে এগিয়ে চলেছে, তাঁঁর দু’হাতে প্রেম ও কবিতা।
কিলগিরের হাতে শাণিত খঞ্জর, দৃষ্টিতে প্রতিহিংসা। তিনি দ্রুত অগ্রসর হতে লাগলেন হারেমের দিকে, বহুচেনা পথ আজ ভুল হয়ে যাচ্ছে বারংবার! প্রতিটি নিজস্ব মানুষের থেকে পিছিয়ে পড়ছেন তিনি। দূরে, ক্রমশ আরও দূরে সরে যাচ্ছে যনানখানা।।
——————————————–
পাদটীকা:
১. পাক-এ-আজিম্ (উর্দু)- পবিত্র ও প্রিয়।
২. ইবাদতে-রহেম-খুদা (উর্দু)- ঈশ্বর প্রার্থনারতকে দয়া ক‍রো।
৩. যনানখানা (উর্দু)- ভারতীয় মুসলিম শাসকদের শাহী বেগম মহল।
৪. আওলাদ (উর্দু)- সন্তান।
৫. তফলিফের (আরবি)- সৃজনের।
৬. রুবহত (আরবি)- সম্ভাবনা।
৭. কাতিল-ই-আম্ (উর্দু)- প্রকাশ্য হত্যা।
৮. দেহলিতে (উর্দু)- বারান্দায়।