গল্প

 

রাতের গল্প  দিনের গল্প

 

অমিত মাহাত

 

এক

হঠাৎ করে ঘুমটা ভেঙে গেল। কত রাত কে জানে। কাদরী’র  ঘরের ভেতরটা মিশিকালো আঁধার। চোখ দুটো দু’হাতের চেটোয় আচ্ছা করে রগড়ায়। কচলায়। কাদরী এবার সত্যিই অন্ধকার দেখে।  অন্ধকার তো অন্ধকারই হয়। এ আর নতুন কী। অন্যদিন হলে এতক্ষণে চাঁদের ছিটকিনি নাড়া শুরু হয়ে যেত। দরজা খুলে দিলেই হামলে পড়ত চাঁদের হাত। সে হাত এমন দুষ্টু সোজাসুজি বুকে জোছনা ঢেলে দেখে নিত ওর পলাশ কুঁড়ি চুচুক।

কাদরী কখনও পলাশ দ্যাখেনি। দেখবে কোত্থেকে।  ওর তো দৌড় ওই নিজের গাঁ তামাজুড়ি থেকে শিয়াড় বিন্ধা  শাল জঙ্গল অব্দি। শাল জঙ্গলে পলাশ বাঁচে না। যেখানে পলাশ। শুধুই পলাশ। একটি লিকলিকে শাল-ডাল খুঁজে পাওয়া যাবে না সেখানে। প্রকৃতির কোন অমোঘ লীলা  কে জানে!

বেলপাহাড়ির এইপ্রান্তে শুধুই শাল। পড়াডি  মোড় তক্কো। যেই বান্দোয়ান পড়ে গেল, শালবন উধাও।  বেঁকানো লতানো পলাশ। বৃক্ষ পলাশ৷ একটি লিকলিকে পোহা শাল ডাল মুখে দাঁতইন দিতে আর পাওয়া যাবে না। ঘরে পুরুষ মানুষ এলে তারও সেবায় পাত-দোক্তা লাগে। আগুন লাগে৷ জলঘটি লাগে। পলাশের দেশে এ আপ্যায়নে বড় সমস্যায় পড়তে হয় গেরস্থের বউটিকে। কাদরী’র  মরদ যেন পলাশের দেশের না হয়।  এমনটি ভাবে সে। বউ হয়ে কখনও সে পলাশের দেশে যাবে না। তার চেয়ে আইবুড়ো থাকা ভালো।

 চোরা এক টান ওর বুকে ঘুর ঘুর করে। ফাগুন পড়েছে সদ্য। মাঝে মাঝে বকবকম জুড়ে দেয়।

-‌‌‌সোহাগ মাঙ্গে বনুআ’ক পেরুয়া হামর। ভেতরের ভাবটি এইরকম।

প্রথমে মৃদু খট। তারপর  খটাৎ করে শব্দ হল দরজা খুলতে গিয়ে। পেল্লাই হুড়কো ডাঙ সরিয়ে   ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে কাদরী। বাইরেটা আরও ঘোরেল অন্ধকার। কেউ কি চাপ চাপ আলকাতরা ঢেলে দিয়ে গেছে। ও যখন ঘুমিয়ে ছিল সেই সুযোগে। ঘুমোবার আগে আকাশ তো এমন ছিল না।

আকাশে ভরা তারার  মিটিমিটি চাহনি ছিল। লাজুক লালিমা ছিল। এখন উধাও। জোনাকিপোকার ছুটোছুটি কত। যেন তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে  কেরোসিন বাতি। লন্ঠন। কিছু হয়ত হারিয়েছে। ওদের পরিবারের কেউ হয়তো সাঁঝে ঘরে ফেরেনি। হয়তো অন্ধকারে পথ হারিয়ে আটকে পড়েছে কোথাও। তাই দলবেঁধে আলো জ্বালিয়ে  খুঁজতে বেরিয়েছে  সমগ্র জোনাকি। কাদরী  এমনটাই ভাবে। ভাবতে গিয়ে ওর মনোজগতেও পোকাদের ব্যস্ততা ঢুকে পড়ে।

না। জোনাকি-সব গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন এখন। ওদের সন্ধের ব্যস্ততা, খোঁজাখুঁজি পর্ব আর নেই। গাঁ মাথার চন্দন দের পুরনো তেঁতুল গাছের পাতায়, ওর জ্যেঠুদের ইজমালি বাঁশবনে এখন দু’দন্ড জিরিয়ে নিচ্ছে সব। ঘুমিয়ে নিচ্ছে। কাদরী’র  কেন যে এ সময় ঘুম ভেঙে গেল! ওর কেবলই মনে হয় এও এক চক্রান্ত। তা নইলে আর কি।

একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে এ’মাথা ওমাথা  নজর ঘুরিয়ে বুঝে নেয় মেঘের অস্তিত্ব। পুবের চোর খেদা তারাটি এখনও ওঠেনি। কিংবা উঠেছে হয়তো। মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে। অর্থাৎ রাত আর বেশি নেই। এখনই হয়তো ভোর হয়ে আসবে।  ময়ূরের ডাক ভেসে আসছে চেরেঙঘুটু মাঠের ওপার থেকে।

—ককরচ চোও ও, ককরচ চোও ও ও

ময়ূরের ডাকে তাল দিতে ডেকে ওঠে  কাদরী’র  ল্যাটকাফুলিয়া লাল মোরগ সাঁড়াটি। একবার ডেকেই থেমে যায়। কাদরী  বুঝে যায়।  রাত এখনও আছে। কত রাত এখন? ময়ূর সাধারণত ডাকে রাত্রি আড়াইটার পরে। মোরগের প্রথম ডাকটিও রাত্রি তিনটায় শুরু হয়।  ঘড়ি না দেখেও এই ডাক শুনে বলে দেওয়া যায়। রাত আছে, না ভোরের আলো ফুটবে এরপর।

কাদরী’র  রোজকার অভ্যাস হল  মোরগের প্রথম ডাক শুনে  বিছানা ছেড়ে উঠে যাওয়া। উঠেই কাজ ধরে। কাজ বলতে পাতখালি। শাল পাতা সেলাই। ফটস ফটস শব্দে কারখানাটি  চালিয়ে দেওয়া। একাজ চালাতে হলে প্রথমেই জঙ্গলে যেতে হয়। তারপর বুদাকোল থেকে ঝোপেঝাড়ের ডাগর শাল পাতাটি টকস টকস করে ডাল থেকে তুলে নাও। শাড়ির কোঁচড়ে জমিয়ে রাখো। কোঁচড় ভরলে মাটিতে ডিঙাও। শালপাতে চুড় হয়ে আসলে তখনকার মত কাজ খতম। দুধিলতায় বোঝা বেঁধে ঘরে ফিরলে বাইস্যাম বেলা। লাও জলমাড় খায়ে লাও।

শুধু কাদরী  একা এ কাজ করে না। এ গাঁয়ের সব মেয়ে বউ মিলে করে। দঙ্গল বেঁধে বনে যায়। কেউ কেউ অবশ্য বাবুই দড়ি পাকায়। কাদরী’র বাপ দড়ি পাকানোয় দড়। মাহুর জন। তল্লাটে গুহিরাম মাহাত’র বেশ কদর এই দড়ির কারণে। পড়াডি’র হাটে এখনও তাঁর বেশ নাম ডাক। খদ্দের চোখ বুজে কিনে নেয়। হাটের দিনে কিছু আয় উপায় হয় এভাবেই।

গুহিরামের বয়স হয়েছে। এখন সেভাবে বাবুই পাকাতে পারেন না। হাত আগের মতো সায় দেয় না কাজে।

কাদরী মধ্যরাতে বিছানায় গড়িয়ে দিয়েছিল শরীর। পাতখালি শালপাতা সেলাইএ সেলাইএ রাত গড়িয়ে গিয়েছিল অনেকটাই। বোঝা যায়নি। তারপর গড়াল যখন চন্দনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল ওর। আরেকবার যদি দেখা হত ওর সাথে। একবার যদি বলা যেত কথা। কখন যে ভোর হবে কে জানে! এইসব ভাবতে ভাবতে চোখ লেগে গেছিল। অনেক রয়েসয়ে একটি আওয়াজ। ঠক ঠক। প্রথমে মৃদুমৃদু। ধাক্কা। ঠক ঠক। দীর্ঘ সময় ধরে। আওয়াজটা  ওর ঘুমের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল? না সত্যিই দরজার বাইরে কেউ কড়া নাড়ছিল! এমন ভাবনার দ্বন্দ্বে কাদরী  বুঝে উঠতে পারছিল না। আসলে সত্যি টা ঠিক কী?

রাত আর বাকি নেই। হিসাব অনুযায়ী আকাশ ফর্সা হয়ে যাওয়ার কথা। মেঘ ঘোর করে রেখেছে অনেকটাই। শীত শীত ভাব আর নেই। সারা শীত জুড়ে যে উত্তুরে হাওয়ার হাড় কাঁপানো স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে হাওয়া এখন বিপরীতে বইছে। দক্ষিণের  হাওয়া এসে ধাক্কা খায় কাদরী’র  পিঠে। আহা! শন শন শব্দ। নিম গাছটির শুকনো পাতা ঝরে ঝরে পড়ছে ওর গায়ে।

—অ মা। কাদরী ই রে এ এ। ক’থা গেলি মা? আয় মা। টুকু জল দে।

এবার শুরু হল। বুড়া বাপটার ঘুম ভেঙে গেছে। ঘুম ভাঙলেই চেল্লানো শুরু হয়ে যায়। জল জল করে বাড়ি মাথায় করে তুলে। কাদরী’র  তখন কথা বলতেই ইচ্ছে করে না।

গুহিরাম মাহাত ফের ডাক লাগায়। মেয়েকে। -অ কাদরী  বাপটা যে মর‍্যে গেল…।  মরার আগে একঢোক জল কি পাবেক লাই? বিটি না হয় বেটা হতিস তো। মরলে কাঁধ দিতিস। মুহে আইগ দিতিস। বিটি বল্যে কি জলঅ দিবিস লাই?

—ইবার থামো তো বাপ। চেঁচায় গাছের পাত ঝরায় দিল্যেক। কোনদিগের লে বুড়াছে ক্যা জান!

কাদরী ঘরে ঢুকে যায়। দরজা খোলা রেখেই। বাপের বিছানার পাশে নীচু হয়ে  লন্ঠনের আলো হাতের কায়দায় উস্কে দিল। ঘোলাল ডিমের মতো আলো ছড়িয়ে পড়ে গোটা ঘর। বিছানার তলা থেকে স্টিলের লোটা বের করে বাপের মুখের সামনে ধরে।

—এত চেঁচাবার কী আছে? জল তো ইখানেই রয়েছে। বিছানার পাশে।

কাদরী বাপের বিছানায় গিয়ে বসে। জল খাওয়া দেখে। চকচক শব্দে ঢেউ তুলে বাপের কণ্ঠনালিতে। জল খাওয়া হলে ঘটি  ঠঙ করে মাটিতে ফেলে দেয়  গুহিরাম। তারপর বলে —নাই? চেঁচাবেক নাই?  রউগে মরছি আমি। উ পাটরানি  দ্যাখাছে!

—তো কী করব? কারও হাত ধরে পালায় যাব?

—তো যা না। কে মানা কর‍্যেছে?

—ইবার সত্যিই যাব। দেইখ্যে লিহো।

কাদরী  ঘর ছেড়ে বারান্দায় বেরিয়ে আসে। ডিবরি ধরায়। শাল পাতের ঠেকাটি নিজের কোলের কাছে টেনে নেয়। নিম খড়িকা হাতে নিয়ে পাতা সেলাইএ মন দেয়। গুহিরামের ঘরের গজরানি বারান্দায় মেয়ের কানে এসে ঘুরঘুর করে। মেয়েও সমানে চালিয়ে যায়। চালিয়ে যাচ্ছে। আবার ঠং করে উঠল। কিছু একটা ছুঁড়ে ফেলছে বাপ টা।

—ওই বসল। পাতখালি নিয়ে।  গুহিরাম গজগজ করেন।

—তো কী করব্যেক? নাচব্যেক? আবার রাগ দেখাইছেন! রাগ তো রাগ। আমার ঘটিবাটির উপর ক্যানে? উসব কিনত্যে কি পৈসা লাগে নাই?

—কটা কিনেছিস হেঁ? হত যদি বাবুই পাকাতে? বুঝতিস। হাটে বসতে হলে জানতিস ক্যামনে পৈসা আসে ঘরকে? শুধু বড় হয়েছিস বুদ্দি হয় নি। হলে বাপের সাথে মুখরা করতিস নাই।

—বুদ্দি আমার হবেক কুথাক্কে? স্কুল পাশ দিতে না দিতেই স্কুল ছাড়ায়্যে দিলিস খরচা হবেক হত্যে। মা বাঁচ্যে থাকলে…

—কী হত্য? তোর মা থাকলে?

কাদরী এবার চুপ করে যায়। গুহিরাম হাঁপিয়ে ওঠেন। একটু দম নেওয়া দরকার। টানা কতক্ষণ আর টেনে নেওয়া যায়! টানতে হলে  বিরতির দরকার পড়ে তখন। কাদরী  কি উঠে গিয়ে দেখে আসবে বাপ ওর বিছানায় শুয়ে পড়ল কি না? না বসে বসে মেয়ের গুস্টি উদ্ধারের কথা ভাবছে। ভাবুক গে। যার ভাবনা তিনি ভাবুন। ও আবার পাতখালিতে মনোনিবেশ করে।

বাপটা এভাবে ক্ষেপে উঠল কেন? মেয়ের উপর? কোনও কিছুর আভাস কি পেয়ে গেছে। ইঙ্গিত কিছু? কাদরী মনে করার চেষ্টা করে। কাল গোটাদিন গুমরে ছিল বাপ। তেমন কোনও কথা হয়নি। দুপুরে কখন নিজে ভাত বেড়ে খেয়ে নিয়েছে। জবকার্ডের মাটি কাটার কাজ থেকে ফিরে এসে দেখে হাঁড়ির ভাত অর্ধেক। বাপের মুখখানাও কালো হাঁড়ির মতো থমথমে। দেখেছিল।

পরশু রাতের পর থেকে গুহিরামের এই পরিবর্তন।

কাদরী এবার কারণ খুঁজে পায়। শুরুটা হয়েছিল আগেই। দিন পনেরো হবে। কারণ টি তারাস।

সেদিন রাতে দরজা ঠকঠকানিতে প্রথমে আমল দেয়নি।  চেনা একটি পুরুষের গলা পেয়ে দরজা খুলে দিয়েছিল সে। দরজা খুলে দিতে বন্যার জলের তোড়ের মতো সবেগে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়েছিল তারাস মান্ডি। গ্রামে উন্নয়ন। পুকুর খনন। অঞ্চল অফিস থেকে মোরামের টেন্ডার বের করে গ্রামের রাস্তা মেরামতি। এইসব কাজগুলো করে তারাস। সোজাকথায় গাঁয়ে পলিটিক্স  করে।

কাদরী  প্রথমে অবাকই হয়েছিল। তারপর আগমনের হেতু প্রকাশ হয়ে যেতে রিনরিনে ব্যথা হচ্ছিল বুকের বাঁদিকে। দাঁত কামড়ে নিজেকে  সামলে নিয়েছিল  -এই তবে উদ্দেশ্য তারাসের?

তারাস বলেছিল — এখন তো বনে পাত নাই। এদিকে মাটি কাটাচ্ছে পঞ্চাহিতে। তুই জব কাড়ে নামটা এন্ট্রি করে লে না।

কাদরী  বলেছিল -হঁ। লিলি। তা বাদে?

—তা বাদে একবার সাইটে যাবিস। তোকে মাটি কাটতে হবেক নাই। হাজিরান টুকু দিবিস।

—আর তাবাদে?

—আমার সাথে একবার অঞ্চল আর বিডো সাহেবের ঘর যাত্যে হবেক।

—আর?

—আর কনঅ নাই। পুরা একমাসের পৈসা বেঙ্ক বইএ সামায়ে যাবেক।

পরশু রাতে। আবারও দরজায় টোকা। ঘরে ঢুকেই প্রথমে গুহিরামের দরজা বাইরে থেকে শিকলি টেনে দেয় তারাস। কাদরী’র নজর এড়িয়ে।

প্রথম কথাটি কাদরী’ই  বলে— রোজ রোজ এতরাইত্যে আসিস ক্যানে? দিনে আসলেই তো পারিস।

—দিনে মিটিং টিটিং থাকে। ঝামেলা পুহাতে হয়।

—আর উটা উশুল করতে আমার কাছে ছুকছুক করিস?

—ই আবার কী কথা? উন্নয়নের সুবিধা লিবিস নাই? এই যে দুদিন বাদে একমাসের মাটি কাটার পৈসা পাবিস। এতটা মফত কে দিবেক?  আমাকেও ত কিছু দিতে হবেক। হঁ ন নাই? সামনে ভোট আসছে। পার্টির লে তোকে দাঁড় করাবেক। ভাবা হচ্ছে।

—তো? তোরও কাটমানি দরকার?  রোউদের দিনে মাটি কাটেছি। কিসের মফত? আমাকে তোর রাঁড় পাইয়েছিস বল?

হাওয়া বেগতিক বুঝে সটকায় তারাস।

কাদরী উঠে গিয়ে দেখে বাপ তার অঘোরে ঘুমোচ্ছে। খানিক আগের রাগী ভাব এখন আর নেই। খুশি খুশি ভাব। ঘুমন্ত মুখে হাসি লেগে রয়েছে। কাদরীর মনে হল বাপ তার স্বপ্ন দেখছে।

কাদরী  ঘর ছেড়ে  বাইরে বেরিয়ে আসে। অন্ধকার কেটে  লালটিপ সূর্য উঠছে তখন।

দুই

তরতরিয়ে গাছে ওঠার মতো মাথার উপরে উঠে যায় সূর্য। উঠতে উঠতে সূর্য এখন পূবের বাঁশঝাড়ের ঠিক মাথার উপরে। কাঁসার থালা হয়ে জ্বলজ্বল করছে। বাঁশ ঝাড়টি চন্দনের জ্যেঠুদের।

কাদরী  বাঁশঝাড়ের ভেতরের সরু পথটি ধরল। অদ্ভুত সোঁতা পরিবেশ। শুকনো বাঁশ পাতা এক একটি ধারালো ফলা হয়ে বুকে ঘা দিতে চায়। কাদরী  হাঁটতে হাঁটতে সেসব এড়ায়। কখনও মাথা নামিয়ে, কখনও বা ডান হাতে কঞ্চিটি ধরে  বাঁদিকে ঘাড় বেঁকিয়ে এগিয়ে যায়। তারপর ছেড়ে দেয় কঞ্চি। একবার হয়েছিল কি। আগে আগে হাঁটছিল সে। পেছন পেছন তাকে অনুসরণ করে আসছিল চন্দন। যেই কঞ্চি ছেড়ে দিয়েছিল। কঞ্চিটি সপাং করে চাবকে পিঠ লাল করে দিয়েছিল চন্দনের।

কাদরী’কে  দাঁড়াতে হল। মনে হল ওই বুঝি চন্দন। পেছন পেছন আসছে। পায়ের এমন শব্দ চন্দন ছাড়া আর কার! এই বাঁশবনে ওর গাল দুটো লাল করে দিয়েছিল চটকে। ওর তখন কিশোরীবেলা। চন্দনের তখন শিলদা কলেজ।  শিলদা তে ওর মাসীবাড়িতে থাকতে শুরু করেছে। শনিবার হলেই বাসের ছাদে উঠে পড়ত। চন্দনের ফেরা মানে আবার সেই বাঁশবন।

কাদরী  জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিত। ওর চোখ থাকত বাস রাস্তার দিকে। বাসের ছাদ থেকে তখন নেমে আসত চন্দন।  ও আসা মানেই চেরেঙঘুটু ময়ূরের  মাঠ। সেদিন  বাসটি এসে দাঁড়িয়েছে তামাজুড়ি’তে। প্যাসেঞ্জার ভাড়াভুতা মিটিয়ে একে একে নামল। বেশির ভাগই এ পাড়ার ও পাড়ার। কেউ হয়ত বেলপাহাড়ি গেছিল। বিডো সাহেবের টেবিলে দরখাস্তি জমা দিতে। রেশনের নাম ভুল যা এসেছে ডিজিটাল জমানায়। তার লিস্টি বড় দীর্ঘ।  গাঁয়ের প্রত্যেকটি মানুষের কার্ডই ভুল। পিতাম্বরের ডিজিটাল সংস্করণে নতুন নাম হয়েছে পয়ম্বর মাহাত। বাসন্তী সরেনের ডিজিটাল নাম হয়েছে অশান্তি সরেন। কাদরীর বাপ গুহিরাম হয়ে গেছে গুড়-আম। তার উপর রেশনের দু টাকার চালটি যদি বন্ধ হয়ে যায় । এইভয়ে বেলপাহাড়ি বাজার মেলাময় লোক। লোকের ভিড়। বাসের ভেতর ঠাসা আলুবস্তা পেঁয়াজবস্তা আর প্যাসেঞ্জারে।  গাঁয়ে বাসন্তী সরেন বললে খুঁজে পেতে অসুবিধা হবে না। কিন্তু অশান্তি সরেন? খুঁজে পেতে কালঘাম বেরিয়ে যাবে হে!

বাসটি দাঁড়াল কিছুক্ষণ। তারপর চলে গেল ঝিলিমিলির দিকে।

বাসের ছাদ থেকে সেদিন কেউ নামল না। কাদরী দেখল হেঁটে আসছেন একটি মানুষ। চন্দনের জ্যেঠু।

ঘরের পাশে বাঁশের বেড়া। বেড়ার গায়ে ছোট্ট দুয়ার। দুয়ার বন্ধ করা হয়েছে বাঁশের কপাটে।

চন্দনের জ্যেঠু বেড়ার কাছে এসে দাঁড়ালেন। তারপর হাঁক দিলেন -কই রে মা? ক’থা গেলিস? এক ঘটি জল আন তো।

—এই লাও জ্যেঠা। কাদরী বেড়ার এপার  থেকে বাড়িয়ে দিল জলের ঘটি। তার পর বলল – আর বাহিরে ক্যানে? চালির দিগে উঠে আসঅ।

—হেঁ রে গুড় আম টা ঘরে আছে?

—গুড় আম? এখন আম পাবে কুথা? ভাদর মাস যে জ্যেঠা!

—উ আমের কথা বলি নাই মা। তোর বাপের কথা শুধালি।

—অ। তাই বলঅ। আছেই। ভাতঘুম দিছে। ক্যানে?

—উয়ার অ যে নাম ভুল আসেছ্যে। গুহিরাম হয়ে গেছে গুড় আম মাহাত। এখন কেম্প চৈলছ্যে। তর টা ঠিকেই আছে। বাপটাকে ইবার ঠিক কর‍্যে লিবিস।

—আচ্ছা জ্যেঠা সে হবেক খন। চন্দন ক’থাকে গেছে? উ কবে ঘর আসব্যেক জ্যেঠা?

মাঝে কতকগুলো বছর ফুরিয়েছে শুধু। চন্দনের ঘর ছেড়ে যাওয়ার বছর দশেক বাদে কাদরী’র  হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল তাকে? চন্দনের জ্যেঠু হতচকিত হয়ে পড়েন। কাদরী কি সত্যিটা জানে না? চন্দন যে আর কখনও ফিরবে না ঘরে। একথা কোনমুখে বলা যায় এই মেয়েকে?

তারপর তিনি  শুধু বললেন- একদিন ঘরকে আসিস মা।

শুকনো পাতার ভেতর দিয়ে একটি সাপ পথ করে নিচ্ছে। সাপটিকে কেউ তাড়া করেছে যেন। ধুস। এখানে তাড়া করবে কে! কাদরীর  পায়ের শব্দ পেয়ে গোপনতম ডেরার খোঁজে চলেছে হয় তো সাপটি।

কাদরী এবার দেখে নেয় জায়গাটি। ওদের  গ্রাম ছাড়িয়ে জঙ্গলের পথ ধরে এসে পড়েছে এতদূরে। এই জায়গার একটি নামও রয়েছে। চেরেঙঘুটু ডুংরি।  দু পাসারি শাল মহুল। এদিক ওদিক বুনো কেঁদ।  চড়াই পথ। পাথুরে। উঁচুনীচু। ধনুকের ছিলার মতো সরু একটি পথ উঠে যাচ্ছে উপরের দিকে। কাদরী  তার শরীরটিকে কাঁড়বাঁশের মতো বেঁকিয়ে আরও উপরে উঠে যায়। নিজের কিশোরীবেলার পথ বেয়ে।

সেদিন চন্দন বলেছিল – হাতে কাজ কোথায়?

কাদরী  বলেছিল – কাজ খুঁজি লিতে হয়।

চন্দন বলেছিল – আমি আমার কথা বলি নাই পাগলি।

—তবে? এই দ্যাখ তারাসকে। উ এখন কাঠ চালানি করছে সাইকেলে সাইকেলে।

—আমাকেও তুই গাছ কাটতে বলছিস?

—অন্যকাজ ইখিনে নাই যখন। সে তুই গাছেই  কাটলিস না হয়।

–গাছ আমাদের মা হয় কাদরী ।

—একটা গাছ কাটলে কি বন ফুরায়?

—আমি একা কাটলে ফুরাবেক নাই। আমার দেখাদেখি গাঁয়ের সবাই যদি করাত ধরে? তখন?

—তাইলে তুই কী করবি? কাদরী পাল্টা প্রশ্ন করেছিল চন্দনকে।

চন্দন শুধু  বলেছিল – সবকিছু পালটাতে চাই।

—তো বল, কী করবি?

—আমি বনপার্টিতে নাম লিখায়েছি রে। আমি চল্লুম।  মদন মাহাতর দেখানো পথে পা বাড়ালুম।

—বনপার্টি মানে মাওবাদী?

—হঁ রে কাদু। তুই ঘরকে যা।

দশ বছর বাদে কাদরী  দু’চোখ ভরে দেখছিল তেঁতুল গাছটিকে। এমন এক সন্ধেবেলায় সে  দেখল তেঁতুল গাছের পাতায় পাতায় জোনাকি। যেন হাজারো লন্ঠন জ্বালিয়ে খুঁজতে বেরিয়েছে প্রত্যেকেই। ওদেরও কি কেউ হারিয়েছে?  চন্দনের মতো প্রিয়জন?

কাদরী  তেঁতুল গাছের নীচে হাঁটু দুটো গেড়ে বসল। মাটিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে তারপর নীচুগলায় ডাকল – চন্দন।  তুই শুনতে পাচ্ছিস, চন্দন?