নরেন্দ্রনাথ মিত্র

জন্ম: ৩০ জানুয়ারি ১৯১৬ মৃত্যু : ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫

রাকেশ মণ্ডল

 

সময়ের হিসাবে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের জন্ম-শতবর্ষ অতিক্রান্ত, কিন্তু লেখনির প্রাসঙ্গিকতার হিসাব ধরলে তা এখনও অমলিন। কোন লেখাকে আমরা কালজয়ী বলব? কোন লেখককে কত সময় পরে যুগতিক্রমী বলা যায়? — উপরের প্রশ্ন দুটির উত্তর বড়ই ঘোলাটে, সঙ্গে আপেক্ষিক। কিন্তু তবুও আলোচককে একটা কিছু মাফকাঠি বানিয়ে নিতেই হয়। এক্ষেত্রে এই অর্বাচীনের প্রমথ চৌধুরীই ভরসা। ‘ভারতচন্দ্র’ প্রবন্ধে প্রমথবাবু যেভাবে ভারতচন্দ্রের কাব্য-জগতকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও উপস্থাপন করেছেন, আমাদের মনে হয় নরেন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও সেই সূত্রের প্রয়োগ পুরোপুরি ভুল হবে না। ১৯৬১ সালের ‘আনন্দ পুরস্কার’ সহ একাধিক পুরস্কার লেখকের জাতকে কিছুটা চিনিয়ে দেয়, কিন্তু তাও অনেকটাই বাকি থেকে যায় তাঁর স্বরূপকে বোঝা। নরেন্দ্রনাথের লেখায় যুগগত গরলের ছবি উপস্থিত, কিন্তু তা যেন অনেকটাই পরিশুদ্ধ। তা যেন জীবনের নেতিকে দেখিয়েও তার জয়গানেরই প্রতিধ্বনি করে। জগদীশ গুপ্ত সহ কল্লোল পরবর্তী নেতিবাচকতার মধ্যে সত্যিই তিনি এক ‘অন্য স্বর’। বর্তমানে ‘গাংগ্রিনে’ আক্রান্ত সমাজের স্বরূপকে সংবাদপত্র বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্যে দেখতে-দেখতে যখন আমরা ভাবতে বাধ্য হই যে— আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন না আসে পৃথিবীতে। তখন নরেন্দ্রনাথের লেখা পড়লে পুনরায় মনে হয়— পৃথিবীর সবটা তো এখনও শেষ হয়নি, এখনওতো কিছু মানুষ একজন অক্ষমকে হাত ধরে রাস্তা পার করে দেয়! এখনও তো কোন গৃহস্থ অবেলায় অযাচিত অথিতি এলেও নিজে অর্ধেক খেয়ে তাকেও খেতে দেয়! একজন অক্ষর সাধককে কালজয়ী হওয়ার জন্য আর কি লাগতে পারে? উত্তর আলোচকের অজানা। সহৃদয় পাঠক নিজেদের মত করে ভাবতেই পারেন।

গদ্য শিল্পী হিসাবে নরেন্দ্রনাথের লেখনি জগত যথেষ্টই বিস্তৃত। তাঁর প্রথম লেখা ‘সুখ’ নামক কবিতা ‘দেশ’ পত্রিকায় মুদ্রিত হয়। ১৯৩৬ সালেই লেখকের প্রথম ছোটগল্প ‘জীবন ও মৃত্যু’ ‘দেশে’-ই প্রকাশিত হয়। এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি তাকে।

সামগ্রিক জীবনে লেখকের উপন্যাসের সংখ্যা ৩৬টি। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্বীপপুঞ্জ’ ১৯৪৬ খ্রি. প্রকাশিত হয়। লেখকের  উপন্যাস ভুবনকে মোটা দাগে চারটি পর্বে বিভাজিত করা যায়। প্রতি পর্বের শ্রেষ্ঠ ফসলের নামগুলি নিম্নরূপ-

প্রথম পর্ব (১৯৪৬-৫১)- দ্বীপপুঞ্জ, দেহমন, সঙ্গিনী ইত্যাদি।

দ্বিতীয় পর্ব (১৯৫২-৫৬)- চেনামহল, সহৃদয়া, গোধূলি ইত্যাদি।

তৃতীয় পর্ব (১৯৫৭-৬০)- উত্তর পুরুষ, হেডমাস্টার, সেতুবন্ধন ইত্যাদি।

চতুর্থ পর্ব (১৯৬১-৭১)- উপনগর, মহানগর, পতনে উত্থানে’ ইত্যাদি।

লেখকের সামগ্রিক ঔপন্যাসিক সত্তার বিচার করলে দেখা যায়, সেখানে গ্রামীণ ও নাগরিক— উভয় জীবনই উপস্থিত। সমাজের মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত, তাদের প্রত্যাশা থেকে অপ্রাপ্তি সবটাকেই লেখক তাঁর উপন্যাসে ধরেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তৎকালীন ধ্বংস, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, চারিত্রিক নীচতা থেকে শঠতা, পরশ্রীকাতরতা সবকিছুকেই ধারণ করে রয়েছে নরেন্দ্রনাথের উপন্যাস। লেখক মানব জীবনের কুসুম ও কীট, সফলতা-বিফলতা, আচার-অনাচার— সবগুলোকেই দেখেছিলেন। সে জন্যই তাঁর উপন্যাস মানব চরিত্রের এক অনাস্বাদিত উপস্থাপন ঘটেছিল। এ কারণে ‘চেনামহল’-এর মধ্যবিত্ত জীবনের ঐতিহ্য নির্ভর প্রেম সম্পর্ক এখনও প্রাসঙ্গিক। অন্যদিকে ‘দেহমনে’-র অবাধ যৌনতার উপস্থাপন, ‘সূর্যসাক্ষী’-তে মধ্যবিত্ত নরনারীর পারস্পরিক আকর্ষণ-বিকর্ষণ আজও পাঠককে টানে। তাদের হৃদয়কেও সঙ্কুচিত-প্রসারিত করে। তাদের মন ও মননকে নাড়িয়ে দেয়।

“কিন্তু পিছন ফিরে তাকিয়ে বই না পড়ে নিজের গল্পগুলির কথা যতদূর মনে পড়ে আমি দেখতে পাই ঘৃণা বিদ্বেষ ব্যঙ্গ বিদ্রুপ বৈরিতা আমাকে লেখায় প্রবৃত্ত করেনি। বরং বিপরীত দিকের প্রীতি প্রেম সৌহৃদ্য, স্নেহ শ্রদ্ধা ভালোবাসা, পারিবারিক গণ্ডির ভিতরে ও বাইরে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচিত্র সম্পর্ক, একের সঙ্গে অন্যের মিলিত হবার দুর্বার আকাঙ্ক্ষা বারবার আমার গল্পের বিষয় হয়ে উঠেছে। তাতে পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। তা জেনেও আমি আমার সীমার বাইরে যেতে পারিনি।’’

লেখক দেখেছেন তাঁর দেখার চোখ আসলে সবসময় বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। তিনি মঙ্গলচেতনাকে নিজের লেখার পাথেয় করলেও বাস্তব অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ঠুর, করুণাহীন, শঠ ও যন্ত্রণাময়। সেখানে মূল্যবোধ কোন কাজে আসে না। বিবেক যেখানে বিকিয়ে যায় বস্তুগত প্রাপ্তিতে—এ সত্য লেখকের অজানা নয়, বরং তীব্র ভাবে জানা। এই ধারণার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর শিল্প চেতনার মূল নিউক্লিয়াসকে। এ জন্যই তাঁর লেখা বন্ধনের মধ্যে থেকেও বন্ধনহীন, এ জন্যই তাঁর অতিসাধারণ চরিত্র হয়ে ওঠে অসাধারণ। এ জন্যই তাঁর লেখা যুগগত ছাইভস্ম মেখেও হয়ে ওঠে মহেশ্বর।

বিশ শতকের চল্লিশের দশকের কথাকার হলেন নরেন্দ্রনাথ মিত্র। তাঁর রচিত ছোট-বড় গল্পের সংখ্যা প্রায় শ চারেক। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু গল্প সংকলন হল- ‘অসমতল’ (১৩৫২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত লেখকের প্রথম গল্প সংকলন), ‘হলদেবাড়ি’, ‘চড়াই উৎরাই’, ‘কাঠগোলাপ’, ‘মলাটের রঙ’, ‘বসন্ত পঞ্চম’, ‘ময়ূরী’, ‘বিন্দু বিন্দু’, ‘বিনি সুতোর মালা’ ইত্যাদি। তাঁর লিখিত একাধিক শিল্প সফল গল্পের মধ্যে- ‘চড়াই উৎরাই’, ‘এক পো দুধ’, ‘রস’, ‘রানু যদি না হ’তো’, ‘অভিনেত্রী’, ‘সেতার’, ‘হেডমাস্টার’, ‘স্বাধিকার’  ইত্যাদির নাম করা যায়।

নরেন্দ্রনাথের কিছু জনপ্রিয় ও শিল্প সফল ছোটগল্প নিয়ে ইতিপূর্বে বহু আলোচনা হয়েছে। যেখানে বিভিন্ন আঙ্গিকে আলোচনা করে দেখানো হয়েছে তাঁর ‘রস’ সৃষ্টির ভুবনটিকে। তাই এখানে কিছুটা বিপরীত পথকেই আশ্রয় করা হল। আপাতঅর্থে কিছুটা অল্প পরিচিত একটি গল্পের (‘কাঠগোলাপ’, আনন্দবাজার পত্রিকা, পূজা সংখ্যা ১৩৫৫) স্বরূপ সন্ধান করা হল।

পাকিস্থানের সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধার পরিস্থিতিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় বাঙালির মনন দর্শন ও তাদের জীবনচর্যাকে তুলে ধরা হয়েছে ‘অণিমা’ ও ‘নীরদ’ নামি দম্পত্তির মধ্য দিয়ে। সমকালীন কলকাতায় ‘হঠাৎ উদ্বাস্তু’ বাঙালির জীবন যাপন ও জীবনচর্যাকে করুণ কিন্তু কোমল ভাবে ফুটে উঠতে দেখা যায় এই গল্পে। যেখানে দুঃখ আছে, যন্ত্রণা আছে আবার তারই সঙ্গে রয়েছে ভোগবাদী সভ্যতার আগ্রাসন ও তার প্রভাব। যে কোন দম্পত্তির দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হল ‘বিশ্বাস’। যেটা অনেকটা গোলাপের মতোই কোমল। কিন্তু এই গল্পে দেখা যায় যুগগত প্রভাব, পরিবেশ ও পরিমণ্ডল সেই কোমলতাকে নষ্ট করে দিতে চেয়েছে। যে কারণে ‘গোলাপ’ ক্রমশ ‘কাঠগোলাপে’ রূপান্তরিত। কিন্তু লেখক নরেন্দ্রনাথের গল্পের DNA অন্য কথা বলে— পাঠককে কিছুটা চমকেও দেয়। তাই দেখা যায়, ‘কাঠগোলাপের’ ভূমিই শেষ পর্যন্ত রূপান্তরিত হতে চায় ‘গোলাপে’। সেই ইঙ্গিতকে গায়ে মেখেই এ গল্পের  অসীমান্তিক উড়ান সূচিত হয়েছে। সূচিত হয়েছে মানসিক বিনষ্টি থেকে মানবিক প্রীতি ভাবনা ও ভালোবাসার এক স্বপ্ন উড়ান। এখানেই নরেন্দ্রনাথ কালজয়ী-স্বতন্ত্র।

গোপাল হালদার ‘আধুনিক সাহিত্য’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, শিল্পিত লেখার গায়ে সময়ের কিছু ছাপ থেকে যায়। সেই ছাপকে এই গল্পের একাধিক স্থানেও নিরীক্ষণ করা সম্ভব। অণিমা ও নীরদের কথোপকথন কখনও কখনও এই সত্যের স্বরূপকে বহন করে—

“বাড়ি ঘরের অবস্থা দেখে অণিমা প্রথমে ভ্রু কুঁচকেছিল।

এ কোথায় এনে তুললে? এই নাকি কলকাতা?

নীরদ জবাব দিয়েছিল, ‘হুজুগে, হিড়িকে যারা দেশ ঘর ছেড়ে এসেছে, তাদের কলকাতা এইখানেই, এইরকম।”

যদিও এই নোংরা, স্যাঁতসেঁতে, দুর্গন্ধময় কলকাতা হল ঘটনার বহিরঙ্গ, অন্তরঙ্গ এর থেকে অনেক গভীর-অতল।

কলকাতা বসবাস কালে অণিমা খুব দ্রুত মানিয়ে নিতে চাইত, খুব তাড়াতাড়ি ‘শহুরে’ হয়ে ওঠার তাড়নায় সে যে সমস্ত কাজ করে বসত, তার সবটাই যে নীরদের মন সায় দিত তা নয়। অনেকাংশেই তার মনে জমত রাগ- দুঃখ-অভিমান ও যন্ত্রণা। সেটার বহিঃপ্রকাশ সবসময় কাজে না হলেও কথায় কোন কোন সময় প্রকাশ পেত। অনিমার পরিবর্তিত মন-মনন তথা ভাবনা— নীরদকে পীড়া দিত। পীড়া দিত অণিমার ক্রমশ বদলে যাওয়া রুচি বোধের মাত্রা, বস্তুগত চাহিদার ভাবনা। সে জন্যই লেখকের কলম নীরদের মনকে পরিস্ফুট করে তোলে—

“শহরের এই ছোটখাটো সুখ-সুবিধার জন্য স্ত্রীর এই কাঙালপনা, হ্যাংলাপনা দেখে কেমন যেন লজ্জা হয় নীরদের। কিন্তু কিছু বলতেও বাঁধে। … নারী প্রকৃতির সঙ্গে প্রাকৃত জনের রুচি বুদ্ধির যেমন মিল, তেমন মিল যেন আর কারো সঙ্গে নেই।”

নীরদের এই বদলে যাওয়া মন-মানসিকতা তাদের দাম্পত্য সমস্যার স্বরূপকে চিহ্নিত করে। যেখানে তারা একই ছাদের তলায় থাকলেও মন যে পুড়ে ছারখার! হৃদয়ে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার যে টান তা অন্তহিত। এমতাবস্থায় নীরদের চাকরি চলে যাওয়া (যদিও তা অণিমার জন্যই) সেই সম্পর্ককে অন্য এক মাত্রার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

গল্পের অভিমুখ এক ট্র্যাজিক সমাপ্তির গন্ধ দেয়। কিন্তু এখানেই নরেন্দ্রনাথের কৃতিত্ব। তিনি অন্য মোহনায় গল্পকে নিয়ে ফেললেন! যেখানে সম্পর্কের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই ফিনিক্সিও উত্থানের এক স্বরূপ সন্ধান মেলে। গল্পের ক্ষুদ্র শেষাংশ নিম্নরূপ—

“মাথার তলায় হাত দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে অণিমা। ফের সন্তান হবে। … চেয়ে থাকতে থাকতে নীরদের মনে হ’ল ঠোঙাগুলি যেমন-তেমন-ভাবে ঝাঁকার মধ্যে ঠেসে দেওয়া হয়নি। বেশ একটা ফুলের নক্সায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ফুলটি অবশ্য শেষ হয়নি। কেবল শুরু হয়েছিল। কি ফুল কে জানে। নীরদ তো সব ফুল চেনে না। হয়ত কাঠগোলাপই হবে।”

ছোট-ছোট সংকেত অনেক কিছু বলে দেয় এখানে। অনিমার গর্ভবতী হওয়া, ঠোঙাগুলিকে সাজিয়ে রাখা আংশিক গোলাপের আকৃতিতে—এগুলো আসলে তাদের দাম্পত্য সম্পর্কের এক নবজন্ম। ‘নষ্টনীড়ের’ মধ্য থেকেই ‘নবনীড়ের’ সুরকে খুঁজে পাওয়া।

একটি গল্পের মধ্য দিয়ে কোন লেখকের স্বরূপকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু তার লেখনি সত্তার দিকবলয়কে  আংশিক হলেও পাওয়া সম্ভব। আসলে নরেন্দ্রনাথের লেখনি আমাদের নতুন করে ঘর বাঁধতে শেখায়। শেখায় কীটদষ্ট পুস্পকেও সৌরভে ভরিয়ে দেওয়ার জাদুকে। এখানেই লেখকের মূল কৃতিত্ব।