গল্প

সিটিজেন্শিপ্ আইডেনটিটি ডিস্অর্ডার

রজত বিশ্বাস

‘হ্যা

লো ফেণ্ডন্ডস্! আমি নাইন্টি ফোর পয়েন্ট সিক্স এফ এম প্রচার তরঙ্গ থেকে সত্য প্রকাশ বলছি। গুড মর্নিং বন্ধুরা! আপনারা তো জানেন, আমি শুধুমাত্র নামেই সত্যপ্রকাশ নই। আসলে আমি সত্যগুলোকে, মানে নানা রকম জীবন-সত্য আর সামাজিক সত্যগুলোকে আপনাদের সামনে হাজির করি। আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করি। আর অবশ্যই আপনাদের কথাও শুনি। স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগের দিন সকালে আজ আমরা কথা বলব দেশভাগ আর উদ্বাস্তু জীবন নিয়ে।

হ্যাঁ বন্ধুরা! অবশ্যই আপনারাও কথা বলবেন। শোনাবেন আপনাদের অভিজ্ঞতার কথা  — অনুভবের কথা। কিংবা অন্যদের থেকে জানা বা শোনা অভিজ্ঞতার কথা। কী বন্ধুরা! মনে আছে তো আমার ফোন নাম্বার — এইট সেভেন, থিণ্ড ফোর, নাইন সিক্স, ফোর ফোর, টু ফোর। হ্যাঁ! আমি আপনাদের কথা শুনব — আপনাদের অভিজ্ঞতার কথা, স্মৃতিকথা, আত্মকথা। এবং অবশ্যই সে কথা হবে দেশভাগ ও উদ্বাস্তু জীবন বিষয়ে।

আসলে বন্ধুরা, গল্প শুধুমাত্র কথাশিল্পীরাই জানেন না! আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে-অন্তরে জমা থাকে কতই না গল্প। কতই না কাহিনি, আখ্যান। আর সে গল্প কিন্তু প্রথিতযশা লেখকদের গল্প থেকে কম কিছু নয়। তাই আজকের স্মৃতিকথনে আপনারাই প্রকৃত গল্পকার। আপনারাই কথক। আপনাদের কথায় কথায় না হয়  আজকের সকালে রচিত হোক এক অন্য ছকভাঙা আখ্যান। তাহলে বন্ধুরা আপনারা ফোন করতে থাকুন।  ফোন নম্বরটা আবার আপনাদের মনে করিয়ে দিই। এইট, সেফেন…

আর হ্যাঁ! আজ সকালের অতিথি বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত অধ্যাপক ড. মানব মিত্র। বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ বিষয়ে তাঁর মৌলিক গবেষণা আমাদের সাহিত্য-সংপ্তৃñতিকে নানামাত্রিকভাবে পুষ্ট করেছে। নমস্কার ড. মিত্র। স্যার, এই অনুষ্ঠানে আসার জন্য আমার গর্বিত, সম্মানিত। আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে এখানে উপস্থিত হওয়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা। আমরা ড. মিত্রের সঙ্গে কথা বলতে থাকব। আর তার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই আপনাদের ফোনের অপেক্ষায় থাকব। মনে রাখবেন, আপনারাই এই অনুষ্ঠানের চালিকাশক্তি। আপনাদের ফোনই এই অনুষ্ঠানকে সঠিক গতিপথ দেবে। তবে আজকের অনুষ্ঠান শুরু করছি আপনাদের অনুরোধের নয়, আমার পছন্দের গান দিয়ে। তবে অবশ্যই এ গান আপনাদের ভাল লাগবেই। গান শেষে হলেই আমরা চলে যাব স্যারের সঙ্গে আলোচনায়। আপনারা কিন্তু ফোনে আমাদের সঙ্গে সংযোগের চেষ্টা করতে থাকুন। শুনব আপনাদের কথা। স্যারকে আপনাদের কোনও প্রশ্ন থাকলেও জিজ্ঞাসা করতে পারেন। এখন শুনুন কবীর সুমনের কণ্ঠে —

‘বাংলার ধনুকের ছিলায় ছিলায় যত টান

তীরের ফলায় তবু বিষ নয় লালনের গান

সে গানে বিদ্ধ বুক রক্তে অশ্রু ছলছল

এ যদি আমার দেশ না হয় তো কার দেশ বল…’

দুই

বেতারের তার-ছেঁড়া তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়তে লাগল স্বরূপের শরীরের প্রতিটি কলা-কোশে — রক্তে, তন্ত্রীতে-তন্ত্রীতে। পড়াশুনোয় আর মন বাসাতে পারছে না স্বরূপ। এফ এম থেকে ছড়িয়ে পড়া কথাগুলো যেন তার সমস্ত মনটা অধিকার করে নিচ্ছে। এত ক্ষমতা ঐ যন্ত্রটার! মন চলে যাচ্ছে ঐ শধ আর সত্যে। সেই কবেকার অতীতে। সব তো মনে নেই স্বরূপের। স্বরূপ কী স্ব-রূপ দেখতে চাইছে! স্বরূপ কী যে একটা সত্যে আটকে পড়ে আছে। একটা বিশ্রী, বাজে মনখারাপ স্বরূপের সমস্ত সত্তা জুড়ে বিষাদের বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছি। আর.জে সত্যপ্রকাশ কী যেন একটা আটকে পড়া সত্যকে শধের মধ্য দিয়ে বমি করিয়ে নিতে চাইছে। কেমন যেন একটা গুমোট পেট থেকে গলা পর্যন্ত আটকে আছে স্বরূপের। কষ্ট আটকে আছে গলার কাছটাতে। বড্ড কান্না পাচ্ছে তার। অনেক কান্না। এক আকাশ মেঘ, ঘন কালো বজ্র বিদ্যুৎ  ও প্রবল বর্ষণবাহী কিউমুলোনিম্বাস আটকে আছে বুক জুড়ে। গুমড়ে থাকা কষ্ট! বলতে না পারার কষ্ট! স্বরূপ বিড়বিড়û করে বাববার বলতে থাকে — স্বরূপ বিশ্বাস, গ্রাম-পালপাড়া, পো-চন্দননগর, থানা-কৃষ্ণগঞ্জ, জেলা-নদিয়া। তারপর পিনকোড নাম্বারটা একমনে বলতে থাকে। নিজে নিজেই বলতে থাকে — না, না এই চন্দননগর হুগলির চন্দননগর নয়। মানে যেখানে জগদ্ধাত্রী পুজো হয়। জগদ্ধাত্রী পুজো তো এখন সব জায়গাতেই হয়। মানে যে চন্দননগর জগদ্ধাত্রী পুজোর জন্য বিখ্যাত — সেই চন্দননগর নয় এটা। আসলে চন্দননগর নামটা বলার পর কতবার যে স্বরূপকে শুনতে হয়েছে — ‘যেখানে জগদ্ধাত্রী পুজো হয়?’ কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, ট্রেনে, বাসে, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বারবার তাকে স্পষ্ট করে বলে দিতে হয়েছে, এই চন্দননগর নদিয়া জেলার চন্দননগর। কাউকে কাউকে তো বিস্তারিতভাবে বলতে হয়েছে — শিয়ালদা গেছে মেন লাইনের ট্রেনে আপনাকে মাঝদিয়া স্টেশনে নামতে হবে। তারপর কৃষ্ণনগরের দিকে যাওয়ার বাসে কৃষ্ণগঞ্জ, শিবনিবাস প্রভৃতি স্টপেজ ছাড়িয়ে নামতে হবে চন্দননগর মোড়। সেখান থেকে খানিকটা হেঁটে মিনিট দশেক মতো আমার বাড়ি। খুব বর্ধিষ্ণু গ্রাম। আমাদের গ্রামে জানেন তো অনেক পুরোনো একটা হাই স্কুল আছে। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত। কামাখ্যাচরণ নাগ নামের এক শিক্ষাবণ্ডতী এই প্তুñল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

স্বরূপ ভীষণভাবে ভাল থাকতে চায়। কতকিছুই তো সে ভুলে যেতে চেষ্টা করে। সবসময় সে পেরে ওঠে না। আজ সকালের অনুষ্ঠানটা যেন তার সত্তায় টান দিচ্ছে। কিছুতেই সে অন্যদিকে মন দিতে পারছে না। কোন এক অদৃশ্য চুম্বক তার সমস্ত মনটা টেনে রেখেছে। সেখান থেকে তার কোনও মতে মুক্তি নেই যেন। আধার আর ভোটার কার্ড বের করে স্বরূপ। ঠিকানাটা বারবার পড়তে থাকে। শেষে পিনকোডের সংখ্যায় গিয়ে আটকে পড়ে। এখানেই তো আসল ঠিকানাটা আটকে — সাত চার এক পাঁচ শূন্য নয়। এই সংখ্যাগুলোই সব। অন্য সব তথ্য না থাকলেও এই কোড নাম্বারেই সব খুঁজে পাওয়া যায়। সংখ্যাগুলোতেই আটকে আছে ঠিকানা। অদ্ভূত ব্যাপার! তার কোড নাম্বারের শেষ অঙ্ক দুটো শূন্য, নয়। সত্যিই কি শূন্য নয় — তার এই জীবন? নাগার্জুন, ‘মূল মাধ্যমিককারিকা’, ‘লঙ্কাবতারসূত্র’, নিহিলিজম্ (nihilism) এই শব্দ  ঘুরপাক খেতে থাকে স্বরূপের মাথার ভিতর। চন্দ্রকীর্তি কী যেন বলেছেন —

‘প্রতীত্যসমুৎপাদস্য যঃ অর্থঃ স এব

শূন্যতাশধস্য অর্থঃ।’

তিন

এতক্ষণ আমরা বারাসাত থেকে সুদীপ চক্রবর্তীর কথা শুনছিলাম। সুদীপবাবু তাঁর দাদুর কাছ থেকে শোনা দেশভাগের স্মৃতিকথা শোনাচ্ছিলেন। সত্যিই বড্ড মর্মস্পর্শী সেই অভিজ্ঞতা! হ্যাঁ স্যার, আপনির বাংলা সাহিত্যে উদ্বাস্তু জীবন প্রসঙ্গে রামায়ণের কথা কী যেন বলছিলেন! আসলে শ্রোতাবন্ধুদের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে গিয়ে আমাদেরকে অনেক সময় খেই হারিয়ে ফেলতে হয়। তবে স্যারকে যখন আমরা আজ পেয়েছি, যেভাবেই হোক ঠিক খেই খুঁজে নেব। খুঁজে নেব সূত্র। স্যারের কথা শোনার জন্য আমাদের শ্রোতা বন্ধুরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। হ্যাঁ স্যার — বলুন অনুগ্রহ করে…

—– আসলে আমি যেটা বলতে চাইছিলাম, দেশভাগ তো আমাদের একেবারে শিকড়ের সংকটকে বিশেষভাবে চিহ্নায়িত করে। যে কোনও ভাবেই জন্মভিটে থেকে উৎখাতই এই সংকট তথা বিপন্নতায় মূলীভূত। মানে আমি বলতে চাইছি, কৃত্তিবাস ওঝার আত্মবিবরণী থেকে আমরা জানতে পাচ্ছি,  কৃত্তিবাসের                      পূর্বপুরুষ পূ র্ববঙ্গ নিবাসী নরসিংহ ওঝা বেদানুজ রাজার পাত্র ছিলেন। ঐ বিশেষ অঞ্চলে মুসলমান আক্রমণ ঘটার কারণে তিনি ফুলিয়া গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন —

পূর্বেতে আছিল বেদানুজ মহারাজা।

তাহার পাত্র আছিল নরসিংহ ওঝা।।

বঙ্গদেশে প্রমাদ হইল সকলে অস্থির।

বঙ্গদেশ ছাড়ি ওঝা আইলা গঙ্গাতীর।।

সুখভোগ ইচ্ছায় বিহরে গঙ্গাকুলে।

বসতি করিতে স্থান খুঁজে খুঁজে চলে।।

এই যে খোঁজ, এই বিশেষ অন্বেষণের মধ্যেই তো লুকিয়ে থাকে নানাস্তরের নানামাত্রিক সংকট। সাতপুরুষের বাস্তভিটে ত্যাগ করার যন্ত্রণা এক তীবণ্ড বিপর্যয়ের সম্মুখীন করে ছিন্নমূল মানুষদেরকে।

—– হ্যাঁ স্যার। একটু আগেই আপনি অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’, ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘গড় শ্রীখণ্ড’ উপন্যাসের কথা বলছিলেন। বলছিলেন, বেশ স্বল্প পরিচিত গল্পের কথাও জানাবেন। আসলে স্বল্পপঠিত গল্পগুলির সন্ধান পেলে আমাদের আগ্রহী শ্রোতাবন্ধুরা খুশি হবেন। আর আপনার মতো প্রথিতযশা অধ্যাপককে যখন আজকের অনুষ্ঠানে পেয়েছি …

—– স্বল্প-পঠিত কিছু গল্পের কথা জানাচ্ছি। তার আগে আমি অমিয়ভূষণের ‘গড় শ্রীখণ্ড’ উপন্যাস থেকে একটা কথোপকথনের অংশবিশেষ শোনাব। আসলে বারবার খেই হারিয়ে যাচ্ছে। ঐ যে একটু আগে বলছিলাম না, প্রথম দিকে দেশভাগের বিষয়টি মানুষ কিন্তু তেমন সিরিয়াসলি বুঝতে পারেননি। মানে উপলব্ধি করতে পারেননি। আমি যে কথাটা বলছিলাম, তারই প্রমাণ হিসাবে কয়েকটি মাত্র সংলাপ একটু পড়ছি —

শুনছেন মণ্ডল — দেশভাগ হতিছে।

‘সে আবার কি?’

‘হ্যাঁ, একভাগ হি¥দুর, আর একভাগ মোসলমানের।’

‘ভাগ কে করে? ইংরেজ? তার নিজের জন্য কি রাখবি?’

এরপর আমরা দেখতে পাচ্ছি সম্পন্ন চাষী রামচন্দ্র হো হো করে হেসে ওঠেন। অর্থাৎ শুরুতে তাঁরা সমস্যা তথা সংকটের তীবণ্ডতা সেইভাবে অনুধাবন করতে পারেননি। অনুধাবন করেছেন পরে।

—- আচ্ছা স্যার, আমরা কিন্তু অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। দেশভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে লেখা দু-একটি আপনার পছন্দের উপন্যাসের কথা প্লিজ যদি জানান। মানে যেগুলি একটু স্বল্প-পঠিত — তাহলে আমাদের আগ্রহী শ্রোতাবন্ধুরা নতুন পাঠের উপকরণ পাবেন।

—- দেশভাগকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে বাংলায় প্রচুর সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। বেশ কিছু লেখা, ব্যক্তিগতভাবে আমার অত্যন্ত প্রিয়। যেমন, নারায়ণ সান্যালের ‘বল্মীক’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্বপশ্চিম’। আমার বেশ অন্যরকম একটা ভাললাগা আছে জীবনানন্দের ‘জলপাইহাটি’ এবং ‘বাসমতীর উপাখ্যান’ উপন্যাস দুটি। তারাশঙ্করের ‘ঝড় ও ঝরাপাতা’ উপন্যাসটির কথা তেমনভাবে অ্যাকাডেমিক ফিল্ডে বলা বা উল্লেখ করা হয় না। দিনলিপি লেখার ভঙ্গিতে এই বিশেষ প্রেক্ষিতে লেখা এই উপন্যাসটি আমার কিন্তু বেশ ভাল লাগে।

—– স্যার কিছু গল্পের কথা যদি বলেন, প্লিজ…

—- অসাধারণ সব গল্প লেখা হয়েছে দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতার দাঙ্গা ও আমি’।  সাম্প্রদায়িক হানাহানির প্রেক্ষাপটে লেখা চমৎকার গল্প। আখ্যানের মধ্যে লেখক দেশে যাওয়ার পথে ট্রেনের মধ্যে যাত্রীদের আতঙ্কগ্রস্ত মনের বীভৎসতা ফুটিয়ে তুলেছেন। ধনী, দরিদ্র, হিন্দু, মুসলমান সকলেই সমানভাবে শঙ্কিত। প্রসঙ্গক্রমে অবশ্যই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা আসে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পে আমরা দেখতে পাই, তিনি যেমন দাঙ্গার বীভৎসতা ও মনুষত্বহীনতার ছবি এঁকেছেন, তেমনই উত্তরণ তথা প্রতিকারের বাণীও গল্পের আধারে শুনিয়ে দিয়েছেন। তাঁর ‘স্থানে ও স্তানে’, ‘খতিয়ান’, ‘ছেলেমানুষি’, প্রভৃতি গল্পগুলি পড়লে, আমার বক্তব্যের সমর্থন মিলবে। দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতা, দাঙ্গা, উদ্বাস্তু সমস্যার কথা যে বাংলা সাহিত্য কতভাবে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে এসেছে, তার ইয়ত্তা নেই। বাংলা কথাসাহিত্যে মনোজ বসু খুব বেশি পরিচিত নাম নয়। তাঁর লেখা ‘ঘড়িচুড়ি’ নামে একটি গল্প আছে। ‘খদ্যোত’ নামের মনোজ বসুর একটা গল্পগ্রন্তi হাতে এসেছিল —- সেখানেই এই গল্পটা…

চার

আপনি আর কী গল্প শোনাবেন স্যার! আপনার এইসব গল্পের রেফারেন্স তো কতই শুনেছি আপনার ক্লাসে। আপনি তো যা-ই পড়াতে যেতেন ক্লাসে, ঘুরে ফিরে সেই ‘পার্টিশন্ লিটেরেচার’। আর ‘পার্টিশন লিটেরেচার’ কথাটা যে কতবার বলতেন। এই ইংরেজি শধদুটো পাশাপাশি একসঙ্গে আপনার মুখেই প্রথম শুনছিলাম। আপনি জানেন কিনা জানি না, আমাদের বন্ধুরা আপনার নাম দিয়েছেন ‘পার্টিশন’। কারণ মধ্যযুগ, সাহিত্যতত্ত´, সাহিত্যের ইতিহাস, এমনকী রবীন্দ্রনাথের কবিতা, যার মধ্যে কোনওভাবেই দেশভাগ নেই — আপনি ঠিক কোথা থেকে পার্টিশন লিটেরেচার নিয়ে চলে আসতেন। আপনার ক্লাস থাকলেই ছেলেমেয়েরা কী বলত জানেন? ‘এইবার পার্টিশনের ক্লাস’। তারপর একটা অট্টহাসির রোল। মনে আছে, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পড়াতে গিয়ে আপনি সমস্ত সেমেস্টার জুড়ে কৃত্তিবাস ওঝার পূর্বপুরুষের দেশত্যাগের কারণ, কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তীর কাব্যে বর্ণিত দেশত্যাগী কবির উদ্বাস্তু জীবনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা, মনসামঙ্গল কাব্যের কবি কেতকাদস ক্ষেমানন্দের পিতা কেন নিজের গ্রাম হুগলীর কাঁথড়া ত্যাগ করলেন, শিবায়নের কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য কীভাবে রাজশক্তির অত্যাচারে উদ্বাস্তু হলেন — এইসব নিয়েই পড়ে রইলেন। সমস্ত সেমেস্টারে আপনি যা পড়ালেন তা অবশ্যই বাংলাসাহিত্যের মধ্যযুগের ইতিহাস হল না — যা হল, তা হচ্ছে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে গৃহছাড়াদের কথা!

ঘর, বাড়ি, গৃহ… বাস্তুভিটে … শিকড় — এইসব আজ আবার যে আমার মধ্যে চেপে বসেছে। অসহ্য লাগছে। কে আমি? আমি কোন ঠিকানা নিয়ে বেঁচে আছি। আজ সকাল থেকেই এইসব কথা আমাকে আবার জ্বালানো শুরু করেছে।  আমি পুড়ে যাচ্ছি। ভেতরটা খানখান হয়ে যাচ্ছে। আমি যা ভুলতে চাই, সেগুলোই যেন চেপে চেপে বসে চারপাশ থেকে। এ যেন আমার নিয়তি।

সকালে কেন যে অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘নির্বাস’ উপন্যাসটা নিয়ে বসলাম! নেটের নতুন সিলেবাসে দিয়েছে। তাই না পড়েও উপায় নেই। এত টাকা খরচ করে বি এড করলাম। এস এস সি হচ্ছে না। নেট পরীক্ষাটা তো দেওয়া দরকার। আগের সেশনে বলে দেওয়ার পর, আমি আর ইচ্ছে করে কখনই এমন কোনও গল্প-উপন্যাস বা বই পড়ি না যেখানে দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তু সমস্যা এসব আছে। আমি তো তখন জানতাম না ‘নির্বাস’-এর বিমলপ্রভা বা বিমলা রাজনীতির শিকার হয়ে স্বভূমি ছেড়ে কুহকিনী স্থিতির সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই উপন্যাসে। পড়াশুনো তো করতে হবে। এমনিতেই এখন আর মনঃসংযোগ করতে পারি না। এত ওষুধ চলছে। সকালে ‘নির্বাস’ পড়তে পড়তেই আমি মনখারাপে ডুবে যাচ্ছিলাম। আগের সেশনে বলে দেওয়া কাউন্সেলিং-এর কোনও কথাই কাজে আসছিল না! কে যেন একটু একটু করে মনখারাপের ফোঁটা ইন্জেক্শনের সিরিঞ্জের মধ্য দিয়ে আমার শরীরে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল। ‘নির্বাস’ পড়তে পড়তেই আমি আমার অন্তর্গত ‘অবসেশনে’ ডুবে যাচ্ছিলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকা সবসময়ের সাথী ঐ বিশেষ অবসেসিভ (ঞ্জত্নন্তত্রন্তন্তiডত্রূ ভাবনার চক্করে পড়ে যাচ্ছি আমি। একটা অদ্ভূত কম্পাল্শান —– কোনওভাবেই মুক্ত হতে না পারা বাধ্যবাধকতা আমাকে গ্রাস করে নিচ্ছিল। ভয়ংকরভাবে জবরদস্তি করছিল ঐসব ‘অবসেসিভ থট্’। নিজের অজান্তেই যেন আমি বই-এর স্তূপ থেকে টেনে বের করছিলাম আমেরিকান ঔপন্যাসিক জন স্টেইনবেকের (John Steinbeck)’ দ্যা গ্রেভস অফ র‍্যাথ'(The Graves of Wrath । প্রাকৃতিক কারণে উদ্বাস্তু হওয়া এক, আর রাজনীতির অমানবিক অবিবেকী সিদ্ধান্তে উদ্বাস্তু হওয়া তো এক নয়! Erich Maria Remargue -এর লেখা উপন্যাস ‘The Night in Libson -এ হাত বুলিয়ে আমি টেনে নিচ্ছিলাম ভারবি থেকে প্রকাশিত কলেজ স্ট্রিটের  পুটপাথে পুবোনো বই-এর স্তূপের মধ্য থেকে কেনা ‘মনীন্দ্র রায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা’। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎই পেয়ে গিয়েছিলাম বইটি। খুব কম দামে দিয়েছিল দোকানদার। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত বই। পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে ষাট পৃষ্ঠাতে গিয়ে থেমে যাই —

… সেই বাড়ি

এতোটুকু হতে যারে চিনি

আর সেই ঘর পূবদুয়ারী

সিদুরে আমের সেই চারা

সবই আজ পরের অধীন…

চোখ ছলছল করে ওঠে স্বরূপের। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফরিদপুরের টেপাখোলা অঞ্চলের সেই হরিসভা। রাধাকৃষ্ণের মূর্তি। যেন পূর্বজন্মের স্মৃতি। দাদু জগমোহন ভট্টাচার্যের সঙ্গে কতবারই না গেছে সেখানে। মাঝে মাঝে জগমোহন ভট্টাচার্য সকালেই তাকে নিয়ে গেছে সেখানে। দাদুর কণ্ঠে সকালের সেই শান্ত, নম্র কণ্ঠের উচ্চারণ—

ওঁ উত্তিষ্ঠ তিষ্ঠ গোবিন্দ

উত্তিষ্ঠ গরুড়ধ্বজ

উত্তিষ্ঠ শ্রীরাধাকান্ত

ত্রিজগন্ময় মঙ্গল কুরু।

তারপর শুরু হত মঙ্গলারতি। ছোট্ট অরূপকে সবাই ডাকত ছোটো ভট্চায্।

পাঁচ

১৯৯২ সাল।

ভারতের বাবরী মসজিদ ইসু্যকে মূলধন করে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর মৌলবাদী ইসলামী মনোভাবসম্পন্ন মুসলিমদের ধারাবাহিক অত্যাচার ও নিপীড়ন চলতে থাকে। বহু হিন্দুদের বাড়িঘর লুট করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ভেঙে দেওয়া হয় হরিসভা — রাধাকৃষ্ণের মূর্তি। পুরোহিত ভট্চায্ পরিবার এপার বাংলায় পালিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। লুটপাটের ভয়ে ভট্চায্ পরিবার সোনাদানা যা কিছু ছিল, একটু দূরে তাদের পারিবারিক বন্ধু ইবণ্ডাহিমের কাছে রেখে এসেছিল। নিজেরা গুছিয়ে আসার আগে ছোট্ট অরূপকে পাশের বাড়ির একজনের সঙ্গে, ১৯৭১-এ এপার বাংলার নদিয়ায় চলে আসা মাসতুতো বোনের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল জগমোহন ভট্টাচার্যের একমাত্র ছেলে সুধীর। ভট্চায্ পরিবারের আর এপার বাংলায় আসা হয়নি। তাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। এপার বাংলায় আসার আগের রাতেই ঘুমন্ত অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিজের বাড়িতে মৃতু্য হয় তাদের। আর যা-ই হোক, তাদের আর উদ্বাস্তু হতে হয়নি। দিন পনেরোর মধ্যেই ভট্চায্ পরিবারের করুণ পরিণতির কথা নদিয়ার চন্দননগরে এসে পৌঁছায়। ছোট্ট অরূপের উপর অত্যাচার চালাতে থাকে তার বাবার মাসতুতো বোন। অরূপ তাদের কাছে একটা উটকো ঝামেলা ছাড়া আর কী! তাদের পাশের বাড়ির নিঃসন্তান নরোত্তম বিশ্বাস অরূপের দায়িত্ব নিতে চায়। পার্টির নেতাদের ঘুষ দিয়ে অরূপ ভট্টাচার্য হয়ে যায় স্বরূপ বিশ্বাস। বার্থ সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে আধার, ভোটার আই কার্ড সব জায়গাতেই স্বরূপ বিশ্বাস। স্বরূপ বিশ্বাস এস সি — মানে সিডিউল কাস্ট। কারণ তার বাবা নরোত্তম বিশ্বাস এস সি — নমঃশুদ্র। স্বরূপের কাস্ট সার্টিফিকেটও আছে। স্বরূপ পড়াশোনায়ও ভাল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম এ করেছে। নরোত্তম তাকে কষ্ট করে বি এডও পড়িয়েছে। আরেকটা কথা, অনেক কষ্টে ঠিকানা খুঁজে ইবণ্ডাহিম কিন্তু ভট্চায্ পরিবারের গচ্ছিত গয়না ২০০০ সালে স্বরূপের হাতে তুলে দিয়ে গেছে। বেসরকারী কলেজে বি এড পড়তে সেই গয়না বিক্রির টাকা বেশ কিছুটা কাজেও লেগেছে।

ছয়

—– হ্যালো ফেণ্ডন্ডস্। আমি নাইন্টি ফোর পয়েন্ট সিক্স এফ.এম. প্রচার তরঙ্গ থেকে সত্যপ্রকাশ বলছি। আজ আমার অতিথি দুজন — বিখ্যাত সাইক্রিয়াটিস্ট ডা. অনির্বাণ মজুমদার এবং স্বনামধন্য সাইকোলাজিস্ট কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. নীলাঞ্জন চক্রবর্তী। আপনারা ফোন করতে থাকুন… মন খুলে কথা বলুন…

—– হ্যাঁ, ডাক্তারবাবু, আপনি ডিপ্রেশন বা অবসাদের কারণ নিয়ে আলোচনা করছিলেন। বেশ কিছু কারণ আপনি বলেছেন। আর সামাজিক রাজনৈতিক নানা প্রেক্ষিতের কথা বলতে যাচ্ছিলেন, একটা ফোন নেওয়ার জন্য কথার খেই হারিয়ে গেল। আপনি নাম উল্লেখ না করে বিশেষ একজনের সমস্যার কথা বলছিলেন।

—– আর একজনের কথা বলি। আমার কাছে অবসাদের চিকিৎসার জন্য আসে। কথা বলে বুঝলাম — ওর সমস্যা নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আইডেনটিটির সমস্যা। অত্যন্ত সেনসিটিভ ছেলেটি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলায় এম.এ.। বাবা-মা দাঙ্গায় মারা গেছে। এ দেশে অন্য একটা পরিবারে অফিসিয়ালি তাদের সন্তান হিসাবে মানুষ হয়েছে। কিন্তু স্বদেশ আর নাগরিকত্বসত্তার বিভ্রান্তি তাকে সবসময় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। আমি ড. চক্রবর্তীর কাছে সাইকোথেরাপির জন্য পাঠিয়েছি ওকে। গত পাঁচ-ছ মাস ধরে সেশন্ চলছে। আর ওষুধ তো চলছেই।

—– ড. চক্রবর্তী, আপনি তখন কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, একটা ফোন আসায় আপনার কথা শোনা হয়নি। এখন যদি বলেন… আপনার কথা দিয়েই আজ অনুষ্ঠান শেষ করব।

— তখন ঠিক কী বলতে বলতে চাইছিলাম, সেকথা এখন আর মনে নেই। তবে ডা. অনির্বান মজুমদার যে পেশেন্টের কথা বললেন, সে তো বটেই, আরও বেশ কিছু পেশেন্ট ইদানিং আমার কাছে আসছে, যাদের সমস্যা একই ধরনের। সমস্যা মূলত নাগরিকত্ব- কেন্দ্রিক। একটা ভয়, অসহায়তা, হতাশা, আতঙ্ক এমনভাবে গ্রাস করেছে… জানি না, অদূর ভবিষ্যতে Citizenship Identity Disorder‘ নামে কোনো মানসিক রোগের নাম DSM-এ যুক্ত হবে কিনা! আর যদি তা হয়, এর জন্য দায়ী থাকবে…