সাক্ষাৎকার

মনোরঞ্জন ব্যাপারী কথা বললেন কবিতা আশ্রমের সঙ্গে

 

এইসব এন আর সি আসলে সস্তার মজুর বানানোর কর্পোরেট চক্রান্ত মনোরঞ্জন ব্যাপারী

মনোরঞ্জন ব্যাপারী আজ বাংলায় এক আলোচিত লেখোয়াড়  তাঁর উদ্‌বাস্তু পরিবারের সঙ্গে বিভক্ত ভারতের মাটিতে প্রবেশ, দণ্ডকারণ্যে অমানুষিক অত্যাচারের মুখোমুখি হয়ে রুখে দাঁড়ানোর লড়াই থেকে মানুষের মুক্তির উদ্দেশ্যে অতিবামপন্থী রাজনীতিতে প্রবেশ, কারাগারের বিস্তির্ণ উঠোনে বসে অক্ষরজ্ঞান শিক্ষা ও লেখা নিয়ে এতপথ পেরিয়ে আসার ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন। তাঁর জিজীবিষার গল্পের মুখোমুখি কবিতা আশ্রমের প্রতিনিধি অমিতকুমার বিশ্বাস ও তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়।

কবিতা আশ্রম: মনোরঞ্জনদা, আমরা যতদূর জানি শরণার্থী হয়েই আপনি ও আপনার পরিবার এসেছিলেন এই দেশে। ছিলেন দণ্ডকারণ্যে। দণ্ডকারণ্যের সেই অভিজ্ঞতা যদি কিছু বলেন আমাদের।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: ১৯৫৬ সালে দণ্ডকারণ্য প্রোজেক্ট চালু হয়। এই প্রোজেক্ট চালু হওয়ার পেছনে ছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের পুনর্বাসন দেওয়া। এই হতভাগ্য শরণার্থীদের প্রতি খুব দয়া-দরদ দেখানো মানুষের সংখ্যা এদেশে কিন্তু একেবারে কম ছিল না। দণ্ডকারণ্যে যেসব আদিবাসীরা ছিলেন, আমি তাঁদের কথা আমার ‘ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন’-এ লিখেছি। শৃঙ্খলাবদ্ধ শ্রমিক যারা, মানে টানা আট ঘণ্টা যারা কাজ করতে পারে, সেই নিয়মের মধ্যে তারা থাকতে চায় না। ফলে ওই আদিবাসীদের দিয়ে কোনওরকম উৎপাদনমূলক কাজ করানো বেশ কঠিন। এদিকে দণ্ডকারণ্যের যে প্রোজেক্ট, উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা, সেটা ব্যাপক হারে শুরু করার জন্য মজুর কম পড়ে গিয়েছিল। ফলে ওই শরণার্থীদের ওখানে পাঠানোয় শ্রমিকদের চাহিদা ব্যাপক ভাবে মিটে যায়, এবং তা যথেষ্ট কম মজুরিতেও বটে। এটাই ছিল শরণার্থীদের ওখানে পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য। ওখানের জঙ্গলে আছে শাল, সেগুন, মহুয়া, বাঁশ। অন্ধ্রপ্রদেশে কাগজনগর নামে একটা জায়গা আছে। সেখানে আছে কাগজ তৈরির কারখানা। জঙ্গলের এই বাঁশ যদি সময়মতো কাঁচামাল হিসেবে না-পৌঁছায়, তাহলে ওই কাগজকলগুলো চলবে কীকরে? পূর্ববাংলার এই শরণার্থী-মজুরগুলো সেখানে যাবার ফলে সেই শৃঙ্খলাবদ্ধ শ্রমিক-সমস্যা অতিসহজে মিটে গেল। আবার, ওখানকার মাটির নীচে লোহা-তামা ইত্যাদি খনিজপদার্থ আছে। এগুলো উৎখননের জন্য প্রচুর মজুর দরকার, এবং সস্তায়। এখানেও ওইসব শরণার্থীদের কাজে লাগানো গেল। সরকারের পক্ষ থেকে এই শরণার্থীদের প্রতি মাসে যে পরিমাণ সহায়তা বা ‘ডোল’ দেওয়া হত, তাতে তাদের পনেরো দিনের বেশি চলত না। ফলে বাকি পনেরোদিন ছেলেপুলে নিয়ে খেয়ে বেঁচে থাকতে হলে তারা কী করবে? তখন নিরুপায় হয়ে তাদের ওইসব কারখানার কিংবা খনির সস্তার শ্রমিক হয়ে যেতে হত। যখন দণ্ডকারণ্যে ছিলাম, আমিও তো নিয়মিত ওই শ্রমিকের কাজে গেছি। কঠোর পরিশ্রম করার পরও দু-টাকার বেশি মজুরি পেতাম না। এই স্বল্পমজুরিতে মজুর পাওয়া জন্যই ওরা দণ্ডকারণ্য-প্রোজেক্টের উপর বেশি করে জোর দিয়েছিল। বিড়ির পাতা, যেটা থেকে মালিকের সবচেয়ে বেশি মুনাফা আসে, কোটি কোটি টাকা আসে, সেটার জন্য ওরা এই মানুষগুলোকে কাজে লাগাতে পারত। এই দণ্ডকারণ্যে পানীয় জল নেই, স্বাস্থ্যের কোনও সুব্যবস্থা নেই। মানে স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য যে নূন্যতম ব্যবস্থা, তা সেখানে একেবারেই ছিল না। আর যেটা সবচেয়ে বেশি সমস্যার, তা হল ওখানকার ভাষা ও সংস্কৃতি। ওখানকার রোদ এতই কড়া যে, পুর্ববাংলার মানুষগুলো গরমে টিকতেই পারত না। আসলে আমরা তো নরম আবহাওয়ার, জলা-অঞ্চলের মানুষ। বাংলাদেশে নদীনালা, চারদিকেই জল। সেই মানুষগুলো গরমে সেখানে টিকতেই পারত না। অসম্ভব শরীর খারাপ হত, বিশেষকরে গরমকালে। এসব-ই ‘ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন’-এ আছে। ফলে ওখানে শরণার্থীরা এই কষ্টকর জীবন সহ্য করতে না-পেরে পালিয়ে এসেছিল সুন্দরবনের মরিচঝাঁপি দ্বীপে। মরিচঝাঁপিতে তারা যে হঠাৎ করে চলে এসেছিল তা কিন্তু নয়…

কবিতা আশ্রম: আপনিও কি চলে এসেছিলেন মরিচঝাঁপি?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: আমার বাবা এসেছিলেন। আমি তার আগে ওখান থেকে চলে এসেছিলাম কলকাতায়। আমার বাবা-ভাই দণ্ডকারণ্যেই থাকতেন। আমার মাথায় ছিল, আমি পালিয়ে এসে কলকাতা বা গ্রামবাংলার কোথাও একটা থাকার জায়গা বানাতে পারলে তাদের সেখানে নিয়ে আসব। কিন্তু সেই আশ্রয় আমি বানাতে পারিনি। তাই তাঁরা ওখানেই থেকে যান। দণ্ডকারণ্যে প্রথম-প্রথম যারা কমিউনিস্ট পার্টির লোক ছিল, তারা ফরোয়ার্ড ব্লক করত। পরে সেখানে তারা ইউসিআরসি বলে একটা সংগঠন তৈরি করেছিল শরণার্থীদের নিয়েই। সেই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির ওনেক বড়-বড় নেতা ছিলেন। কিন্তু জনগণ তাদের সঙ্গে অতটা ছিল না। মিছিল তারা করতে পারত না। আন্দোলন তারা করতে পারত না। বড়-বড় প্রবন্ধ লিখত পত্রিকায়। ছোট-ছোট হলের মধ্যে বড়-বড় সেমিনার করত। ভাষণ দিত। কিন্তু এই শরণার্থী মানুষগুলোকে পেয়ে যাওয়ায় ওরা বলল যে, তোমরা কেউ দণ্ডকারণ্যে যেও না। আমরা বাংলাতে তোমাদের পুনর্বাসন দেব। তোমরা আমাদের সঙ্গে থাকো। আমাদের মিছিলে হাঁটো। আমাদের কথা শোনো। এইভাবে বহু শরণার্থী ওই মানুষদের কথা শুনে দণ্ডকারণ্যে ফিরে যেতে রাজি হয়নি। তো, ওরা শরণার্থীদের নিয়ে মিছিল-টিছিল করেছিল। পরে তো সরকার এদের কোনও দাবি মানল না। তখন তারা ওই সিপিএম পার্টি বা ফরোয়ার্ড ব্লক ছেড়ে দিল। মর এবার, যা পারিস কর পার্টির ভাবটাই যেন এমন। তারপর শরণার্থীরা আবার দণ্ডকারণ্যে ফিরে যেতে শুরু করল। এই সিপিএম পার্টির লোকেরা যারা ছিল, আমি পার্টির নামে নিন্দা করতে চাইছি না, কিন্তু সত্যটাই বলতে চাইছি, তারা দলে দলে কিন্তু দণ্ডকারণ্যে যেত বিভিন্ন সময়ে। ওখানে গিয়ে নির্বাচনে ক্যান্ডিডেটদের দাঁড় করাত। তারা বলত, আমরা যদি কোনওদিন বাংলায় ভোটে জিতি, তাহলে তোমাদের বাংলায় পুনর্বাসন দেব। মানুষ তাদের কথা বিশ্বাস করত। তারপর, যখন সত্যি সত্যি একদিন ওরা ক্ষমতায় এসে গেল, (আসলে পার্টির লোকেরা কোনওদিন ভাবেনি যে, ওরা কোনওদিন ক্ষমতায় আসতে পারবে, তাই শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাবে ভোট পাওয়ার জন্য হয়তো ভেবেছিল এমনটা), শরণার্থীদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, পূর্বপ্রতিশ্রুতি রাখল না। সেই সময়ের ইতিহাস যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে এই সত্যটুকু উঠে আসবেই। জনতাদলের সঙ্গে জোট করার সময় ওরা যতগুলো সিট জনতাদলের কাছে চেয়েছিল, তা যদি দিয়ে দিত, তাহলে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে জনতাদল-ই আসত, ওরা আসত না। কিন্তু জনতাদল সেই সিট দিল না। নিজেরা নিজেদের ক্যান্ডিডেট দাঁড় করাল। জনতাদল ভোটে হেরে গেল। ফলে শরণার্থীরা মনে মনে এটাই বিশ্বাস করতে শুরু করল, আমাদের বন্ধু সরকার-ই তো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আছে। এখন আমরা যদি এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে যাই, তাহলে ওরা আমাদের পুনর্বাসন দেবে। রাম চ্যাটার্জী মাঝে-মাঝেই দণ্ডকারণ্যে যেত, উসকানি দিত। আরও সব নেতারা মাঝে-মাঝেই সেখানে উসকানি দিতে যেত কৃপাসিন্ধু সাহা, অশোক ঘোষ। “আপনারা যদি বাংলায় ফিরে যান, তাহলে বাংলার পাঁচকোটি মানুষ দশ কোটি হাত নিয়ে আপনাদের স্বাগত জানাবে…” এইসব বলত। তো দণ্ডকারোণ্যের শরণার্থীরা ওদের কথায় বিশ্বাস করে চলে এল। তারপরে মরিচঝাঁপিতে যে ভয়ঙ্কর, মানে শতাব্দীর সবথেকে নিকৃষ্টতম ঘটনা সিপিএম সরকার ঘটাল…তা তো আপনারা সকলেই জানেন…আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে মারা হল, যারা পালাল তাদের খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে…পুলিশ-পার্টিক্যাডার সকলে মিলে…

কবিতা আশ্রত: আপনি কি কখনও মরিচঝাঁপিতে বাপ-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: না। আমি কখনও যাইনি। আমার বাবা মরিচঝাঁপিতে গিয়েছিলেন, থেকেছেন সে-কথা বলেছি। আমি বেশ আগেই দণ্ডকারণ্য ছেড়ে কলকাতা চলে এসেছিলাম। তখন আমি যাদবপুর স্টেশনে, ওই যাদবপুর স্টেশনকে কেন্দ্র করে আশপাশের বস্তি, ফুটপাত যেখানে যেমন মাথা গোঁজার সুযোগ পেতাম, শুয়ে পড়তাম। কোথায় যে কখন থাকতাম, তার তো কোনও ঠিক-ঠিকানা ছিল না। কখনও আবার কোনও-এক মুলিবাঁশের গাদায়, কখনও কাঠগোলায় রাত কাটাতাম। কারণ একদিকে পুলিশ আমাকে যেমন তাড়া করত, ঠিক তেমনই আমার অ্যান্টি-পার্টি আমাকে রোজ খুঁজে বেড়াত। ফলে রাতে একটুখানি ঘুমোনোর জন্য আমাকে এদিক-ওদিক পালিয়ে-পালিয়ে বেড়াতে হত। এমনকী দিনের আলোতেও চলত এই পালিয়ে বেড়ানোর খেলা। এসব ‘ইতিবৃত্তে…’ আছে। ওখান থেকে সম্ভব হলে একটু পড়ে নেবেন। আমার মেজভাই এখানে আমাকে খুঁজতে এসেছিল। কিন্তু পায়নি। আর আমি আদৌ জানতাম না, তারা মরিচঝাঁপিতে এসেছেন। তারপর যখন জানতে পারলাম দণ্ডকারণ্য থেকে প্রচুর লোক মরিচঝাঁপিতে এসেছে, আমার মনে হয়েছিল হয়তো ওঁরাও এসেছেন। আমার ওখানে একবার যাওয়া দরকার, ওঁদেরকে খোঁজা দরকার। কিন্তু ততদিনে মরিচঝাঁপিতে ব্যারিকেড হয়ে গেছে। ওখানে আর ঢোকবার কোনও উপায় ছিল না। ফলে তারা দণ্ডকারণ্য থেকে এলেন, ভাগ্য আর পার্টির মার খেয়ে ফিরেও গেলেন। আমি তার কিছুই জানতে পারলাম না।

কবিতা আশ্রম: ফিরে গেল মানে? কোথায় গেলেন? দণ্ডকারণ্যে?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: হ্যাঁ, আবার তাদের দণ্ডকারণ্যে ফিরিয়ে দেওয়া হল। মেরেধরে, গরু-ঘোড়ার গাড়িতে গাদা মেরে, আর তাদের লাশ… বহু লোক মারা গিয়েছিল…বহু লোক! কত তার ঠিক-ঠিকানা নেই…। মজা হল এটাই, যখন ওখান থেকে লোক আসছিল, তখন তো কোনও রেকর্ড ছিল না যে ঠিক কত লোক আসছে। এক-একটা গাড়িতে গাদা মেরে লোক এসেছে। যখন এখান থেকে পালাল, তখনও ওইরকম…। তো ঠিক কত লোক যে মারা গিয়েছিল, তার কোনও রেকর্ড নেই। ফলে এরা বলে পার পাচ্ছে। কেউ বলছে আটজন মরেছে, কেউ বলছে দশজন, কেউ-বা বলছে একুশজন! যার যা খুশি বলে যাচ্ছে। কিন্তু দণ্ডকারণ্যের লোকেদের মুখে আমি যা শুনেছি, তাতে অতি কম করেও সংখ্যাটা দু-হাজার হবেই। এমনকী দৈনিক স্টেটসম্যানের একটা লেখায় পড়েছি, কেউ একটা চিঠি লিখেছিল সেখানে, তাতে বলেছিল, চারহাজার সাতশো আঠাশজন মানুষ মারা গিয়েছিল মরিচঝাঁপিতে, এছাড়া বারোশোর উপরে মহিলা ধর্ষিতা হয়েছিল।

কবিতা আশ্রম: আপনি দণ্ডকারণ্য থেকে কলকাতায় এলেন কার সঙ্গে?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: একা। একাই এলাম। কারণ কলকাতা তো আমার চেনা ছিল। ছোটবেলায় আমরা যখন ঘোলাদোলতলা থেকে এখানে এলাম, বাবা তখন যাদপুর এলাকায় আমাদের নিয়ে থাকতেন। ছোটবেলায় আমি এই যাদবপুর দেখেছি। বাংলাদেশ থেকে আমরা গেলাম বাঁকুড়ার শিরোমণিপুর রিফিউজি ক্যাম্পে। সেখান থেকে এলাম ঘোলাদোলতলায়। সেখান থেকে যাদবপুরে। তবে কোনপথে দণ্ডকারণ্যে গেলাম, তার কিছুই কিন্তু মনে নেই। বাঁকুড়ার কথা কিছু-কিছু মনে আছে। সেই সময় এই ফুটো পয়সা ছিল, সেগুলো সব পালটে গেল। তার বদলে নয়া পয়সা এল… এইসব মনে আছে।

কবিতা আশ্রম: সেলিব্রিটি হবার পরেও মরিচঝাঁপি আপনার আর কখনও যাওয়া হয়ে ওঠেনি?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: না, আমার যাওয়া হয়নি।

কবিতা আশ্রম: দণ্ডকারণ্যের সেই শরণার্থী বাড়িটা কি এখনও রয়েছে, ফেসবুকে যেটা দেখি?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: হ্যাঁ। আমি তো দণ্ডকারণ্যের-ই মানুষ। আমাদের গোটা একশো তেত্রিশটা গ্রামের নাম পারুনিকোট। পুরোটাই বাঙালি উদ্‌বাস্তুদের অঞ্চল। এখন ছত্রিশগড়ের মধ্যে পড়েছে। আমার গ্রামের নাম ৫৬। ওখানে গ্রামের কোনও নাম নেই। সব সংখ্যা। আমার গ্রামের নাম ‘পিভি ৫৬’। ওখানে গ্রামের নামকরণ এইভাবেই হয়েছিল। ‘পি’ মানে ‘পারুনিকোট’, আর ‘ভি’ মানে ‘ভিলেজ’।

কবিতা আশ্রম: দণ্ডকারণ্যে এখন আপনার কারা আছেন?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: আমার ভাই আছে। আমার ভাইপোরা আছে। আমার নিজের বাড়ি আছে সেখানে। ঘর আছে।

কবিতা আশ্রম: এই যে সারা বিশ্বে এখন শরণার্থী একটা সমস্যা হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গারা একটা সমস্যা, পূর্ব ইউরোপে সিরিয়া থেকে আগত শরণার্থীরাএ-বিষয়ে আপনার যদি কিছু প্রতিক্রিয়া জানাতেন…

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: আমি সিরিয়া-টিরিয়া নিয়ে বলতে যাব না। কারণ সেইটা নিয়ে বলবার জন্য আরও অনেক যোগ্য মানুষ আছেন। তবু একটা অনুভূতি তো কাজ করেই। আসলে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কী ভাবব, যখন আমরা নিজের ভাবনাটা ভেবেই কুল পাচ্ছি না! আমাদের একটা দেশ ছিল। খুব বড় দেশ। সেই দেশটার কোথাও কোথাও রাজনৈতিক কারণে একটা বর্ডার টেনে দেওয়া হল। বলে দেওয়া হল, এইটা পাকিস্থান, এইটা ভারত, এইটা এই…। এবারে আমরা যে-কোনও কারণে বাংলাদেশে পড়ে গেছি, মানে আগে যেটা ছিল পাকিস্থান। আমি তো আদতে ভারতবর্ষের-ই মানুষ, সে আমি ওপারের হই, আর চাই এপারেরই হই। এবারে তোমরা স্থির করো, আমরা কোন পারের। ওপারে আমি যদি যাই, আমাকে বলা হবে ‘মালাউন’, ‘কাফের’, ‘বিধর্মী’, ‘হিন্দু’। এপারে আসলে বলা হবে, ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘বাঙাল’, ‘বহিরাগত’, ‘শরনার্থী’, ‘রিফিউজি’, ‘উদ্‌বাস্তু’! তাহলে আমি কোন পারের? আজকে আমার কাছে কাগজ চাওয়া হচ্ছে। আমি সেই সত্তর বছর আগের পুরোনো কাগজ কী করে দেব? আমার বাবা তো লেখাপড়া জানতেন না। কোন কাগজটা দরকার, কোন কাগজটা জোগাড় করে রাখতে হবে, তাকে তো কেউ তখন তা বলে দেয়নি। তখন যদি কেউ বলে দিত, তুমি এই কাগজ রেখে দাও, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে, তিনি রাখতেন। আমার বাবা তো আর জানতেন না যে, কোন কাগজটা আমার লাগবে…। আজকে যদি আমার কাছে সত্তর বছরের পুরোনো কাগজ চাওয়া হয়…এটার মানেটা কী…? এটা তো ইচ্ছাকৃত আমাদের বিপদে ফেলার জন্য একটা কৌশল করা হয়েছে। আসলে আমাদের সস্তার মজুর বানিয়ে দেওয়ার জন্যে, শিল্পপতিদের উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য তখন যেমন দণ্ডকারণ্যে পাঠানো হয়েছিল, এখানেও, ওই এনআরসি করে আমাদের সস্তার মজুর বানানোর চক্রান্ত করা হচ্ছে। এই যে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে, সেখান থেকে আমাদের ট্রাক ভরে-ভরে নিয়ে শিল্পপতিদের কলকারখানায় কাজে লাগানো হবে। আটটা বিড়ি দেবে, একহাতা ভাত দেবে দিয়ে বলবে, কাজ কর। পুরোটাই কর্পোরেট-ভাবনা। এসব আসলে অল্প পয়সায় শ্রমিক তৈরি করার পরিকল্পনা। চিনদেশে যে ধারণা আছে, স্বল্প-পয়সায় শ্রমিক-নিয়োগ, এটা তারই একটা রূপ।

এই যে নাগরিকত্বের প্রমাণ আজকে চাওয়া হচ্ছে, আমার কাছে তো ভোটার কার্ড আছে, আধার কার্ড আছে, আমার ভোটে যে সরকার নির্বাচিত হয়েছে, সে আমাকে কীভাবে ‘বে-নাগরিক’ করে দিচ্ছে তাহলে? যুক্তি বলে, ওই সরকারও তো নিজেই তাহলে বে-আইনি। আমার কাছে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড থাকার পরেও আমি ভারতের নাগরিক না? আমাকে সেই সত্তর বছরের পুরোনো, পঞ্চাশ বছরের পুরোনো কাগজ জোগাড় করে দিতে হবে? ওরা জানে, আমরা এটা পারব না। অনেক-অনেক মানুষ তা পারবে না। ফলে আমাদের জন্য ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে। ওই ক্যাম্পে আমাদের রাখা হবে। এবার ক্যাম্পে এসে ডাকা হবে, এই, কে কে যাবি কাজে? চল! ভাত বেশি দেব। বিড়ি দেব। গামছা নেই তোর? তোকে একটা গামছাও দেব। জেলখানায় আমাদের যেরকম রেখেছিল, সেইরকমই তাদের আদর করে রাখবে।

কবিতা আশ্রম: শুনেছি রাজারহাটে একটা ডিটেনশন ক্যাম্প হচ্ছে, সেখানে না কি বিদেশী আসামীদের রাখা হবে। এ-বিষয়ে কিছু জানেন কি?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: এখন এরা কী বলছে, কী করবে, কিছুই তো বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। মাত্র একশো জন বিদেশী আসামীর জন্য এতবড় জেলখানা! এটা কি বিশ্বাস করা যায়? ফলে মনে হয় অন্য পরিকল্পনা আছে। এখন এরকম না-বললে লোকে হয়তো ভেঙে ফেলবে! মানুষ তো ক্ষিপ্ত। একটা-একটা করে ইট নিয়ে চলে যাবে। ফলে বলছে, ভাই, তোমাদের কোনও ভয় নেই। এটা বানাতে দাও। বানানোর পরে কাকে ঢোকাবে, কাকে ঢোকাবে না, আপনাকে-আমাকে-সবাইকে বিদেশী বলে দেবে না তার কী মানে আছে? আমাদের কাছেও তো সেই ভারতীয় নাগরিক বলে নিজেকে প্রমাণ করার মতো, যে কাগজগুলো ওরা চাইছে, তেমন ধরণের পোক্ত কাগজ কাছে নেই।  ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড এগুলোই যদি ওরা না-মানে, তাহলে বাবার নামের পঞ্চাশ সালের কাগজ দেখাও! তারপর আসামে যেটা হয়েছে, বাবার পদবিতে ইংরেজি বানানের গোলমাল। আরে, আমার বাবার নাম যখন লিখেছিল, বাবা তো পড়াশুনা জানতেন না। রেশন কার্ড বানানোর সময় আপনি লিখেছেন ‘বিইপিআরআই’, আর-একজন লিখেছেন ‘বিএপিআরআই’, আর-একজন হয়তো ‘ওয়াই’ দিয়ে দিয়েছেন। এক-একটা কাগজে এক-এক বানান। আমি কীকরে প্রমাণ করব এই সবগুলো লোক আসলে একজনই? যে কাগজ চাইছে তাতে কীকরে প্রমাণ দেব যে, এত নামের ওই একজনই আসলে আমার বাবা ছিলেন?

**