অমিয়ভূষণ মজুমদার

 

(জন্ম :২২ মার্চ ১৯১৮ ,মৃত্যু: ৮ জুলাই ২০০১)

রিমি দে

“অমিয়ভূষণ” নামটি উচ্চারণ করলেই কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে! সে ভার ওঁর কথার, সে ভার ওঁর সাহিত্য সৃষ্টির। ন্যুব্জ থাকি ওঁর লিখন ও চিন্তনভঙ্গিমার উচ্চতায়। যে পথ অন্বেষণে প্রয়োজন  নিভৃতির আর একাগ্র তপস্যার। এ পথ শুধু ওঁর একার। রাজপথ ! অনন্য এক অন্য বৈশিষ্ট্য ওঁর গোটা জীবনের সাহিত্য রচনায়। শিল্পসম্মত বৈচিত্রময় আশ্চর্যজনক নিরীক্ষা ধরা পড়ে অমিয়ভূষণের কথাসাহিত্য সম্ভারে। মূলত কথাকার হলেও  বেশ কিছু প্রবন্ধ ও নাটকও রচনা করেছেন।
 কোচবিহার ছিল তাঁর বাসভূমি। আমাদের বসবাসের জায়গা কাছাকাছি হলেও ওঁকে দেখার সৌভাগ্য হ্য়নি আমার। ছাত্র হিসেবে অসম্ভব মেধাবী  ছিলেন। ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্য এবং ইউরোপীয় ইতিহাস, গণিত, দর্শন, ভূগোল, সংস্কৃত এবং আইনশাস্ত্রেও দক্ষতা ছিল অমিয়ভূষণ মজুমদারের। বিশেষত ধর্ম আন্দোলনের আনুবীক্ষণিক খুঁটিনাটি
সম্পর্কে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। যেসব উপাদান সার্থকতার সংগে ব্যবহৃত
হয়েছে ওঁর বঙ্কিম পুরস্কার প্রাপ্ত রাজনগর উপন্যাসে।  যদিও পান্ডিত্যের সঙ্গে
সৃজন ক্ষমতার কোনও সম্পর্ক আছে বলে আমি মনে করি না! কিন্তু এই লেখকের ক্ষেত্রে ওঁর নিজস্ব চিন্তা, চেতনা, শিক্ষা, মেধা, কল্পনা, বাস্তবতা, কাহিনির বুনট নির্মাণ , জীবনের অভিজ্ঞতা, চারিত্রিক দৃঢতা, সৃজনশীলতা  এবং আভিজাত্য এ সমস্তকিছু যেন এক সুতোয় গাঁথা।
দাম্ভিক  অমিয়ভূষণ ছিলেন প্রকৃতপক্ষে  লিটল ম্যাগাজিনেরই  লেখক। “দ্য গড অন মাউন্ট সিনাই” নামের একটি নাটক  ওঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা।মন্দিরা নামের একটি পত্রিকায় প্রকাশ পায়। প্রথম উপন্যাস “গড় শ্রীখন্ড” ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় সঞ্জয় ভট্টাচার্য সম্পাদিত পূর্বাশা পত্রিকায়। প্রথম গল্প প্রমীলার বিয়ে।
প্রধানত ঔপন্যাসিক হলেও প্রচুর ছোটগল্প রচনা করেন। শ্রেষ্ঠগল্প, দীপিতার ঘরে রাত্রি, পঞ্চকন্যা, গল্পসমগ্র, এই অরণ্য এই নদী এই দেশ ইত্যাদি ছোটগল্পের সংকলন রয়েছে। ওঁর গল্প  সাধারণ পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য নয় অথচ কবি সাহিত্যিক সমালোচক এবং প্রকাশকমহলে সমাদৃত। সাধারন পাঠক ছোটগল্প বলতে যা বোঝেন অমিয়ভূষণের গল্পের অবস্থান একেবারে তার বিপ্রতীপে অবস্থান করে। যে সব লেখকের রচনায় উচ্চমারগীয় দার্শনিকতা, জটিল জীবনদর্শনের বৌদ্ধিক বিচারের প্রাবল্য, বিচিত্র বিষয়ের উপর যুক্তি ও তর্কের মোড়কে কথোপকথন এবং অনেকটা অচেনা প্রেক্ষাপট ও জীবনচিত্র থাকে সেসব লেখকের লেখা সাধারণের কাছে ততটা গ্রহণীয় হয়ে ওঠে না! অমিয়ভূষণ মজুমদার ছিলেন তেমন বিরল জাতীয় লেখক। শিল্পীর স্বাধীনতায় ছিল  ওঁর অগাধ  বিশ্বাস ও আস্থা। সেজন্য লিখিত কোন নীতি বা  তত্ত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে ছিলেন নারাজ। এ ছিল ওঁর স্বকন্ঠ ঘোষণা। একটি সাক্ষাতকারে লেখক আরো বলেছিলেন, “উপন্যাস বলতে boy meets a girl কখনও ভাবতেই পারি না।” লিখনে কি ঘটে প্রবন্ধ সংকলনের “উপন্যাস সম্বন্ধে” পরিচ্ছেদে ওঁর মতামত জানিয়েছেন, “প্রকৃতপক্ষে উপন্যাস পোর্টমেন্টো নয় যে তার মধ্যে একই সঙ্গে মায়ের চিঠি, ফুটো মোজা ও ইস্তেহার পুরে আধুনিকতার গাড়িতে চড়া যাবে। উপন্যাস আমাদের কৌতুহল নিবারণ করে না এবং আডোলেনেন্ট যৌনপ্রবৃত্তির পরিতৃপ্তির উপায়ো নয়। উপন্যাস তত্ত্ব নয় এবং বোধহয় সেজন্যই উপন্যাসের ভাষাও বাক্যের পর বাক্য বসানো হয়। উপন্যাস গল্প নয় যে গল্পটা পাঠকের মাথায় ঢুকেছে কিনা তা জানলেই ভাষা সম্বন্ধে সব জানা হল। উপন্যাস ইনসেস্ট ইত্যাদির বর্ণনা নয় যে সাংবাদিক মাত্রেই ঔপন্যাসিক হয়ে যাবেন । ওদিকে আবার উপন্যাস ভাষাচর্চাও নয়
যে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন বলেই শেষের কবিতা উপন্যাস হয়ে উঠবে। অন্যদিকে উপন্যাস বড় করে গল্প বলা নয় যে কেউ এ বিষয়েও চালাকি করে বলবে উপন্যাস বড় গল্পও বটে। উপন্যাসে, একজন বিলেতি রসিকের কথা এনে বলা যায়, গল্প থাকায় আমরা দুঃখিত, এবং গল্প যে রাখা হয় তা গল্প বলার উদ্দেশ্যে নয়, কোনটা আগে কোনটা পরে ঘটছে তা ধরিয়ে দিতে। উপন্যাস প্রকৃতপক্ষে একটা থিম যা আমাদের চোখের নিচে ফুটে ওঠে। একটা থিম যা হয়ে ওঠে। অর্থাৎ থিম নামে এক জীবন্ত বিষয়ের ভাব”।
      অতি বিরল প্রজাতি, উদ্বাস্তু, নয়নতারা, চাঁদবেনে, রাজনগর, নিরবাস, মহিষকুড়ার উপকথা প্রভৃতি ওঁর উপন্যাস ভাষা ভাবনা ও উপস্থাপনে অন্য ঘরানার। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি ওঁর রচনার গতি মন্থর। প্রতি পদে চিন্তার খোরাক। হৃদয়ের তুলনায় মস্তিষ্কের প্রয়োজন পড়ে বেশি। গাছের গায়ে ঝুলে থাকা পরিণত নারকেল এর আস্বাদন পেতে যে সময় দিতে হয় শুধু তাই নয় সেই ফল দিয়ে তৈরি নাড়ু কিংবা বরফি খেতে যে শ্রম দিতে হয় এবং মনে মনে তৈরি হতে হয় অমিয়ভূষণ মজুমদার পড়বার জন্য সেরকম  একটা প্রস্তুতি দরকার বলে আমার মনে হয়েছে। লিটল ম্যাগাজিনই ছিল ওর সহায় ও সম্বল। আমার মতো অধম পাঠকও ওঁর লেখা বিজ্ঞাপন পর্ব এবং কবিতীর্থ তে পাঠ করেছে।
আজকের এই প্রযুক্তির সময়ে  মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যাওয়া কর্মকান্ডের দুনিয়াতে থাকতে থাকতে অমিয়ভাবনা
শুধু  অতি আশ্চর্যই করে না, অন্য এক নিভৃত স্বপ্নপুরীরও স্বপ্ন দেখায়!