বই উৎসব

রুকুর কবিতা একটি আশ্চর্য অভিজ্ঞতা

সুপর্ণা বসু

বিনায়ক রুকুর ডাইরি

প্রকাশক: কবিতা আশ্রম

দাম: ২৫০/-

ইটির নাম বিনায়করুকুর ডাইরি। ডাইরি অর্থাৎ  দুই মলাটের ভেতর একেবারে নিজস্ব প্রাত্যহিকতা। অথবা প্রাত্যহিক নিজস্বতা। ডাইরি পড়তে বেশ লাগে। মানুষটিকে ভারী অন্তরঙ্গতায় ধরা যায়। এখানে মানুষ বড় অকপট। বিনায়করুকুও ডাইরি লিখেছে নিজের জন্য। নিজের মতো ক’রে। সে আসলে তার মনের কথা লিখেছে আর সেগুলি নিজগুণে কবিতা হয়ে গিয়েছে।

রুকু চোখ মেলে তাকিয়েছে এই জগতের দিকে, তারই চেতনার রঙে রেঙে উঠেছে জগৎসংসার। পাহাড় কখনো সাদা কখনো গোলাপি আবার কখনো কালো হলুদ হয়ে ধরা দিয়েছে তার কুতুহলী চোখে। রুকু তার বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে  কত সহজেই বুঝে নেয় যে ধানখেতে দাঁড়িয়ে থাকা কাকতাড়ুয়ার ছায়া পুকুরের জলে পড়লে তা অনায়াসেই মাছতাড়ুয়া হয়ে যেতে পারে। বইটির পাতায় পাতায় তার অদ্ভুত কল্পনাশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। ‘কেদারনাথের ডাইরি ২’ কবিতার এক জায়গায় সে বলছে, ‘সূর্য উঠলে পাহাড়টা দাঁত মাজে। নীল রঙের আকাশটা মাউথওয়াশ। ’  আবার আরেক জায়গায় বলছে,’আমি অনেক তারার নাম জানি। একটা থালায় একসাথে থাকলে সীতাভোগ। আলাদা থাকলে জিলিপি আর চন্দ্রপুলি। গ্যালাক্সিটা ছানার পায়েস। ’

রুকু তার চারপাশের ইট, কাঠ ,পাথরের জগৎকে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে নির্মাণ করে প্রতিনিয়ত। তার কবিতার পঙক্তিমালা, সেই চিন্তা চেতনার জগতে প্রবেশের সংকেত বাতলে দেয়। তার ভাবনার সমুদ্রে এই টুকরো টুকরো শব্দ ও বাক্য, দ্বীপের মতো ছড়িয়ে থাকে । পাঠক সেই সমুদ্রে সাঁতার কেটে এক থেকে আরেক দ্বীপে উঠে এসে আবিষ্কার করে প্রতিটি শব্দ, বাক্য, যতিচিহ্ন এবং স্পেস আসলে বিনায়করুকুর যাপনের  ধারাবাহিকতা। তার লেখা টুকরো বাক্যগুলি  প্রকৃতপক্ষে  সমগ্রের ধারণা দেয়।  ভয়, উদ্বেগ, নিরাপত্তাহীনতা, আনন্দ, বেদনা সবটুকু সে ঢেলে দেয় অক্ষরের ছাঁচে।

মনোজগতের আলোড়নকে সে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে তার লেখায়, ‘মাথার ভেতর’  চিঁড়েভাজা খাওয়ার মতো আওয়াজ। দেয়াল, টিউবলাইট ভেঙে পড়ে। ’ অর্থাৎ এভাবে সে  নিরাপত্তাহীনতার বোধ ব্যক্ত করেছে রুকু। এইসময়  ‘রুকুর আঙুলগুলো তখন পাপার ফিঙ্গার খোঁজে। ’

রুকুর দূষণমুক্ত মনোজগতে প্রকৃতি ধরা দেয় সহজ সরলতায়। পারফিউমের গন্ধের মতো কোনো কৃত্রিমতা তার ভাল লাগে না। তার ভাবনা ও আচরণে কোনো ঘোমটার বালাই নেই। নেই কোনো মুখোশের অস্তিত্ব ।  সে যেমন, সেভাবেই সে নিজেকে গ্রহণ করেছে।  তাই সে অবলীলায় বলে, ‘ মা বলে—বিহেব বিহেব। বিহেব হব না। আমি রুকু হব।’ সে ছবি আঁকে বিহেব গাছের। সেই গাছে সকলেই চড়েছে শুধু রুকু নীচে দাঁড়িয়ে আছে।

তার লেখায় ঘুরেফিরে আসে প্রকৃতির কথা, পুকুরের সবুজ জল, তার ভেতর কালো তেলাপিয়া মাছ । পিঁপড়ের সারি দেওয়ালের ওপর যেন রাপাঞ্জেলের চুলের মতো মনে হয় তার। কচুবনে ঝিঁঝিপোকার ডাক শোনে সে।  ঝিঁঝিপোকারা যেন কাদামাটির রূপটান মেখেছে। রুকু ওদের ভালোবাসে। তার চোখে ওরা ভারী সুন্দর।  কাকের ওড়ার ভঙ্গিকে আকাশের গায়ে হেলিকপ্টারের  সাথে তুলনা করে সে। এই সুন্দর প্রকৃতিকে ভাল রাখতে চায় বিনায়করুকু। ঝিঁঝিপোকাদের ভাল রাখতে,  ডাক্তার হয়ে কচুবনে  টুল নিয়ে চেম্বার করার কথা ভাবে।  সে দিব্যি ভাবতে পারে যে, রাত্রিবেলা সেখানে জোনাকিদের নাইট ডিউটি শুরু হয়ে যায়। জোনাকিদের বাল্ব কাটে না কখনো। আসলে রুকু  যা ভাবতে পারে, আমরা পারি না।  আমাদের কল্পনাশক্তি সেখানে পৌঁছতে পারে না|

দৃশ্য ও ঘটনাবহুল চরাচরে রুকু তার ভাবনা প্রকাশের জন্যে  বেছে নেয় কিছু অমোঘ চিত্রকল্প ও রূপক । প্রতিটি পঙক্তি বিন্যাসের মাঝখানে পাঠকের বিচরণের জন্যে সে ছেড়ে রাখে ভুবনডাঙার পরিসর। এভাবেই সে ছুঁয়ে থাকে প্রিয়জনকে। জুড়ে থাকে জীবনের সঙ্গে।

অটিজমের একটি মেজর সিম্পটম হল স্টিরিয়োটিপিকালিটি। সে নিজেই বলেছে , ‘ছপ্পা ছপ্পা চরখা চলে’—এই গানটি সে বারবার শোনে। লোডশেডিং হলে বা নেট না চললে সে ক্ষুব্ধ  হয়ে ওঠে।   সেইসময় আরো কয়েকটি উপসর্গ সৃষ্টি হয় যেমন, ইকোলালিয়া অর্থাৎ একটি বাক্য বা বাক্যাংশ পুনঃ উচ্চারণ করা এবং ইকোপ্র্যাক্সিয়া অর্থাৎ একই কাজ বারংবার করা যেমন মাথা ঠোকা বা টেবিল চাপড়ানো ইত্যাদি । এই বিষয়গুলি অনৈচ্ছিক এবং অনিয়ন্ত্রিত ।

রুকুর  বোধের ব্যাপ্তি বিশাল। সে পাখির চোখ দিয়ে জীবন এবং নিজেকে দেখে। অটিজমজনিত সীমাবদ্ধতাকে বোঝে এবং স্বীকার করে নিয়েই জীবনের পথে এগিয়ে যায়। এই যাত্রাপথকে উপভোগ করে নিজের মতো করে।  তার অনুভবকে ছোটছোট বাক্যবন্ধ এবং চিত্রে প্রকাশ করে।  অন্যান্য অটিস্টিক বাচ্চারা সকলে এভাবে পারে না অথচ তাদের‌ও মনোজগতে এবং বোধের জগতে হেলদোল থাকে, তাদের সকলের ভাবনার জগৎকে রিপ্রেজেন্ট করে রুকু। রুকুর এই কবিতার বই অকুপেশনাল থেরাপির ক্ষেত্রে নতুন দিশা খুলে দিতে পারে। রুকুর কবিতা এবং ছবি প্রকৃতপক্ষে তার পারিপার্শ্বের সাথে সমন্বয়সাধনের নিজস্ব কৌশল। ম্যাগনিফাইং গ্লাস এবং টর্চ তার প্রিয়। দুটি বস্তুই প্রতীকী। রুকু তার বোধ ও অনুভূতির আলোয় বস্তু বিষয় অথবা ঘটনাকে বিচার করে। সাড়া দেয়।

রুকুর কবিতা, পারিপার্শ্বিকের সাথে তার কোপিং স্ট্র্যাটেজিকেই তুলে ধরে। সে তার প্রতিদিনের জীবন থেকে লব্ধ জ্ঞানকে চমৎকার এক সঙ্গতিপূর্ণ পারম্পর্যে বেঁধে রাখে। তাই সে লিখতে পারে,‘আদার (দাদুর ) টাক চাঁদের মত গোল। চাঁদ সওদাগর ‘ ’মধুকর ভিঙার মালিক’ । ওর চাঁদের মতো টাক ছিল। চাঁদে কেউ থাকে না । পাথর ছাড়া কেউ না। ’ এভাবেই ক্রমে স্কিমা অর্থাৎ স্ট্রং বিলিফ গড়ে উঠে। গভীর অভিনিবেশের সাথে সে পর্যবেক্ষণ করে, পাশের বাড়ির ফাঁকা ছাদে কে কে পড়াশোনা করে—কাক চড়াই হনুমান। ওরা শ্যাওলায় স্লিপ কাটে। সে বলে, মোহনায় নদী নাকি চাঁদের মতো দেখায়।মায়াময় পর্যবেক্ষণ।

রুকুর লেখায় বারবার তার বাবা মা এবং দাদুর কথা এসেছে। বোঝা যায় তার মনোজগৎ নির্মাণ ও কল্পনাশক্তির বিকাশে এঁদের  অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের নিঃশর্ত ভালবাসা ও স্বীকৃতি রুকুকে এক অনন্যসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। যা তাকে তথাকথিত বৌদ্ধিক জড়ত্বকে অতিক্রম ক’রে বোধ ও অনুভূতির সূক্ষ্ম জগতে উন্নীত করেছে। কল্পনাশক্তি প্রসারিত হয়েছে। যেকোনও শিশুর জন্যেই এই ধরনের ইনসাইটফুল এবং অ্যাটাচমেন্ট পেরেন্টিং দরকার। প্রচ্ছদে রুকুর অনাবিল হাসিমুখের ছবিটি এরই ফলশ্রুতি।

বইয়ের শেষ কবিতাটি ভারী নস্টালজিক।

‘হেঁটে বাড়ি ফেরার পর,

আদা বলত ‘দাদান এলি দাদান এলি’।

মাথা মুছিয়ে দিত টপ টপ টপ

জল পড়লে।

কাজুবিস্কুট পেয়ারা কেক এখন একা,

ওমলেট চাটনি লজেন্স এখন বিশুর দোকানে।

ঝিঁ ঝিঁ ঝিঁ করে ঝিঁঝিপোকা।

আমি আর পুচাই, কোলবালিশ।

একা কাঁদি ঠান্ডা লেপ।’

দাদুর স্মৃতি ,স্নেহের উত্তাপ সে এভাবে গুছিয়ে রেখেছে নিজের কাছে  অদ্ভুত নান্দনিকতায়।

বইটি শেষ করে আমি আবার ফিরে যাই প্রথম পাতায়,  যেখানে বিনায়করুকু ছোট্ট একটি আত্মপরিচয় দিয়েছে—‘আমি রুকুবিনায়ক। সবাই বলে আমি বুদ্ধু। মা আমাকে গাধা বলে না, মুনা বলে। পাপা বলে পুচাই। আমার দুটো হাত, দশটা হাতের আঙুল,  দুটো চোখ আছে, যা দিয়ে আমি ছবি আঁকি।’

সমস্ত বই জুড়ে আঁকা এবং লেখার মধ্য দিয়ে চমৎকারভাবে সে পাঠকের সাথে সংযোগ  স্থাপন করেছে। একটি কবিতায় রুকু  লিখেছে,’বসে বসে দোলার অভ্যেস কমিয়েছি

মানুষকে ডাকাডাকি আমার ইডিওটিক

কাজ নয়

যোগাযোগ যোগাযোগ যোগাযোগ

চেষ্টা করি।’

রুকুরা চেষ্টা করছে যোগাযোগ স্থাপন করতে। আমরাও   হাত বাড়িয়ে দিই।

সর্বোপরি অটিজম কোনো রোগ নয়। মস্তিষ্কের নির্মাণকালীন কিছু ত্রুটিমাত্র। আমরা সকলেই কোথাও না কোথাও ত্রুটিযুক্ত। এই পৃথিবী ও সমাজের ওপর সবার  সমান অধিকার আছে। অটিস্টিক শিশুরা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংবেদী মনের অধিকারী । ওদেরকে বুঝতে চেষ্টা করলে আমাদের বোধেরও বিস্তার ঘটবে।

বইটি পড়ার পরে   Gestalt Psychologist-দের অনুসরণে  বলতে ইচ্ছে করছে,” The whole is something else , than the some of its parts .”

পরিশেষে বলি, জীবনের সমস্ত অবশ্যম্ভাবী অধ্যায়গুলির দিকে এভাবেই  এগিয়ে চলুক রুকু। তার এই চলার পথে অনন্ত আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা রইল।