গদ্য

 

একটি গল্পের পুনর্পাঠ 

শিবাশিস দত্ত   

 

 

ভারতীয় চলচ্চিত্রকার, ঔপন্যাসিক খাজা আহামদ আব্বাসের লেখা একটি গল্পের নাম ‘ভারতমাতার পাঁচ রূপ’। পঞ্চরূপের  এই ভারতমাতা দেশের কোনো  উগ্র ধর্মান্ধবাদী দলের মনগড়া দেশমাতা নন, প্রতিটি মাতৃরূপ  সাধারণ, সাদামাটা গোছের। কিংবা, এও বলা যায় যে এই ভারতমাতা হলেন দেশের কোটি কোটি ভুখা মানুষের মা। যেমন, এক বৃদ্ধা, নাম হাকিমা–সবাই তাকে ‘হক্কো’ ‘হক্কো’ বলে ডাকত–তাঁকে ভারতমাতা পরিচয়ে হাজির করেছেন গল্পকার। হক্কো তরুণী বয়সেই  বিধবা হয়েছিলেন। তিনি লেখাপড়া জানতেন না। যদিও তিনি  কোনোদিন কোনো পুরুষ বা ধনী লোক, অফিসার বা দারোগা–কারো কাছে মাথা নোয়াননি। সারা জীবন মেহনত করে  কিছু গয়না বানিয়েছিলেন।  মহাত্মা গান্ধীর ভাষণ শুনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, পরবর্তীতে স্বরাজি হয়ে গেলেন। হক্কো তাঁর সমস্ত গয়না তুলে দিয়েছিলেন গান্ধীবাদী আন্দোলনের জন্য। প্রশ্ন করতেন, ‘ইংরেজ রাজ কবে শেষ হবে ?’ অন্ধ হবার পরেও তিনি চরকা কাটা ছাড়েননি। তাঁর শেষ ইচ্ছে ছিল, নিজের হাতে বোনা কাপড়ে যেন তাঁর কফন দেওয়া হয়। হক্কোর যখন জানাজা হয়, কোনো ঝান্ডা ওড়েনি, মিছিল হয়নি, একটা ফুলও জোটেনি তাঁর। জুটেছিল শুধু একফালি খদ্দরের কফন। গল্পকার লিখেছেন: “এই সময় যদি আমার একটুও বোঝার বয়স হত তবে আমি অন্তত একটি শ্লোগান দিতাম—‘ভারতমাতা কী জয়’”।

 

এ কোন ভারতমাতা কিংবা এ কোন দেশ — যার কথা গল্পে উঠে এসেছে? দেশ নিয়ে যে গল্পগাছা থাকে, লিখিত কিংবা অলিখিত গল্পের যে দেশ– তাকে জেনেবুঝে নেওয়ার প্রয়োজন আছে বই কী ! দেশ নিয়ে, দেশের মাটি নিয়ে ধাপ্পা চলে– মানুষ ডুবে যায় সে খপ্পরে। দেশছাড়া হতে হয়েছিল এক মা-কে, দেশান্তরী হওয়ার সময় তিনি তাঁর উঠোনের চারাগাছকে মাটিসুদ্ধু সঙ্গে করে নিয়েছিলেন– যে মাটি আঁকড়ে ছিলেন তার চিহ্নকে মুছে ফেলতে দেননি। একেই বলে দেশের মাটির টান। কিন্তু অগণিত মানুষ — তারা কেমন করে বোঝাবে কোনটা তাদের দেশ? জার্মান লেখক আলেকজান্ডার ক্লুগারের মতে, ‘একটি দেশের ইতিহাস তার গল্পগাছা ছাড়া আর কি হতে পারে? অসংখ্য, অজস্র গল্প, আগেপিছে গল্প, গল্পের ওপর গল্প–ঠিক যেন একটি দেশের নানা খাঁজ-ভাঁজ বা বয়ে চলা তরঙ্গস্রোত।’ 

ভারতমাতার কল্পিত রূপে আশি বছরের  আর এক ব্রাহ্মণীর হদিশ মেলে এ গল্পে। তিনি   কেবল মারাঠি ভাষা জানতেন, কোনোদিন খবরের কাগজ পড়েননি, ইনক্লাব শ্লোগান শোনেননি, অথচ নিজের ঘরে আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবীদের আশ্রয় দিয়েছেন। অশিক্ষিত ছিলেন, কিন্তু মূর্খ ছিলেন না। পুজোআচ্চা করতেন, তবে ছোঁয়াছুঁয়ি মানতেন না। মনুর শাস্ত্রবিধি বা কানুন ভাঙার জন্য তৈরি ছিলেন, ভয় পাননি। লেখক এই বৃদ্ধার মনোবলের তারিফ করে তাঁকে ভারতমাতার আসনে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

এই যে ভারতমাতা, সে তো আশ্রয় দেবে, কোল দেবে তাঁর কোটি কোটি সন্তানকে। কিন্তু সে কাজ বড়ো সহজ নয়।  এ গল্পে ‘শরণার্থী’ শিরোনামে একটি অধ্যায় আছে। এবার সে অধ্যায়ে প্রবেশ করা যাক :

 দেশভাগের ফলে সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল? উনিশশো সাতচল্লিশের অগস্ট-সেপ্টেম্বরের ঝড়ে প্রায় এক কোটি মানুষ একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। খানদানি পরিবারগুলো ভেঙে খানখান হল। ‘যাদের গৃহ ছিল তারা গৃহহীন হল, লাখপতি ভিখিরি হয়ে গেল।চার দেয়ালের মধ্যে লালিত কুমারীযৌবন বিক্রির জন্য মেয়েরা বাজারে হাজির হল।’

 

এরপর গল্পকার দুই বৃদ্ধার গল্প বলেছেন। একজন লেখকজননী(আম্মা) অন্যজন এক শিখবন্ধুর মা(মাজী)। প্রতিকূলতার দরুন তাঁরা প্রায় একই সময়ে বোম্বাইয়ে চলে আসতে বাধ্য হলেন। রাজনীতি বড়ো বালাই। আম্মা ছাড়লেন পূর্ব পাঞ্জাব আর মাজীকে পশ্চিম পাঞ্জাব ছাড়তে হল।

মাজী রাওয়ালপিন্ডি থাকতেন। কখনো বাইরে কোথাও যাননি। পৈতৃক জমিজমা, খেতের ফসল, ঘরের দুধ-ঘি-দই– সব মিলিয়ে দিব্যি চলছিল। ছেলে থাকত বোম্বাইতে। দেশভাগের খবর এল, পাকিস্তান হল, মাজী তাতেও ভয় পাননি। ভয় পাবেন কেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাঁর যে পরম সদ্ভাব ছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হল কই! বিদ্বেষের আগুন ভয়ানকভাবে জ্বলে ওঠার পর ছেলে মাকে বোম্বাই চলে  আসার জন্য চিঠি লিখল। কিন্তু মাজী নড়বার মতো মানুষ নন। আর তখনই   এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল। তাঁর বাড়ির সামনে একদল হাঙ্গামাবাজ মুসলমান এক হিন্দু টাঙাওয়ালাকে ছুরি মেরে পালিয়ে গেল। এ ঘটনায় মাজীর প্রতিক্রিয়ার কথা লিখেছেন গল্পকার:

‘বাবা, টাঙাওয়ালা তো হিন্দু ছিল ঠিকই, কিন্তু ঘোড়ার তো কোনো ধর্ম বা জাত ছিল না। কিন্তু ওরা ওই হতভাগা জানোয়ারটাকেও ছাড়েনি। ছোরা চালিয়ে ওটাকেও মেরে ফেলল। মনে হচ্ছিল ওদের মাথায় রক্ত চড়ে গেছে, ওরা যেন মানুষ নয়, অন্য কিছু।’ এই হল ঘৃণার রাজনীতি।

 

হাঙ্গামাবাজদের কি কোনো ধর্ম হয় ! যারা জীবন তছনছ করে তারা তো ধর্মহীন। তারা হন্তারক। এ ঘটনার পর মাজী পৈতৃক ভিটে ছাড়তে বাধ্য হলেন। লেখকের ভাষায় :

‘মাজীর ঘর-বাড়ি আসবাবপত্র চলে গিয়েছিল, জমি আর বাড়ির মালিক থেকেও আজ তিনি এক শরণার্থী।’ 

কিন্তু তাকে দেখে তা মনে হত না–এত বিপদ-আপদ পার হওয়ার পরেও না। মুসলমানদের জন্য গৃহহারা হলেন বটে, কিন্তু একদিনের জন্যও বলেননি মুসলমানরা বজ্জাত। শুধু তাই নয়, মুসলিম পরিবারের আম্মার সঙ্গে শিখ সম্প্রদায়ভুক্ত মাজীর যেদিন প্রথম পরিচয় হল, তাঁরা একে অপরের গলা জড়িয়ে কেঁদেছিলেন। দেশের কথা স্মরণ করেই তাদের এ কান্না জেগে উঠেছিল। তাঁরা পরস্পরকে এমন সান্ত্বনায় জড়ালেন যেন তাঁরা দুই বোন। আরও বিস্ময়কর ঘটনা হল, শরণার্থী হওয়া সত্ত্বেও মাজী তাঁর দুঃখ আর ক্ষয়ক্ষতির কথা কাউকে বলতেন না।

এ তবে কোন শরণার্থী

এ গল্পের আর একটি অধ্যায়ের শিরোনাম ‘ঘৃণার মৃত্যু।’ শেষের এই অধ্যায়ে গল্পকার নিজের মাকেই ভারতমাতার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ যেন নিজের জীবনকে গল্পে পৌঁছে দিয়ে সেই গল্পের ভেতর দিয়ে জন্মদাত্রীকে দেখার বাসনা লেখকের। কিন্তু কেন, কী এমন ঘটেছিল সেদিন?

বিপদ বুঝে আত্মীয়স্বজনরা আম্মাকে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল। আম্মার জবাব ছিল : ‘আমার দেশ ছাড়ব কেন? আমার ছেলে হিন্দুস্থানেই থাকবে বলে ঠিক করে নিয়েছে। তার এই ফয়সালায় আমার মত আছে।’ 

সেদিন পাকিস্তানে যেতে রাজি হননি যারা  তাঁদের বের করে আনার জন্য জওহরলাল নেহরুর দয়ায় একটা মিলিটারি ট্রাক রাতারাতি পানিপথ পাঠানো হল। … “তাঁর (আম্মার) দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, অবস্থা ঠিক হয়ে গেলেই তিনি আবার ফিরতে পারবেন। তাই তিনি দরজায় একটা তালা লাগিয়ে তাতে বোর্ড ঝুলিয়ে দিলেন—‘এই বাড়ির লোক পাকিস্তানে যাচ্ছে না, বোম্বাইয়ে তাঁর আত্মীয়ের কাছে যাচ্ছে এবং হিন্দুস্থানেই থাকবে।’

তারপর কী ঘটল? খবর এল, আম্মার  পানিপথের বাড়ি লুঠ হয়ে গেছে এবং একদল শরণার্থী তা দখল করেছে।

এই লুঠের ব্যাপারটা কেন ঘটত? ধরা যাক, পাকিস্তান থেকে অনেক উদ্বাস্তু পরিবার হিন্দুস্থানে এসে জড়ো হল। তাদের কাছে খবর থাকত, মুসলমান সম্প্রদায়ের লোক এদেশ ত্যাগ করে পাকিস্তানে রওনা হচ্ছে। তারা চলে গেলেই সেই গ্রাম আগত শরণার্থীরা দখল করার জন্য অপেক্ষা করে থাকত। দখলদারির ঘটনা এভাবেই ঘটত।

যে আম্মা ছিলেন পর্দানশীন, পর্দাপ্রথার সপক্ষে   যিনি তর্ক করতেন, জীবন বাঁচাতে তিনিও এবার পর্দা ছাড়লেন। তবে প্রতিদিন নমাজের পর প্রার্থনা করতেন, ‘হে আল্লাহ্, সমস্ত গৃহহীন হিন্দু মুসলমান শিখ যেন তাদের নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে পারে।’ গান্ধীজি শহিদ হওয়ার পর আম্মা চোখের জল মুছতে মুছতে বলেছিলেন, ‘হায়, এখন হিন্দুস্থানের কী হবে?

 

গল্পের একেবারে শেষে লেখক ‘দেশ’এর যে পরিচয় ঘোষণা করেছেন, তা এককথায় তুলনাহীন। স্বদেশের প্রতি যার এত ভালোবাসা, সেই আম্মা করাচিতে তাঁর ছোটো মেয়ের কাছে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হল। কিন্তু তিনি তো হিন্দুস্থানে মরতে চেয়েছিলেন!

গল্পকার সে কথা স্মরণ করে  লিখেছেন : “মার কবর করাচির গোরস্থানে আছে, কিন্তু তাঁর আত্মা, স্মৃতি, তাঁর জীবনাদর্শ এই হিন্দুস্থানে, আমার কাছে রয়েছে।…  আর পাকিস্তানের ছ-ফুট জমি চিরদিনের জন্যে ভারতবর্ষের মাটি হয়ে থাকবে। কারণ সেখানে এক ‘ভারতমাতা’কে কফন করা হয়েছে।” 

এই হল গল্পের দেশ। আমাদের যেন কোনো দেশ নেই, দেশ থাকতে নেই, তাই গল্পের সেতু গড়ে আমরা ক্রমাগত  হাতড়ে চলেছি, কল্পিত কোনো দেশ নির্মাণ করে চলেছি। আজ যে আবার রাষ্ট্রপ্রভুর সাজসে  এনআরসি-সন্ত্রাস মাথাচাড়া দিয়েছে, দেশজুড়েই একদল মানুষকে শরণার্থী বানিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি করতে চাইছে, ‘আমি যে আমি’ তার প্রমাণ চাইছে, দেশের মানুষকেই দেশের ভেতরেই দেশছাড়া করতে চাইছে, তখন, এ দুঃসময়ে  ভরসা  মিলবে কোথায়? সেই মনুবাদী শাসন তো আবার লাগু হয়েছে।  তবে তো আবার সেই ভারতমাতাকে  খুঁজে নিতে হবে যিনি তাঁর সন্তানকে রক্ষা করবেন। এনআরসি আতঙ্কে  মৃত্যুমিছিল আজ যখন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে, খাজা আহামদের গল্পের পুনর্পাঠ যেমন জরুরি হয়ে উঠেছে, ঠিক তেমনি  লেখা হয়ে চলেছে এ সময়ের দেশ-পরিচয়ের ভাবনা ও তার আতঙ্কের নতুন গল্প। কোন সে গল্প? খুব সম্প্রতিকালে অ্যাঞ্জেলিকা ভট্টাচার্যর লেখা গল্প ‘জবাই’ এর কথাই ধরা যাক। এ গল্পেও আছে, মাংসবিক্রেতা আফতাবের দেশ আঁকড়ে থাকার স্বপ্ন। তার মাংসের দোকানের সামনে জটলা হয়, লোকজন বলাবলি করে :

‘যাকে মানুষ ভোট দিয়ে জেতাল সেই বলে এটা তোমার দেশ আগে প্রমাণ করো। রিফিউজি হয়ে বছরের পর বছর এপারে এসে থাকল। এখন সরকার বলে,যাও তোমার কোনো পরিচয় নেই, ওপারে চলে যাও।’

কিন্তু আফতাবের নানা– সে তো দেশ ছাড়েনি। সেই সাতচল্লিশের গল্পের আম্মা বা মাজীর মতো। পাঞ্জাবে তাদের ঈদের চাঁদের মতো একফালি জমি ছিল। সেখানে ভুট্টা চাষ হত। আফতাব দেখেনি– যদিও সে জমি, বাড়ি ছিনতাই হয়ে গেছে। নানা পালিয়ে এসেছিল এই বাংলায় এক বন্ধুর বাড়ি। কিন্তু তারা তো রিফিউজি নয়। আফতাবের ছেলে আকবর নিশ্চিন্ত হতে চায়– এই দেশ থেকে তাকে কেউ তাড়াতে পারবে না। কিন্তু এনআরসি-র নামে ধর্ম-নাগরিকত্বর যে প্যাঁচ কষা হয়েছে, তার ফলে আকবররা তো দেশছাড়া হবে।   আকবররা তবে কোথায় খুঁজবে ওদের দেশ? এ কী তবে সাতচল্লিশের গল্পের কোনো পুনরাবৃত্তি? আমাদের গল্প আছে, গল্পের দেশ আছে, ভূগোলনিশ্চিত দেশ নেই। আজও নেই।