ক্যাম্পে     

অমিতকুমার বিশ্বাস

রাণাঘাট?

নাহ্‌।

নুনদিঘি?

নাহ্‌।

হাবড়া-অশোকনগর?

নাহ্‌।

তালি আমাগো সাতে বনগাঁতেই চলেন। বডারের কাছাকাছি হবেনে। অতুলদা-ই কলো।

অতুলদা?

আরে কাশীপুর ক্যাম্পের অতুল শিকদার, ব্যাবাকে যারে অতুল আমিন কয়।

অ…

আপনের মুখখানা দেইখা মনে হয় চেনলেন না তারে…

অ…হহ…ভাসা-ভাসা লাগতাচে কেমন…

আরে শিয়ালদা ইস্টিশানে পঞ্চম দিনি আপনের সাতে আলাপ হইচেলো যার। আমার সাতে ছেলেন তিনি। আপনেরা তামুক খালেন একসাতে, মনে নাই?

অ্যাঁ? মন কও আর স্মৃতি কও ব্যাবাক যে ঘুনিতি খাইচে নীরদদা!

আরে ঘুনিধরা লাঠি হাতে সেই দুহারা বরিশালের লোক, কতাবাত্তায় এট্টা অন্য স্বাদ, অন্য মজা ছেলো, বরিশালগো যেমন থায়ে আর কী, আমাগো সাতেই বানপুর-গেদে দে শিয়ালদা ঢুকিচেলেন, পড়চে মোনে কিচু?

অ…ঘুনিধরা লাঠি?

আর হাতে একখান ঘড়িও ছেলো। আর চোখে চশমা। আপনি জিগালেন, ক’টা বাজে? তিনি মজা কইরা উত্তর দেলেন, বিশ্বেসদা, আমারে জিগান ক’দিন বাজে, তালি উত্তরখান দিবানি! কারণ কী এইহানে আসপার পর আমার ঘড়িতি ঘণ্টার কাঁটা তুইলা দিনির কাঁটা লাগাইচি। রিফিউজিগো ঘড়িতি মিনিট বা ঘণ্টার কাঁটা থায়ে না, থায়ে খালি দিন-মাস-বচ্চরের ঘণ্টা… হে হে…

ও মোনে পোড়িচে, মোনে পোড়িচে! বাম-গালে একখান আঁচিলও ছেলো…

হ’ হ’, ঠিক ধরিচেন।

তালি আর কী, নিজিগে লোকই তো দেক্তিচি। চিন্তা নাই। তা আর কী কলেন তিনি?

আর কী কবেন? কলেন যে পাশেই ব্যানাপোল। দ্যাশ শান্ত হোলি-পর পগারপার দিবানি।

ভালা কলেন। ভালা! জমিজমা তো এট্টুও বিক্‌রিবাটা কইরা আসতি পাল্লাম না। পাকিস্তান সরকার আচুমকা হেঁদুগো জমিনির উপর সমন লাগাইয়া দেলে। ফিরা গিয়া এইবারে যদি বিক্‌রি কোত্তি পারি।

তা বিক্‌রি করবো ক্যান?

তালি?

ক্যান, থাকপো!

থাকপেন?

হ’!

আমার মন কলাম সায় দ্যায় না। যে মাইরডা খাইচি…!

ও, আমরা খাই নাই বুঝি?

খান নাই, তাই কি কইচি? আসলে দুই-দুইবার ডাকাতি হইচে আমার হাট-ফিরতি কাপড়ের নাওখান। মালের গাঁট লুটেপুটে নেচে। সব জানি, কিডা নেচে।

জানেন?

হ’। সব জানি। কিন্তু জেইনে লাবডা কী?

তা পুলিশে যান নাই?

হে হে…কন কী? পাকিস্তানের পুলিশ আমাগো কতা শোনে কবের থিকে, নীরদদা?

তা যা কইচেন। শোনে নাই-ও কোনোদিন। কিন্তু মন কয়, দ্যাশের হাল পালটাবে। অতুলদা কলো ওর এক গেয়াতি আইচে ব্যানাপোল পার হইয়া। দ্যাশ এট্টু হলিও শান্ত হইচে।

আর কাজিয়ার আগুন?

পদ্মাবিল্যার কাজিয়া কিন্তু ব্যাবাকে ভুইলা গ্যাচে।

তাই হয়? এত কাটাকাটি, এত রক্ত, এত আগুন…সব কি ভুইলা যায়োন যায়? যাবে কোনোদিন?

ত্যাল না থাকলি, খড় না থাকলি আগুন তো একসুমায় ফাজায় আসে, তাই না নেত্যদা?

কিন্তু মনের আগুন? ত্যাল-খড় না-পালিও ধুক্‌ধুকায়ে জ্বলে যে!

তালি যাবা কুথায়? জানান। কাল কিন্তু অতুলদা আসপেনে। পরশু বনগাঁ থিকে ফেরচেন। জমিন দেইখে আইচেন। বিলির পাশে ছয় দাগে ধানিজমি।

এট্টু মাথা গুঁজার জায়গা হোলিই হয়। খালাবিলার লোক আমরা।

এট্টু উঁচো জমি। শহরের এক পিরান্তে। ব্যবসা কুটায় যারা নাম লিখাইচেলো, সরকার তাগো ছয় শতক করে দেবে কইচে। সাতে দুই হাজার ট্যাকাও। সেই দিয়ে ঘর বানাতি আর ছাতি হবেনে।

অ। তা সহদেব মণ্ডলরা যাবে ক’নে?

নৈনিতাল। আর নাহোলি দণ্ডকারণ্য তো আচেই।

কত পাবেনে?

তা এগারো বিঘে। চাষা কুটায় নাম লিখানো ওগো। তাই এগারো।

পাথুরি জমিতি আমাগো নাহান বিলেনজমির চাষারা কী ফলাবেনে সেইখানে? মারার পিলান নেকি? মনে খালি কু-গায়। এত বড় বাংলা ফ্যালায়ে দণ্ডকারণ্য?

ছাড়ো ওগো কথা। আমাগো কও। বনগাঁ? পাকা তো?

উপায় তো কিচুই দেখিনে আর। তাও আজকের রাতটা পার হোতি দ্যান এট্টু।

আইচ্চা। কন তালি কাল। আর পারিনে। সাড়ে-তিন বচ্চর তো তাঁবুর নীচেই কাটালাম। এই আমবাগানের নীচে। ছায়া আচে, কিন্তু আপনে তো জানেন, কলেরা আর ম্যালেরিয়া ক্যামনে ধরিচেলো এই তিন নাম্বার কাঁকসা ক্যাম্পে। তিন বচ্চরে অদ্দেক উজাড়! আমার সংসারডার খবরও তো জানেন।

আপনার চোখে তালি জল আচে এখনও?

জল কই? এ তো জেবন। চোখ দিয়া বাকি জেবনডা বাইরইয়া যাচ্চে।

হে হে! ভালা কইচেন। জেবন বাইরইয়া যাচ্চে! কাজিয়া বাদলো তেইশি। আর তার রেশ থাকলো দ্যাশভাগের পরও। শেখরা আসল এক কালারাইতে। যারে সামনে পালো, তারেই আন্দোসান্দো কুপালো। লাশের পর লাশ বিছালো। নিখিলির দুইডা পাই-ই কাটা পড়ল। আমার জেবনডা তহনই বাইরইয়া গ্যালো, নীরদদা!

আর নিখিলির পুলাডা?

এট্টা হইচেলো ক্যাম্পে আসপার পর। কিন্তু বউর বুকি যে দুদ নাই। তাই বাড়লো না আর।

কঙ্কালের আর কী থায়ে!

হ’। আমি ক্যাম্পে ক্যাম্পে পড়ায়ে দুই-চারআনা যা পাই, তাই দিয়া দুদ কিইনা খাওয়াই। বউডারেও দিই, যদি এট্টু মাংসু লাগে শরীলি। বংশের বাতিডারে যদি জ্বালায়ে রাকতি পারি আর কী। তা আর হলো কই।

ক্যান? কী হইলো?

বাতি আমার ফাজায়ে গ্যালো, নীরদদা! ফাজায়ে গ্যালো খালি…

আহা! আইজ-ই আপনের মুখ থিকে জানতি পাল্লাম ব্যাপারখান।

হুঁহ্‌, কাইল-ই ভবের নটে গাছটা মুড়াইয়ে গ্যাচে।

তাজা পরানডা…আহা…! হে ঠাউর…!

এক আন্ধার রাত্তিরি তাঁবুতি নাতিনডা জন্মালো। তাঁবুর নীচে আলো আর আলো আইসা পড়ল। যেন বহুকাল পর উঠোনে হ্যাজাক জ্বলচে! হরিচান্দের মহাচ্চোপ হচ্চে দ্যাশের বাড়ির উঠোনে। তাই তারে নাম রাখলাম ‘আলো’। সেই তাঁবুতি-ই আলোডা একদিন কীভাবে ফাজায়ে গ্যালো!

হ্যাজাক না, হ্যাজাক না, কুপি! জেবন মানেই তো কুপি, নেত্যদা!

হ’, ঠিক কইচেন, কুপি!

এট্টু বাতাস আইলে-পরে তাঁবুর খুঁটিডা নড়ে। আর তার ভিতরে কুপির শিখাডা তহন জ্বইরো পুলাপানের নাহান কাঁপতি থায়ে খালি। কাঁপতি-কাঁপতি একসুমায় আর নাই! নাই তো নাই! নাই নাই নাই! সাদা ধুমা ওড়ে খানিক। তাও আর নাই। এই তো আমাগো জেবন। তা নাতিনডারে মাটি দেচো না আগুন?

মাটি।

কোনখানে দিলা?

এক আর দুই নাম্বারের পিচোনে সাঁওতালপাড়ার দিকি যাতি যে বিশাল শাল-শিরীষির জঙ্গলডা আচে…

ও…

সেইখানে।

পশ্চিমপুতায়?

হ’।

ওইদিকি যাতি সাহেবগো কুয়াটার না?

হ’।

কাইল ওইহানে ইট আনতি গেচিলো নগা। আইসা কলো কী, লোকজন যাতি দেচ্চে না ওইদিকি। ভূতপেরেতের আমদানি হইচে নেকি।

হ’। ভূতির কতাডা শুনিচিলাম।

দিনিদুপুরিও নেকি দুপ-দাপ ইট ছুড়ে মাত্তিচে কিডা।

লোক তো তাই কয়।

অ। তা আপনেগো ক্যাম্পগুলান তো শুনছি সাহেবগো জাহাজ উড়ানোর জন্যি তইয়ের হইচেলো। হিটলার না কিডা খেপিচেলো। সেই জন্যি যুদ্ধ। সেই জন্যি হিরোশিমায় বুমা। সেই জন্যি…

হ’। নাম শুনিচি লোকটার।

সে-ব্যাটা মরিচে তা এগারো-বারো বচ্চর হোতি চল্লো। তারেই তো শায়েস্তা কোরতি বিটিশগে সাতে জুটিচিলো আমেরিকার সাহেবরা। এক-দুই ক্যাম্পের মোদ্দি মোদ্দি শানের চাতালেই তো ওগো তাঁবু ছেলো। আর আধপুড়া মাটির দালানে থাকতো ওগো বড় সাহেবরা। উপরের টিন তো সব চুরি গ্যাচে। ইটও সেইরোম যাচ্চে। নেন, তামুক খান।

হ’, খাচ্চি।

রোজ দুপুরি সাঁওতালপাড়ার ওইদিক দিয়া জাহাজ উড়ানোর আওয়াজডা কানে আসে খালি। তা আমগাছের গুঁতোয় আকাশডা দেখতি পাইনে।

জাহাজগুলান ওড়ে না আর। কারা যেন সেগুলান সারে।

কারা? সাহেব?

কে জান্নে!

সাহেব হবে ক্যামনে? দ্যাশটা ভাগই তো হলো এই দশ বচ্চর। সাহেব মরিচে, নয় ভাগিচে। আর মরিচে বলেই ভূত হইচে। আচে আচে, ওই ভূতির নাহান ঘরগুলানেই ভূত আচে। জাহাজগুলান আর ওড়ে না, সারে। হে হে। এইডাও তালি এক কুরুক্ষেত্তর ছেলো। তার আগে শুনছি কাঁকেশ্বর নাম ছেলো জায়গাডার। সদ্‌গোপগো গোপভূম। বীরভূম, সিংভূম, মানভূম, গোপভূম, ভূম ভূম ভূম…জাহাজ ওড়ে না, সারে…হে হে…

ম্যালাকিচু জানেন দেক্তিচি।

জানি কই? অতুলদা কইচে। আমিন লোক তো, যেইহানে যায়, জমিনির ইতিহাস-ভূগোলের খবরডা নেয়।

কাঁকেশ্বর? মানে কংসেশ্বর? মানে কংস? মানে যাদবরাজ কংস, শ্রীকৃষ্ণ যারে পিরানে মারিচিলো?

কে জান্নে।

সেই কংসেশ্বর থিকেই কি কাঁকসা?

কী কাম জেইনে! অতুলদা কইচেলো, তাই আপনেরে কলাম। যদুবংশের কাজিয়ার পর যাদবরা দ্বারকা থিকে আমাগো নাহান রিফুজি হইয়া এই রাঢ়বঙ্গে আইল না কি কংসের আমল থিকেই এই গোপভূম এইহানে ছেলো  তা দিয়া আমার কাম কী? কুথায় যদুবংশের কাজিয়া, আর কুথায়-বা কঁকসা-গোপভূম! কুথায় হিটলার, আর কুথায় ভারতবষ্য! সারা দুনিয়া জুইড়া কুরুক্ষেত্তর এহন। সেইহানেই এক-দুই ক্যাম্প! পানাগড়-কাঁকসা রিফুজি-ক্যাম্প। আমিরিকার সেনারা উড়োজাহাজে বোমা পোরতো, আর জাহাজগুলান উইড়া-উইড়া মাত্তো। ‘হিরোশিমা-নাগাশাকি/ কারে দ্যাও তুমি ফাঁকি।’ ফুরররররর…ফুস…দুম-ফট-ফস-গুদাম! ব্যস। খেল খতম। ব্যাবাক ফিনিশ! ওড়ে না আর, সারে। হে হে! সারে জাঁহাচে আচ্চা…ষাঁড়ে দিয়েচে বাচ্চা…এট্টা না দুডো না পাঁচ-পাঁচটা…হে হে…ওড়ে না, সারে। কারা সারে তা কিডা জানে। ভূত? ন্যাহ্‌ ন্যাহ্‌! ওদ্দা, থামলেন ক্যান, তামুক টানেন!

হ’।

আপনে ভূত মানেন?

স্বাধীনতা মানলাম, দ্যাশভাগ মানলাম, তালি ভূত না-মানলি যাবো ক’নে?

যা কইচেন এট্টা! ষাঁড়ে দিয়েচে বাচ্চা…এট্টা না দুডো না…হুঁহুঁউঁউঁউঁউঁউঁ…! আমলাজোড়ায় ষাঁড়ের বাচ্চা দিয়ার ঘটনা, এক নাম্বার ক্যাম্পে ভূত আমদানির ঘটনা…সব যেন গোলমেলে ঠ্যাহে।

আর দ্যাশভাগটা? ষাঁড়ের থিকে কি কম?

কম? হে হে! ম্যালা ম্যালা! চাল-ডাল-পুলাপান নিয়া সুখি ছিলাম, আর অমনি ভূতি আইসা আমাগো ঘপাঘপ কিলোলো! ভূতগুলান কিলোয় যাচ্চে আজও। ডাকেন সবক’ডারে, সব বাবুরে, হাপসাহেবরে, ন্যাতারে। গিয়া কন কী, লেকচার-ফেকচার না-মাইরা আমাগো সাতে কডা রাত এই তাঁবুর নীচে কাটাতি।

‘চাল-ডাল-পুলাপান/ হরিচান্দে দুইকান!’ ম্যালা সুখিই ছিলাম কিন্তু নীরদদা!

চোত-বোশেখের রোদেই কত মরে সাফ! বষ্‌ষায় আসে ম্যালেরিয়া-কলেরা। শীতি তো যেন তাঁবু ভেদ কইরা বরফ পড়ে! হে হে ষাঁড়! ধম্মের ষাঁড় এহন ধম্মের থিকেও বড় হচ্চে নেত্য-নেত্য। গুঁতোচ্চে। বিয়োচ্চে। আর ক’দিন পর হয়তো শুনতি পাবানি, আকাশে উড়তিচে! হে হে…এহন ওড়ে না, সারে…! কারা সারে? নেত্য দুপুরি জাহাজগুলান পিচেশের নাহান চ্যাঁচ্যাঁয় খালি…গ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁ…

ইঞ্জিন সারে।

সারে ক্যান? আমাগো নতুন নাই?

কে জান্নে!

জাইনাই-বা লাব কী! কত কিচু দ্যাখলাম, জানলাম। জানতি-জানতি জানোয়ার হইলাম। এই জঙ্গলের জানোয়ার। যে শালার বাঙ্গালি অপিচার স্বাধীনতার আগ-পজ্জন্ত বিটিশির পোন্দ চাটত আর দ্যাশের পোন্দ মারতো, আমাগো রক্ত চুইষা-চুইষা খাতো, আর স্বাধীনতার দিন সেই লুমাডাই সবার আগে দড়ি হাতে তেরঙ্গা তুলবার লগে খাড়া! হে হে! সেই-ই এহন নেকি দ্যাশের বড় সেবক! রাতারাতি দল পালটায়ে গেল, রং পালটায়ে গেল। আর আমরা শালা যে খালুরাম, সেই খালুরামই থাকলাম। দ্যাশ হারালাম। স্বজন হারালাম। গেয়াতগুষ্ঠি হারালাম। আর শালারা খালি আকাশে উড়তিই থাকলো। আরো উঁচু, আরো উঁচু…। উঁচু-দে মানসের পানে তাকাতি থাকলো। মানসে তহন পিঁপড়ের নাহান লাগে খালি। পিঁপড়েগো দিকি ওরা খুঁদ ছোঁড়ে, কুঁড়ো ছোঁড়ে, এক-দু’আনা ছোঁড়ে। আর আমরা কুড়াই। খাই। ডানা বানাই। উড়বার চাই। কিন্তু আমাগো যে উড়া মানা। উড়িচো কী মরিচো! উড়তি গেলি হয় আপনেরে আগুনি খাবে, নয়-তো পাখিতি!

কথায় কয় না, পিপীলিকার ডানা হয় মরবার তরে!

কিন্তু নেত্যদা, পিঁপড়ে উড়তি-উড়তি যদি একদিন পাখি হইয়া যায়?

তাই আবার হয় নেকি?

ক্যান হয় না? ষাঁড় যদি বিয়োতি পারে, ভূতি যদি ইট ছুঁড়তি পারে, তালি পিঁপড়ে পাখি হোতি পারবে না ক্যান?

আগুন আর অন্য পাখিরা ছাড়বেনে তারে?

ছাড়বে না? কচ্চেন? হে হে…উড়োজাহাজ ওড়ে না, সারে…খালি সারে…পিচেশের নাহান গুঙায়, গ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁ…! ওড়ে না, সারে…! সারে জাঁহাছে আচ্চা…কবরিস্তান হামারা হামারা…ষাঁড়ে দিয়েচ বাচ্চা…এট্টা না দুডো না, পাঁচ-পাঁচটা…দ্যান, তামুক দ্যান।

তামুকডা কিন্তু ভারী ভালা। কই থে আনচেন?

কুমুদ আইচেলো কাইল দ্যাশ থিকে। অতুলদা’রে নে আইচেলো জমির ব্যাপারে। সেই কুমুদ বনগাঁ থিকে তামাক নিয়াইচে।

বনগাঁ…আহা…! দ্যাশের কোলে বনগাঁ…! তাই বুঝি তামুকডার স্বাদ-ঘিরানে এট্টা পরানের টান পাই!

হে হে, এরেই কয় দ্যাশের টান। মা’র টান। মাটির টান। ‘গালের মোদ্দি খিলিপান/ স্বাদ-গন্দে ভরা পিরান!’ তালি বনগাঁ-ই পাকা?

কাইল জানাই। সন্দেতে আসপানি। থাকপেন তো?

যাবো কই এই তাঁবু ছাইড়া? মুক্তি কবে যে পাবানি হরি! এহন কি উঠবার চান?

হ’।

সন্দেও হইচে। সাতে লাঠি আচে তো?

আচে।

চান্দ আচে, ভয় নাই।

চান্দ-ই তো মায়ায় জড়ায়ে দ্যায়। শ্যাষে কান্দায়। মিছা আলো যে তার!

মিছা?

হ’, মিছা। মিছা কথায় মিছা আলোয় স্বপ্ন বেশি। কান্দনও বেশি।

জেবনডাই কেমন আমার মিছা মিছা লাগে খালি। ‘মিছা আলো।’ কথাডা কী সুন্দর কইলেন আপনি, নেত্যদা! তাই তো আপনার নামডাই বুঝি ‘নেত্যানন্দ’। এত দুক্কের মোদ্দিও কীরোম আনন্দে মেতি থায়েন দেক্তিচি! আন্ধারের মোদ্দি আলোয় থায়েন। আলো! আপনার নাতিনডার নাম ছেলো না এইডা?

হ’। ফাজায় গেছে।

কইচেন।

এইটুখানি হইচেলো। এই…এইটু…! মাজায় এট্টা জালের কাঠি কালো তাগা দিয়া বাইন্দা দিচিলাম। দোড়োনো শেকচে, কথা কওয়া শেকচে। ন্যাংটাপুঙায় খালি ছুইটা বেড়ায়। কাইল দুপুরি উড়োজাহাজের শব্দ পাইয়া পশ্চিমপুতা গ্যালো। সাতে একদল বাচ্চাকাচ্চা ছেলো। সাহেবকুয়াটারের পাশে জড়ো হইচেলো। এমন ভোঁ বাজলো যে ব্যাবাকে ভয় পাইয়া ছুইটা যাতি চালো। ধাক্কাধাক্কিও হলো। দিয়ালে গে ধাক্কা খালো কয়ডা। তার মোদ্দি নাতিনডাও ছেলো। অমনি উপরদে এট্টটা ইট…এট্টা ইট আইসা পড়ল…

কাইন্দেন না নেত্যদা…কাইন্দেন না…

তাঁবুতি নে-আইলো তারে। রক্তমাখা ন্যাংটাপুঙা। পিঁপড়েগো উড়তি মানা।

আহা…

কাইল বিহানে মাটি দিছিলাম তারে। শিয়াল-কুকুর ফালুক-ফুলুক করতিছেলো। চটা দিয়া ঘেরা-দে আইলাম। মনডা মানল না, মাইজ রাইতে উইঠা আলগা মাটির ’পর ইট-পাথর চাপা-দে আইলাম।

শুদুকি শিয়াল-কুকুর নেত্যদা? মানসেও কলাম কম যায় না। শুনিচি লাশ চুরি কইরা কারা যেন চালান দেয়। তা তারপর?

তারপর আর কী! ভাবচিলাম বংশের পেত্থম বাতি। ফাজায় গেলিও তো নামডা তার ‘আলো’। পরানের পরান ‘আলো’। খুঁড়া বাপ আর কঙ্কাল মা’র আন্ধার ঘরের ‘আলো’।

কী ভাবচিলেন তা?

ভাবচিলাম হাড়গোড়গুলান জমিন পালি-পর সেইহানে গাঁইড়া দেবো। তার উপর এট্টা সমাধি বানাবো। পাশে মন্দির, তুলসীতলা।

ভালা ভাবিচেন তো। তা কান্দেন ক্যান? আলো তো আলো হইয়াই থাকপেনে জমিন পালি।

কাইল নাতিনডারে মাটি দিয়া পড়াইতে যাই দুই নাম্বার ক্যাম্পে। দুইডা পড়ানো ছেলো। চান্দমাখা হাঁটাপথ। শালবনের মাথায় বাতাস বয়। জোচনা শালবনের মাথায় উইঠ্যা সাপের ফুণার নাহান নাচে। কিডা যেন বীণ বাজায় দূর-আকাশে। তাঁবুও কাঁপে বাতাসে। ট্যাপামাছের প্যাটের নাহান ফুইলা ওঠে। যেন মাজদরিয়ায় মাঝি পাল তুইলা দেচে। আর আমরা ব্যাবাকে ভাসতাচি। কোন কিনারে যাচ্চি তা বুঝি কেউ জানে না। চলতিচি তো চলতিচি। বাতাসের শব্দ কানে আয়, ঢেউইর শব্দ কানে আয়, জন্ম আর মিত্যুর শব্দ কানে আয়। আকাশের চান্দখানা থিকে তাঁবুর ভিতর যেন ভাত পড়ে, ফ্যান পড়ে। খিদের আগুনি পুড়া রিফুজিগো ড্যানাগুলান ন্যাড়া ডালের নাহান আসমানের পানে খাড়ায়ে ছেলো। কিন্তু চান্দের আলো বড়ই মিছা। তারে ছাইড়া যহন তাঁবুতি ঢুকলাম, দেহি যে শোকতাপ ভুইলা গিয়া চান্দের মিছা মায়ার ফান্দে পড়চে আলোর বাপ-মায়ে। শোকতাপ এহন আমাগো জেবনে বিলাসিতা, সেইডা জানি। কিন্তু তাই বলে কি কোনো শোকতাপ থাকপে না শরীলি? নাতিনডার রক্তডা এহনও ঠাণ্ডা হয় নাই, আর তগো রক্ত এরই মোদ্দি গরম হই গ্যাচে! মানুষ না পিচেশ তুরা? মন কচ্চিলো দুইডারে কুপায়ে মারি। পাল্লাম না। সময় আর কান্না আমারে সংযত হোতি শিখাইচে। লজ্জা পাইয়া আর থাকলাম না সেইহানে। বাইরে আইলাম। বাইরইয়া দেহি, আমাগো সেই নাওডা কোনো এক দ্বীপীর খোঁজে তরতর কইরা ছুইটা চলে খালি। পাল ফুইলা ওঠছে আরও। একমন আমারে জিগায় খালি, কোন দ্যাশে যাও গো মাঝি? আর-একমন উত্তর দেয়, তুমাগো কুনো দ্বীপ নাই, কুল নাই, পাড় নাই। এই নৌকোয় ভাসতি থায়ো আর ভাসতি-ই থায়ো। তারপর নাওখান ডুবলি-পর পাল্লি ভাইসা যাও কুনো এক অজানা-অচেনা দ্যাশের পাড়ে! মনডা কান্দলো খালি। অন্য মনডা হাসল। দুই চোখে দ্যাখলাম ধলা চান্দের খেলা। ছায়া আর মায়ার খেলা। মনরে কলাম, নেত্য, রাগ করিস ক্যান? কী বোজে ওরা শোকতাপের? ওঁরা চান্দের মিছা আলোর মায়াতেই পড়ুক খালি। কংসের জেলখানাতে কানাইয়ের জন্মডাও তো এইভাবেই হইচেলো একদিন। জেবনের এই কালাআন্ধারের মোদ্দি ফের যদি আলো আসে ফিইরা…!

আহা, আপনে যে সাক্ষাৎ নেত্যানন্দ, নেত্যদা!

কী যে কন আপনি! কই আনন্দ? আমার ব্যাবাক ফাজায় গ্যাচে। জেবন এহন এক-গলা আন্ধারে চুবানো। এক দীশাহীন জেবনতরী সরসর কইরা কুথায় যে ভাইসা যায় এই ঘোর আন্ধারে! আলো নাই আলো নাই, আলো নাই কুত্থাও!

চলেন, বনগাঁতে গিয়া আলোর এট্টা সমাধি বানাবেন। আপনার জেবনে আন্ধার ঘুচাইয়া আলো আসুক ফিইরা। এই ক’দিন এট্টু নজর রাখেন আলোরে। আমাগো এহনো ফিরতি-ফিরতি তা পিরায় পাঁচ-ছ’মাস।

আর নজর! আইজ আপনের এইহানে আসপার সুমায় কী মনে হইল, একবার নাতিনডার কাচে গ্যালাম। গ্যালাম আর আমার পরানডা ছ্যাঁৎ কইরা ওঠলো!

ক্যান? ছ্যাঁৎ ক্যান?

কী আর কবো, দা। দেহি কী, সুন্দর কইরা আলোর সমাধিটা খুঁচা রইচে।

কও কী? এর মোদ্দি? শিয়াল-কুকুরি না তো?

শিয়াল-কুকুরি খিদের চোটে মাটি খোঁচে। লোভে পইড়া খোঁচে না, নীরদদা!

কাইন্দো না…কাইন্দো না কই…

ক্যান কান্দবো, কন? কান্দি তো না, হাসি! হে হে! আমাগো হাসিডাই কান্দার নাহান লাগে খালি…!

আপনেও চান্দের আলোর নাহান মিছা হাসি দেচ্চেন কিন্তু, নেত্যদা?

আমারে ভুল বোজবেন না, দা। সত্যই কলাম। যাই, আইজ যাই। কাইল আসপানি। আসতি হবেনে।

আইচ্চা, ভালোয়-ভালোয় রওয়ানা দ্যান তালি। দশ মিনিটির আন্ধার পথ। ভূতপেরেত তে এট্টু সাবধান থাকপেন কলাম।

এই, এই জালের কাঠি আচে না কাচে! ভূত এরে দেইখাই খেঁচে পালাবেনে!

জালের কাঠি? এক্কেবারে ভূত তাড়ানোর খাঁটি ওষুদ হাতে নেচেন দেক্তিচি! তা, কই পাইলেন?

নাতিডার সমাধিতি মাটিচাপা-দে রাখচিলাম। চলা-দে দুই খুঁচা দিতিই দ্যাখলাম, যে কে সেইভাবে রইচে। খালি নাতিনডা নাই!

ভাইঙ্গা পড়লি হবেনে? সামলান এট্টু।

নাতিনডারে মাটি চাপা দিচিলাম আগের দিন। আইজ নাই! পেত্থমে পরান নাই, পরে লাশখানই নাই! কী আজব দুনিয়া। মানসে মানসেরে মারে, আবার মড়াডারে চুরিও করে!

কাঠিডারে মাটিচাপা-দে ভালা করচিলেন কলাম। নালি-পর সেইডাও চুরি যাইতো!

যাইতোই তো! কাঠিডারে পাইয়াই তুইলা আনলাম তাই। হাতের তালুতি রাখলাম। আর অমনি তালুতি জগতের ব্যাবাক আলো উইঠা আইল। আলো…আলো…আলো…দুই চোখে খালি আলো…ঘোর আন্ধারেও আলো… আমার আর ভয় কী, দা? নাতিন নাই, কাঠি তো আচে। জাল নাই, কাঠি আচে। দ্যাশ থিকে আসবার সুমায় ক’গাছা খ্যাপলা জাল নিয়াইচিলাম। এইখানে দামোদর আর অজয় দুই পাশ দিয়ে বইয়া গ্যাচে। তা আট-ন’মাইল দূর তো হবেনেই। তাই ঘন ঘন যায়োন হয় না। মাছও খায়োন হয় না। পইড়া-পইড়া জালডাই নষ্ট হইয়া গ্যালে। থাকলে পড়ে খালি তার কাঠিগুলান। তার-ই একখান আলোর তাগায় দিছিলাম। তাগাডা ফ্যানফ্যানে হই-আইচেলো। খুইলা গ্যালো। বউরে কলাম, পালটায় দ্যাও মা। কয়, তাগা কই? বিহানে বাজার দে এট্টু নে আসপেন, বা? কলাম, আনবানি। ‘আনবানি’ কথাডা কইচিলাম কলাম। কিন্তু বিহানের আগেই জাল ছিঁড়া জগতের ছায়ামায়ার বান্ধনডা কাইটা নাতিনডা উইড়া গ্যালে আকাশে। পাঁজরার পাখিডা এইভাবে উইড়া যাবে একদিন… ভাবি নাই, ভাবি নাই মনেএএএএএ…

‘পোষা পাখি উড়ে যাবে সজনীইইইইইইইইই…ও একদিন…ভাবি নাই মনেএএএএএএএএ…’ জাহাজগুলান ওড়ে না আর, সারে…কাইন্দো না নেত্যদা…কাইন্দো না…

হে হে…হাসি কলাম না এইডা…হে হে…! আর আপনে কী গাইলেন কন দিন! বুকির ব্যথা গলায় আইসা, জিবি আইসা জেবনের হাসিকান্দনগুলানরে জলের নাহান সহজ কইরা গ্যালো। সুরির কী মায়াজাল!

হ, মায়ার জাল।

জাল নাই, জাল নাই, দা। কাঠি আচে খালি…। নাতিনডাও নাই, খালি কাঠি আচে…। নাতিন নাই ক্যান? আচে! তার বাপ-মা-দাদু যহন আচে, তহন সে যাবে ক’নে? কাঠিডা মুঠির মোদ্দি থাকলিই অদৃশ্য মায়াজাল ঠিক দ্যাখা দেবেনে…! কবেনে, ওদ্দা, আমারে নে লৌকোয় যাবা না? ডাহাতির গল্পডা শুনাবা না? হে হে…এই দুনিয়ায় একজন বুড়া মানুষ বাইঁচা থায়ে নাতিপুতিগো কাচে তাগো জেবন-ইতিহাসডা কওয়োনের জন্যি। মুখি মুখি সেই জেবন-ইতিহাস বাঁইচা থায়ে। আর তাঁরাও বাঁইচা যায়, এক পোজন্ম থিকে আর-এক পোজন্মে। তাগো সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহার, পুজো-আচ্চনা বাইঁচা থায়ে। হাজার হাজার বচ্চর আমাগো ঠাউদ্দা-ঠাম্মা-দাদু-দেদমারা বাঁইচা থায়ে এইভাবেই। নদীর জলের নাহান কুলুকুলু কইরা বইয়া যায় মানসের এই জেবন-ইতিহাস…! তাতে চান্দ পড়ে…তাতে গোধূলির রাঙা সুজ্জ আইয়া পড়ে…

তাতে নাও বায়…

হ’। বায়। হেইয়ো রে হেইয়ো। ভাইসা যায় জেবনের নাওখানা খালি। কিন্তু কোন কিনারার খোঁজে? কোন দেব্‌তার? এই যেমন ভাইসা আইচি, ভাইসা যাচ্চি, কোনো কুল পাই নাই আইজও…। আইজও মাথায় চান্দ পড়ে…আইজও বাতাস দোলা দ্যায়, ঠ্যালা দেয়…। আইজও পাল ফুইলা-ফাঁইপা ওঠে…তরতর কইরা ভাইসা যায় সামনের দিকি…! কুল নাই কুল নাই…! চলি নীরদদা, আপনে খালি আমার শুকনা নদীখানে জল দিয়া যান…আর আমি ভাইসা যাই দূরি…আরো দূরি…কে জান্নে আর-এট্টু দূরি গেলি-ই আপন আলো পাই যদি…