এমাসের জাতক

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত

 

(জন্ম: ৬ মার্চ, ১৮১২ মৃত্যু: ২৩ জানুয়ারি ১৮৫৯)

পাঠক সেনগুপ্ত

রাজসভার কবিদের যুগ পেরিয়ে বাঙালীর কাব্যপিপাসা যখন কেবল ঢপ, কীর্তন, টপ্পা, পাঁচালিকারদের হাতে মুক্তির পথ খুঁজে ফিরছে, এক সকালে ছাপাখানার স্বর্গ থেকে নেমে এল ‘সংবাদ প্রভাকর’ নামে একটা খবর কাগজ, পরে, ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে যা দৈনিক কাগজ হিসেবে বাংলার ঘরে-ঘরে সযত্নে রাখা থাকবে। তখনও বাংলা ভাষার কবিতা গীতি-শরীরের খোলস ছাড়িয়ে কবিমনের ব্যক্তিগত স্বত্তার কাছে এসে দাঁড়াতে শেখেনি। বাঙালী তখনও নিজের ভাষায় নতুন কবিতার সঙ্গে পরিচিত হতে পারেনি। বাংলা কবিতার সমগ্র ভুবনের অঙ্গনে, এমন এক আবছায়া সময়ে লিখতে এসেছিলেন কবি ঈশ্বর গুপ্ত। সুকুমার সেন বলেন, “নতুন রীতির কবিতা রচনার পথ যিনি পরিষ্কার করেছিলেন তিনি প্রথম জীবনে সংবাদপত্রের সম্পাদক রূপে খ্যাতিলাভ করেন।” নতুন যুগের কবিতা লেখার বা নতুন ধারার বিপ্লব নিয়ে লিখতে আসার চমকে দেওয়ার সমস্ত লক্ষ্মণ তাঁর হাতে ছিল না। কিন্তু সেইসব পরিবর্তনের কিছুটা সুপ্ত, কিছুটা জাগ্রত বৈশিষ্ট্য তাঁর লেখার ভেতরে যে ছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলা কবিতায় তিনিই প্রথম ব্যক্তিগত, প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতা লেখার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করার সাহস দেখালেন, তিনিই প্রথম সাহস দেখালেন বলার, “দেশের কুকুর ধরি বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।” একজন কবিকে যে সমাজদায়বদ্ধতার জায়গা থেকে কবিতা রচনায় নিবেদিত হতে হয়, সে কথাও কবি ঈশ্বর গুপ্তকে দেখেই বাঙালী বুঝেছিল। সমকালীন সাহেব-ভজা বাঙালীর বুকে দেশপ্রেমের মুকুর ফোটানোর দায়িত্ব নিয়ে ঈশ্বর গুপ্ত লিখে গেছেন। চলতি অশ্লীল ঢপ, টপ্পা, কবিগানের আসর থেকে বাঙালীকে এক ধাক্কায় টেনে নামিয়েছেন সাহিত্যের প্রকৃত সড়কে।

আজীবন পরমার্থিক, নৈতিক, সমাজসংস্কার-মূলক, ব্যঙ্গাত্মক, যুদ্ধ-বিষয়ক, দেশহিতকর বিষয়ে কবিতা রচনায় মগ্ন ঈশ্বর গুপ্ত সংবাদ প্রভাকরের জন্য লিখেছেন অসংখ্য গদ্য। বাংলা ভাষার গদ্যের জীবনের ভোর তখনও আসেনি। সে সময়েও তাঁর লেখা গদ্য সমকালকে ছাপিয়ে গেছে। অনেক সমালোচকের মতে ঈশ্বর গুপ্তের কবিতার চেয়ে তাঁর গদ্য অনেক শক্তিশালী, আবার সুকুমার সেনের মতো অনেকের মনে তাঁর গদ্য অত্যন্ত আড়ষ্ট, কিন্তু তাঁর কবিতা বেশ ঝরঝরে। সে তর্ক চলুক। আমরা বরং বাংলা ভাষার নিরিখে দেখলে বুঝতে পারব, ঈশ্বর গুপ্তই বাংলার প্রথম সচেতন সাহিত্যিক দায়িত্ববোধ-সম্পন্ন লেখক। হয়তো বিধবা-বিবাহের বিরোধিতা করে কবিতা লেখার জন্য অনেক প্রগতীবাদীদের কাছে আজও তিনি ব্রাত্য হয়ে আছেন, কিন্তু তাঁর কবিতার শ্লেষ, ব্যঙ্গ, আর নির্মল, অশ্লীলতা-বর্জিত হাস্যরসের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। তোপসে মাছ নিয়ে “কষিত কনককান্তি, কমনীয় কায়।/ গালভরা গোঁফ দাড়ি, তপস্বীর প্রায়।।” লেখার থেকে মেমসাহেবদের “বিড়ালাক্ষী বিধুমুখী মুখে গন্ধ ছুটে।/ আহা তায় রোজ রোজ কত রোজ ফুটে।।” বলার সাহস সেই সময়ে কবিরা অর্জন করতে পারেননি ঈশ্বর গুপ্তের আগে।

সাংবাদিক অনুসন্ধিৎসার অতিরিক্ত একটি কাজ ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত করে গিয়েছিলেন, তা হল দেশহিতৈষণার আকুতি, দেশপ্রেমের বোধ তিনি ছড়িয়ে গিয়েছিলেন মানুষের মনে। তাঁর গদ্যে-পদ্যে লেখা ‘হিতোপদেশ’(১৮৫৭), বাংলা সাহিত্যের আবহমানের খোঁজে নেমে কবি ভারতচন্দ্রের লুপ্ত রচনা উদ্ধার করে প্রকাশ, সাধক-কবি রামপ্রসাদের কীর্তন আবিষ্কার করে মানুষের মধ্যে প্রচার, পুরাতন কবিয়ালদের গান ও জীবনী সংগ্রহ কেবল সাংবাদিকের দিক থেকে নয়, দায়বদ্ধ কবির দিক থেকেও উল্লেখযোগ্য কাজ। সংস্কৃত রূপক নাটক ‘প্রবোধচন্দ্রোদয়’ এর অনুবাদ তাঁকে অমর করতে পারিনি, এ বাংলাভাষার ব্যর্থতা। স্কুল-কলেজের ছাত্রদের মধ্যে সাহিত্যানুরাগ ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা চালিয়েছিলন ঈশ্বর গুপ্ত। আমাদের দূর্ভাগ্য, প্রাচীন কালের সাহিত্য বৈশিষ্ট পেরিয়ে এসেও আধুনিকতার সমস্তটুকুকে গ্রহণ করতে না-পারা এক দিকভ্রান্ত ভাষার যুগসন্ধিক্ষণের ক্রান্তিকালের সংশয়িত জীবনবোধের ভাষ্যকারকে আমরা মর্যাদা দিইনি। ভাষাশ্রমিক হিসেবে বাংলার জন্য নিজের সবটুকু দিয়ে ঈশ্বর চেষ্টা করেছেন ভাষার সেবা করার, কাব্যের বিষয়বস্তু নির্বাচনে মৌলিকতার পথ পরিষ্কার করে গেছেন তিনি, যে পথ ধরে ‘ভোরের পাখি’-র কুজন শুনতে শুনতে বাংলাভাষা রবীন্দ্রকাব্যের মহাসমুদ্রে অবগাহন করেছে। কেবল অনালোচিত থেকেছেন ঈশ্বর গুপ্ত। আধুনিক কাব্যের জমি তিনি তৈরি করলেন, কিন্তু উৎকৃষ্ট ফসল তাঁর হাতে ফলল না, কাব্যরচনার সেরা ফসল তিনি তুলিতে পারলেন না ঘরে। তবু বলতেই হবে, তাঁর আবির্ভাবের সময়ে যথার্থ আধুনিকতা দূরবর্তী। আধুনিকতার যুগ-সন্ধিক্ষণে তাই তাঁর অবদান-ই বা কম কীসের? আজও ঈশ্বর গুপ্তের কথা মনে পড়লে মুখে-মুখে ফেরে “কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত, ব্যপ্ত চরাচর।/ যাঁহার প্রভায় প্রভা পায় প্রভাকর।।” কেবল এই স্মরণের কাছেই তাঁকে রেখে দিলে বড় ভুল হবে।