এ মাসের জাতক

গোবিন্দচন্দ্র দাস

জন্ম: ১৬ জানুয়ারি ১৮৫৫ মৃত্যু : ১ অক্টোবর ১৯১৮

 

 

উনিশ শতকের বাংলা গীতিকবিতার ধারায় গোবিন্দচন্দ্র দাস ‘স্বভাব কবি’ হিসাবে বিশেষভাবে চিহ্নিত। বর্তমান লেখকের কাছে কবিত্বের এই ‘স্বভাব’ বিষয়টি বড্ড গোলমেলে। কবিত্বের এই ‘স্ব’-টি ঠিক কী ? ‘স্ব’-টিকে ঠিকঠাক চিহ্নিত করতে না পারলে ‘স্ব-ভাব’-টিও বোঝা কঠিন। ‘স্ব’-এর অন্তর্গত অর্থে মনোযোগ দিলে প্রত্যেক কবিরই তো ভিন্ন ভিন্ন সত্তার ‘স্ব’ তথা স্বর তাঁর কবিতার মধ্যে কাঙ্ক্ষিত। যাইহোক, বাঁধভাঙা হৃদয়োচ্ছ্বাসের যে অকৃত্রিম, স্বতঃস্ফূর্ত ও অকুণ্ঠ উৎসারণ গোবিন্দচন্দ্র দাসের কবিতায় তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রায় উপস্থিত, তাকে বিশেষভাবে চিহ্নিতকরণের উদ্দেশ্যেই তাঁকে ‘স্বভাব কবি’ রূপে উল্লেখ করা হয়। তিনি ইংরেজিনবিশ ছিলেন না। তাঁর কাব্যভাষাতেও ছিল না প্রবল পরিশীলন ও পরিমার্জনের শিল্পনিষ্ঠতা। প্রচণ্ড ‘প্যাশন’-এর উন্মত্ত আবেগ-ঋদ্ধ ভাব ও অনুভূতি- তাঁকে ‘স্বভাব কবি’ আখ্যায় বিশেষিত করেছে।

 

অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলায় ভাওয়ালের জয়দেবপুরে এক দরিদ্র পরিবারে কবির জন্ম। শৈশবে পিতৃবিয়োগের কারণে নবম শ্রেণির পরেই তাঁকে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে হয়েছে। কোনও আপস নয়—প্রবল প্রতিবাদী সত্তা কবিকে জীবনে ও শিল্পে দুঃসাহসিক করে তুলেছিল। ভাওয়াল স্টেটে কাজ করার সময় অত্যাচারী জমিদারের সঙ্গে আপস ক’রে তাঁর কাছে নতজানু হতে পারেননি কবি। জন্মভিটে ত্যাগ করতে হয়েছিল তাঁকে। জীবনে শেষপ্রান্তে স্ব-ভূমে ফিরে এলেও চূড়ান্ত দারিদ্র ও শোচনীয় দুরবস্থার মধ্য দিয়ে শেষ জীবন কাটে। একটি কবিতায় কবির ব্যথাদীর্ণ হৃদয়ের উচ্চারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাব্যরূপ লাভ করে:

“ও ভাই, বঙ্গবাসী, আমি মরলে—

তোমরা আমার চিতায় দিবে মঠ ?

আজ যে আমি উপোস করি,

না খেয়ে শুকায়ে মরি,

হাহাকারে দিবানিশি করি ছটফট

ও ভাই, বঙ্গবাসী, আমি মরলে,

তোমরা আমার চিতায় দিবে মঠ ?”

 

গোবিন্দচন্দ্র দাসের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল—‘প্রেম ও ফুল’ (১৮৮৮), ‘কুঙ্কুম’ (১৮৯২), ‘কস্তুরী’ (১৮৯৫), ‘চন্দন’ (১৮৯৬), ‘ফুলরেণু’ (১৮৯৬), ‘বৈজয়ন্তী’ (১৯০৬) প্রভৃতি। গোবিন্দচন্দ্র দাসের স্বাতন্ত্র্য, বাংলা কবিতায় ইন্দ্রিয়-আশ্রিত দেহবাদের প্রবর্তনায়। প্রেম-প্রণয়কে অশরীরী নান্দনিকতায় প্রকাশ নয়, দেহবাদই কবির সর্বসাধ্যসার :

“আমি তারে ভালোবাসি অস্থিমাংস সহ !

আমিও নারীর রূপে

আমিও মাংসের স্তূপে,

কামনার কমনীয় কেলি-কালিদহ—”

বাংলা কবিতায় এই অভিনব প্রকাশ আকস্মিক এবং অবশ্যই সেই সময় বিস্ময়সূচক। কারণ ভাবের এই অসংযমী নান্দনিকতা ইংরেজি সাহিত্যের রোম্যান্টিক কবিদের প্রবাব-সৃষ্ট নয়—কবির নিঃশ্বাসের মতোই অন্তর্জগতের উৎস-জাত। পরবর্তীকালে মোহিতলাল মজুমদার, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখদের কবিতার পরিবৃত্তে যে ইন্দ্রিয়ানুরাগ ও দেহবাদ প্রবলভাবে উপস্থিত, তার উত্তরসূরি হিসাবে গোবিন্দচন্দ্র দাসকে চিহ্নিত করা যেতেই পারে। আধুনিক বাংলা কবিতার শিকড়ের সন্ধানে উনিশ শতকের এই বিশিষ্ট কবির কাব্যচর্চার অভিনবত্ব অনুসন্ধান ও চিহ্নিতকরণ আবশ্যিক এবং অনস্বীকার্য।