রিফুজিলতা

উষারঞ্জন ভট্টাচার্য

 

তখন ছিলাম শিশু। রাজনীতির পাকচক্ৰ বোঝার বয়স সে নয়, যোজন-যোজন দূরে তার থেকে— তখন অমলিন বাল্যলীলা! বড়দের পৃথিবী মাঝে মাঝে দাগ কেটে যায়প্রায়সময়ই কার্যকারণের বাধে নয়। বয়সকালে, আরও বয়সে দূর দুই আঁচলকে এক ভাঁজে আনাএকটা গোছানো ভাব, অনর্থের অর্থ খোঁজার চেষ্টা নিয়ে এই ব্যক্তিগত গদ্য। নিজেকে হাতড়ানো, কিছু লিখে ফেলে যাওয়া চলমান মুহুর্তের কাছে। অত্যুক্তিই হয়তো—এমনটি ভাবলে দোষ দেব না কাউকে। দৃষ্টি আপেক্ষিক বলে কিছু বলার থাকে না।

 

লেখার জন্য ‘একা এবং কয়েকজনথেকে তাড়া আসছে যখন তখন আমার টেবিলে পাতা জগৎপারাবারের তীরে এক ‘ভয়ংকর সুন্দরছবি! ‘সুন্দরবলার জন্য মাপ চাইব, আপাতসুন্দর’ই বলা উচিত। এক পারাবারের পার, সমুদ্রপার। বালুরাশি, নীল জল। বেলাভূমিতে প্রায় মাথা গুঁজে রয়েছে এক ফুলকোমল বা ফুলকমল দেবশিশু।

 

এ ছবি আপনার দেখা।

 

সিরিয়ার চকাবালি শহরে পূর্বপুরুষের ভিটে থেকে পালিয়ে উত্তাল সমুদ্রে নৌকা চড়ে দূরে সরে যাচ্ছিল এক ডজন সন্ত্রস্ত মানুষ। দুস্তর সমুদ্রে অসম যুদ্ধ, সে নৌকো গেল ডুবে। সমুদ্র টেনে নিল জননী রেহানা, তার দুই সন্তান গালিব ও আয়লান কুর্দিকে। গালিবের বয়স পাঁচ, আয়লানের তিন।

 

নিস্পন্দ আয়লানকে সাগর ফিরিয়ে দিল তুরস্কের এক শহর-উপকূলে। লাল জামা, নীল প্যান্ট, নীল জুতা আয়লান। মুখ গুঁজে আছে স্থলজলের সন্ধিতে। ধরিত্রীর ফর্সা বুকে লাল নীল সোনালি বাণী।

 

এই ছবি বিশ্বব্যাপ্ত হল ; জন্ম নিয়েছে আলোড়ন, আন্দোলন এর থেকে। নিষ্ঠুরতার দিক থেকে যখন ভাবি, বুঝতে পারি জগদীশ গুপ্ত কেন তার গল্পের নাম রাখেন চন্দ্রসূর্য যতদিন’!

 

 

আমাদের এই অকিঞ্চিৎকর রচনার নাম দিলাম— ‘রিফুজিলতা। কোত্থেকে উদয় হল এই নাম?

তাহলে, আমাদের যেতে হবে প্রকৃতির বুকে, স্বর্ণলতা-য়। স্বর্ণলতা বা স্বর্ণলতিকা আমাদের অনেকেরই অপরিচিত নয়, কিন্তু গত অন্তত পঞ্চাশ বছরেও আমার মনে পড়ছে না কোথাও দেখেছি এ লতাকে গুয়াহাটি নগরে। তবু, তবু এ আমার সঙ্গী।

শিশুবয়স থেকে লতাটি তিন সূত্রে আমাকে জড়িয়ে রয়েছে, ছাড়াতে চাইলেও ছাড়তে চায় না।

প্রথম সূত্র : উনিশ শতকে তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস স্বর্ণলতা’। বালককালে এই বইটি আমার প্রভূত চোখের জল ঝরিয়েছে; শুধু এটুকুই বলি।

দুই: সোনালি লতার শোভা। সোনাবরণই শুধু নয়, এ যেন সোনা দিয়েই গড়া। পাতালের অনন্ত সোনার তাল থেকে স্বর্গের স্যাঁকরারা গড়ে চলেছে যেন এক অনন্ত সুষমা—মনোহর!

তিন : নান্দী নয়, নিন্দা। স্বর্ণলতাকে নিয়ে নিন্দার কথাটা ১৯৫৪-৫৫-র দিককার। তখন বোধহয় ক্লাস সিক্সে পড়ি।

বিকেলের দিকে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে বেড়াতে বেরিয়েছি। হাইলাকান্দি মিশন। রোড থেকে আমরা যাচ্ছি উত্তরে কলেজ রোডের দিকে। কবরস্থান বা কবরেস্তান পেরোতে না পেরোতে উঁচু রাস্তার দুপাশে অল্প দূরে দূরে রয়েছে ছোট মাঝারি সাইজের কুলগাছ—ধূলি সমাকীর্ণ। তবে আজ নয়, দুপুরে জোর জল নেমেছে, ধুয়ে গেছে লাল ধূলি। পশ্চিম আকাশের ভাঙা মেঘের ফাঁক দিয়ে আসছে স্পেশাল রোদ ; পড়ছে এসে রাঙামাটির পথে, দুধারে সবুজ ঘাসে, সবুজ ধানে।

যেতে যেতে বাছাইর্ খালর্ পুল। খালের নাম বাছাইর্ খাল। পুল বলতে গেলে শহরের উত্তরের শেষ সীমানা। খালে মাছ ধরছিল জনা তিনসবে রাস্তায় উঠেছে, আমরাও ঝুকে পড়েছি মাছ দেখতে। কিছু মাছ খলইতে, কিছু মাছ এখনো ডরির ভেতর। ঠিক পাশেই দশ বারো ফুট উঁচু একটা কুলগাছ, প্রায় পুরো মাথাটাই স্বর্ণলতায় আচ্ছন্ন। গাছের নাক মুখ ঢাকা, চোখটাও মেলাতে পারছে না।

আমরা মাছ দেখছি, হঠাৎ দলের নেতা বলল—চা, চা, স্বর্ণলতার্ বায় চা।তারপর সে যা বলল তার সর্বজনবোধ্য অর্থ হল—মধুসূদন পোদ্দার যদি এই গাছের সন্ধান পান, তা হলে লোক লাগিয়ে গাছটাকেই উপড়ে নিয়ে যাবেন। পাতালের ধন কুলগাছে!

আমরাও তাজ্জব! বৃষ্টিস্নাত গাছের শেষ বিকেলের রোদ এসে পড়েছে—অসংখ্য সোনার লতায় ঝলমল করছে গাছের মাথা। এ দৃশ্যঅভূতপূর্ব!

আমরা মুগ্ধ হলাম, আবার একচোট হাসলামও। মধুসূদন পোদ্দারের শ্রী বৃদ্ধির সম্ভাবনায়! সত্যিই তাই, সোনা ঝলমল তার ভবিষ্যৎ! মাছধরাদলের সঙ্গী ছিল একটি শিশু, আমাদের চেয়েও ছোট। সে বলল, “কিতারে সন্নলতা কইরায়, ইটা অইল রিফুজি লৎ, যে গাছো লাগছে, হি গাছ শেষ!

 

বালভাষণে গুরুত্ব দিইনি—কিন্তু মগজের এক কোণে কোথাও বিঁধে গিয়েছিল কথাটা, এ কথা পরে বুঝতে পারি।

কিছু শব্দ, গন্ধ ; কোনো স্পর্শ, সুর ; কিছু ছবিএরা নীরবে জায়গা করে ঘাপটি মেরে বসে থাকে মর্মকোষে। হঠাৎ উঁকি দেয়- কখনো সুখে, কখনো দুখে।

ইদানীং রিফুজি লতাবেষ্টিত কুলগাছটা মাঝে মাঝেই মনের পর্দায় ভেসে উঠছে ! বেদনার মাঝখানেও পান (pun) রসে আসক্ত ফাজিল মনটা কানে কানে বলে ওঠে এ লতা মঙ্গেশকর লতা নয়, এ লতা ভয়ংকর লতা।

এই নবীন শিশুটি নিশ্চয়ই বড়দের কাছে শুনেছে নব-উদ্ভাবিত নামটি, সঙ্গে তার স্বভাবের কথা। সে তো জানত না লতার মূল উৎপাটনের ব্যথা, তার নিরালম্বতার বিষাদকথা। সে তাে

জানত না ‘ধেড়ে খোকাদের নষ্টামির কাহিনী!

এই প্রসঙ্গেই এর বছর পাঁচ আগের কথা। ভয়ংকর পঞ্চাশ, বিপন্ন পঞ্চাশশরণার্থীর স্রোত। হাইলাকান্দি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হাইস্কুল শরীরে বিশাল হলেও ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী।

শরণার্থী শিবিরের দায়িত্বে আছেন আমার বাবা, তিনি স্কুলের হেডমাস্টার, তাঁর আবাস স্কুল চৌহদ্দির মধ্যেই। শহরের এসডিও মামুদ আলি সাহেব সর্বময় কর্তা হলেও বাবাকে কাতরভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন সামনে থেকে সমস্ত কাজ সম্পন্ন করতে। তিনি থাকবেন আড়ালে। থাকবেন সবরকম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। বলেছিলেন, “আমি কিছুতেই পারব না। এই সব মানুষের মোকাবেলা করতে।

মামুদ আলি সাহেবের কর্তব্যবুদ্ধি ও এমন নেপথ্যচারিতা সকলের শ্রদ্ধা আদায় করেছিল।

বাবা আমাকে পাঠশালায় পাঠাননি কখনো, ফলে ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র’। প্রকৃতিচঞ্চল ছিলাম বোধহয়। বাবা ন’টা-পাঁচটা স্কুলে থাকতেন বলে দিন ছিল। প্রায় স্বাধীন, যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানোকে কোথায় কী করছে, কী ঘটছে জানতে আমার অদম্য উৎসাহ।

 

রিফিউজি ক্যাম্পে ঘটা দুটো ঘটনা অক্ষয়, অব্যয় ; সে দুটি বলছি আজ।

 

প্রথমটি দুপুরের ঘটনা।

 

হিন্দু হোস্টেল আর মুসলিম হোস্টেলের মাঝখানের অংশে মাটিতে বসে আছেন মহিলারা। মাঝে মাঝে বাতাসে ভেসে আসছে পচা ভাতের গন্ধ, সম্ভবত হোস্টেলের পেছনকার সদ্য কাটা বড় বড় গর্ত থেকে। ওখানে সব বর্জ্য ফেলা হচ্ছিল।

শহরের কয়েকজন যুবক ভলান্টিয়ার পরিবেশনের জন্য তৈরি। তাদের সাহায্যের জন্য রয়েছে মণিপুরী হোস্টেলের ‘রান্দ্রা’ (পাচক) তম বাবু সিং। তম বাবু বারো মাস ফিটফাট, ফুল শার্ট আর পাম্প শ্যুতে-ধুতিতে আজও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। হিন্দু হোস্টেলের রান্দ্রা অকুরদা (অক্রূর), মুসলিম হোস্টেলের রান্দ্রা মশুরদার মধ্যে অকুরদা রান্নাঘরে ব্যস্ত, মসুরের আউটডোর কাজ—বাজার করা, স্টোরের খবর রাখা।

 

আমাদের বাসা থেকে ওই পরিবেশনের জায়গাটা দেড়-দুশো ফুট। হাফপ্যান্ট পরা আমি শিশুটি দেখছি কারা কেমন করে বসেছে; শুনছিকী সব কথাবার্তা হচ্ছে সেখানে।

মুসলিম হোস্টেলের ভিতরে ঢুকে জানলা দিয়ে দেখছিলাম পরিবেশন দৃশ্য। আমার একেবারে উল্টোদিকে দুই মহিলা—চেহারা ছবি সম্পূর্ণ বিষম, বিপরীত। একজন বেঁটেখাটো, কোরা নোংরা ধুতি পরনে, ঘাসে বসা, কাপড় উঠে গেছে হাঁটুর ওপরে। পাশেরজন ভারি সুন্দর দেখতে—জেঠিমা-জেঠিমা। লম্বা ফর্সা, দোকানের কাছে পাকা চুল। ধবধবে সাদা শাড়ি পরা, মোটা উজ্জ্বল পাড়, বড়লোকের বাড়ির মেয়ে মানুষ। তিনিও ঘাসে বসে।

তম বাবুরা ভাত ডাল দিয়ে সবে সরেছেন, হঠাৎ এই বেঁটেখাটো হাঁটুজোকা কাপড় পরা মহিলাটি ‘জেঠিমা’র পাতের ডাল ভাতে হাত ঢুকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন— “তুমারে দুনিয়ার মরিচ দি দিছে, আমারে একটাও না, দেও দেখি চাই।

জেঠিমা’র পাতের থেকে এক খাবলা ভাত তুলে নিয়ে নিজের ভাতে মিশিয়ে পরমানন্দে খেতে থাকেন মহিলাটি।…আর জেঠিমা?

জেঠিমা’ তো খাচ্ছেন না। ডুকরে কেঁদে উঠলেন। বাঁহাতে আঁচল নিয়ে চেপে ধরলেন নিজের মুখে—বারে বারে কেঁপে উঠছে জেঠিমা’র শরীর। আগে মাথা নত ছিল, এখন উর্ধ্বমুখ, শাড়ির আঁচল মুখ থেকে সরেনি—তবু আমি তাঁকে দেখতেই থাকি। কিছুই ঠিক বুঝতে পারছি না, আজ যা সবই পারি—কেন ‘জেঠিমা’ না খেয়ে শুধু কেঁদেই চলেছেন? সেদিন ঠিক বুঝিনি।

 

খাওয়া শেষ হয়ে গেল। সবাই খেল, জেঠিমা উপোস করে থাকলেন, একদানা মুখে দিলেন না। না খেলে কি মানুষ বাঁচে? ‘জেঠিমা’র কী হল?

ধীরে ধীরে সরে আসি সিনথেকে। বাসায় না ঢুকে চলে যাই স্কুলের গেটের দিকে। উল্টোদিকে বিশাল মেহগনি গাছ (তখন জানতাম না এটা মেহগনি কিংবা একদা এসডিও হারবার্ট সাহেব শহরে এককুড়ি মেহগনি লাগিয়েছিলেন!), তার পায়ের দিকে একটা বড় গোলাকার গাঁট, কেউ উঠেছে চেঁছে উপরের দিকটা পালিশ করে কাঠের মোড়ার আকৃতি দিয়েছে ; বসে থাকি ওই মোড়ায়। ওইটি আমার প্রিয় আসন। ব্যস্ত ক্যাম্পের লোকজনের কথাবার্তা অস্পষ্ট ভেসে আসছে আমার কিন্তু একই চিন্তা, এ কী দেখলাম। মায়ের চেয়ে বড় হবেন ইনি, এভাবে কাঁদলেন কেন? বাসায় এসে মাকে কথাটা বলতে গিয়ে নিজেই কেঁদে ফেললাম।

 

আর এক ঘটনা।

 

সন্ধে এসে এখন রাত্রি নেমেছে। দাদাদের পড়াশোনাও প্রায় বন্ধ। এমন কাণ্ড চলছে, বাবাও প্রায়ই বাসার বাইরে থাকছেন দিদি, দাদা, বেচনদা, মণিদি, ফুলদা সকলেই প্রায় স্বাধীনতা ভোগ করছে। সুমন্ত দাদি (সুমন্ত্রদাদি, স্কুলের মূল চৌকিদার) ছুটতে ছুটতে বাইরের ঘরে ঢুকেই বললেন, “বাবা কই? স্কুলো রক্তারক্তি কাণ্ড।বাবা তৈরি হতে গেলেন সঙ্গে সঙ্গে—আমি ছুটলাম হরিণ-বেগে, কী হচ্ছে দেখতে! একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। কারণ—জায়গাটায় জমাট অন্ধকার, ভূত সম্বন্ধে আমার ভীতি আছে—একা জায়গাটা পেরোতে ভয় করছে! …

ওই তো ওরা আসছেন, বাবার ধুতি পাঞ্জাবির আভাস পেলাম। উলটোদিক থেকে স্কুলের একজন শিক্ষক ছুটতে ছুটতে এলেন। বুঝলাম, দেরি হলে কেউ মারা যেতে পারে। বাবারা বারান্দায় পৌঁছবার আগেই ক্লাস নাইন-বি সেকশনের সামনে ভিড় দেখে ছুটে ওখানে পৌঁছে গেলাম। ঘরে একটা পেট্রোম্যাক্স জ্বলছে। নবীনদাদির সঙ্গে অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন ডা. সুশীল দত্ত এসে উপস্থিত, সঙ্গে হাসপাতালের দুজন লোক। ডাক্তারবাবুকে দেখে জনতা দুভাগ হয়ে গেল।

ক্লাস রুমে দুই মহিলার কান্না, এক পুরুষের গোঙানি। জানলা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি একজন শীর্ণ মানুষ, পরনের লুঙ্গির গিঁটটা নাভির অনেক নীচে, মাথার পাশ ধরে রক্ত ঝরছে অঝোরে। ক্লাসরুমের প্ল্যাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে আমার চেয়ে ছোট দুটি শিশু ভয়ে কাঁদছে, এক মহিলা জড়িয়ে ধরলেন ডাক্তারবাবুর পা—তানে বাছাইন্ ডাকতরবাবু, তানে বাছাইন্।

 

ওই আর্তনাদ এখনো বাজে ; মাঝে মাঝে কে এখনো মগজের ভেতর বাজায়।

 

একটা স্ট্রেচারও যেন আনা হল—হাসপাতাল স্কুলের গায়েই। কী সব বিচার হল—সে সব শেষ হবার আগেই আমি ফিরে এলাম বাসায়। শিশু মনটা বড় ধাক্কা খেয়েছে। মাথাটা-গাটা রক্তে ভেজা, রক্ত ঝরছে অঝোরে। লুঙ্গিপরা লোকটার বিহ্বল চেহারা—কান্নাকাটি, মহিলার আর্তনাদ ডাক্তারবাবুর পায়ে পড়ে—এমন মারামারি কেন হল?

কেন হল এমন রক্তারক্তি কাণ্ড?

এক একটি ক্লাসরুমে চার-পাঁচটা পরিবার ঢুকেছে। সুযোগ পেলে যে যার সুবিধেমতো জায়গা বেছে নিচ্ছে। এ পর্যন্ত সবই ঠিক আছে। কিন্তু প্ল্যাটফর্ম? প্ল্যাটফর্মের অধিকার কার ?

জমি গেছে, বাড়ি গেছে, সম্পত্তি গেছে, স্বজন গেছে, কিন্তু সামনে এই যে প্ল্যাটফর্ম, এর অধিকার অন্যকে দেব কেন? কে শোবে প্ল্যাটফর্মে, কে শোবে মেঝেতে এর নির্দেশ তো ব্যবস্থাপকরা দেননি। সব হারিয়েও শাস্তি নেই, অধিকারের প্রশ্নে ঝগড়া, টানাহ্যাঁচড়া, হাতাহাতি; ক্যানেস্তারার কাটা ঢাকনাটাকে অস্ত্র করে একজন ঝাপিয়ে পড়ছে আর একজনের ওপর, কেননা শত্রুর শেষ রাখতে নেই। জামা ছিড়ে, মাথা ফাটিয়ে বীভৎস কাণ্ড—অনুশোচনা নেই, তর্জনে-গর্জনে ক্যাম্প গরম!

 

ওই রাতের শীর্ণ রক্তাক্ত মানুষটি নিউজ শরীরের এখনো দেখা দেন। কাছের ছবি সহজে মুছে যায়, কিন্তু বাল্যের ‘অর্জন’, সে তো অব্যয়!

 

যে দুটি ঘটনা তুলে ধরলাম, কথাকার তাকে উপকরণ করে লিখতে পারেন একাধিক গল্প, মনোবিজ্ঞানী পেয়ে যাবেন তার ‘কেস’ এবং অন্যভাবেও এরা দেখা দিতে পারে। জেঠিমারপাতে বুভুক্ষু থাবা, প্ল্যাটফর্ম-দখল, আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ—এ সব ঘটার পরক্ষণে লোকব্যুৎপত্তির স্বভাবে জন্ম নিল নতুন নাম ‘রিফুজিলতা’। তার স্বভাব আরোপিত হল বাস্তুহারা জনধারার গায়ে। নিয়তি দিল তাকে অভিশপ্ত টীকা! তার উপস্থিতিতে সাবধান-সাবধান রব, আড়াল থেকে প্রকাশ্যে, প্রকাশ্যে তার মাত্রা বাড়ে। আতঙ্ক মাকড়সার মতো লতাজাল বিস্তার করে ঘিরে ধরতে চাইছে অবমানিত কিছু মানুষকে। এত, এত বছর পরেও! অনিশ্চিতির দুঃস্বপ্নের তলে সেই রবের মাত্রা বাড়ছে। এঁদের মনে হচ্ছে এ বজ্ঝপডহসদ্দ—বধ্যপটহশব্দ—বধ্যভূমিতে পটহের নিনাদ! এঁরা জাগরী, এমন কোনো বৃক্ষ নেই যে এঁদের ছায়া দিতে পারে, ঘুম দিতে পারে!

 

ওরা খোঁজে বংশলতা, তুমি খোঁজ ছায়া,

ইতিহাস কাঁদেহাসে নেতারা, বেহায়া!

হায়, নেতারা বেহায়া!