প্রবন্ধ

উদ্বাস্তুর সন্তান আমি, দেশান্তরী কান্নার বীজ  

গৌতম গুহ রায়

দুটো শিশু,  আইলান কুর্দি ও ফেলেনি, মাঝে নিঝুম অর্ধেক বিশ্ব। রাষ্ট্র কখনও কখনও ধাতব, শীতল যন্ত্র হয়ে যায়। তার সীমান্ত থাকে, দখলের ও রক্ষার অস্ত্রও থাকে, সংবেদনহীন এই যন্ত্র ক্ষমতা ও জনতার দন্দ্বে ক্ষমতার কাঁধে কাঁধ রাখে। রাষ্ট্রের অহংকার তার সীমা, তার কাঁটাতার ও সীমান্ত। এই অহংকারের ধুসর অন্ধকারে নিস্তব্ধ পরে থাকে মানবিক সৈকত, দুই বেয়নেটের মঝে সবুজ চাষজমি দুফালা করে খাঁড়া দাঁড়ানো থাকে কান্নার কাঁটাতার। তাই বিশ্বের মানুষ দেখে  ওই ছবিগুলো, প্রতিকারহীন নুব্জ মানুষের মুকমিছিল দেখি। ভূমধ্যসাগরের ভেজা বালুর উপর মুখ থুবরে পড়ে থাকে বছর তিনেকের  একটি নিস্পন্দ নিথর শিশু দেহ, আইলান। একই ভাষা ও সংস্কৃতির, একই ঐতিহ্যের অংশীদার দুই দেশ, ভারত ও বাংলাদেশ, এদের মাঝের অমানবিক  কাঁটাতারের উপর সীমান্তের অমানবিক বুলেটের ক্ষত নিয়ে ঝুলতে থাকে ফুলের মতো শিশুকন্যা ফেলেনি। আমরা অনুভব করি মানুষ কেমন ক্রমশ তার বিবেকের জমি থেকে বিছিন্ন হয়ে উদ্বাস্তু হয়ে গেছে, এক মনহীন ধাতব যন্ত্র অনুগত রোবট, ভালোবাসার মাটি থেকে উৎপাটিত হয়েছে তার শেকড় শুধু নয়, ক্রমশ পুড়ে যাওয়া মননের নন্দন কাননেও সে হয়ে যায় উদ্বাস্তু।

আভিধানিক অর্থে উদ্বাস্তু বলতে আমরা বুঝি বাস্তুহীন বা ভিটাচ্যুত মানুষদের। সভ্যতার ইতিহাসে মানুষের প্রব্রজন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, এর ফলেই সংস্কৃত ও সভ্যতার বিস্তার ঘটে। কিন্তু স্বাভাবিক প্রব্রজন ঘটে নানা কারণে, প্রাকৃতিক, রাজনৈতিক নানা কারণ থেকে। কিন্তু উদ্বাস্তু মানুষেরা তাদের ভিটা বা আদি জন্মস্থান থেকে উৎপাটিত হয় রাজনৈতিক হানাহানির পরিণামে, রাষ্ট্র ক্ষমতার দখলদারী এর পেছনে প্রধান।

রাষ্ট্র ধারণার প্রত্যুষ থেকেই সীমান্তরেখা জড়িয়ে আছে। সীমান্তকে রক্ষা ও বৃদ্ধি রাষ্ট্রের সাথে  সম্পর্কিত। আমরা দেখি মহাভারতে পিতামহ ভীষ্ম বলছেন, ‘দেশের সীমা মায়ের বস্ত্রের সমান। অতএব সীমা রক্ষা করা পুত্রের প্রথম কর্তব্য’। এই দেশ কর্তব্য ক্রমশ পর্যবসিত হয়ে ওঠে আগ্রাসী সম্প্রসারণ, হানাহানি ও প্রাণঘাতী সংঘাতে। এই সীমান্তরেখায় এসে জাতীয়তাবোধ উসকে দেয় বৈরী মনকে, মিত্র নিমেষে হয়ে যায় শত্রু। এ এক দীর্ঘকালের পরম্পরা। এই শত্রুতার ফলে যে সংঘাত জন্ম দেয় তার পরিণামে সংকটাপন্ন হয় মানুষ, প্রসারমান আতঙ্কে ভিটে মাটি থেকে সে পালিয়ে যায়। দলে দলে মানুষের এই পালানোই বলপূর্বক প্রব্রজন।

স্বাধীনতার নামে দেশ ভাগ এই বাংলায় সীমান্তের মানুষদের সামনে অনেক যন্ত্রণার জন্ম দিয়েছে। ছিট মহল সমস্যা, এয়াডভার্স পজিশান সমস্যা, কাঁটাতারের বেড়ার সমস্যা, নো ম্যানস ল্যান্ডের মানুষদের সমস্যা। এর প্রধান কারণ সীমান্তরেখা যিনি এঁকেছিলেন সেই সিরিল র‍্যাডক্লিফ   ও তার সাঙ্গপাঙ্গেরা। স্বপ্নভূমের আসায় লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভূমিচ্যুত করা হলো একটি খড়ির গন্ডি কেটে। মাত্র ৩৬ দিন সময় দেওয়া হয় র‍্যাডক্লিফ কে দুই দেশের সীমান নির্ধারনের জন্য, এর আগে তিনি এই দেশটি চিনতেন না,আসেননিও কোনোদিন। এই ৩৬ দিনে তিনি একবারের জন্যেও বাংলা বা পাঞ্জাব দেখতে পাননি। বিলাতের কৃতি আইনজীবি র‍্যাডক্লিফ দিল্লীতে বসে মাত্র চার ঘণ্টায় দুই দেশের সীমান্তরেখা টেনে দেন। এই কাজে তার সহায়ক ছিলেন ভাইসরয়ের সচিন ভি পি মেনন। ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন নীতি গ্রহণ করা হলেও তা কততা অব্দি প্রসারিত হবে তা  এদের কাছে পরিষ্কার ছিল না, ছিল তাড়াহুড়ো। যতদ্রুত এই দেশটাকে দ্বিখন্ডিত করা যায়! এই পরিণাম লক্ষ লক্ষ দেশবাসীর সামনে এক ভয়ানক অন্ধকারের বাস্তব। ১৯৪৭এর ৩ জুলাই এই র‍্যাডক্লিফ বিভাজন চূড়ান্ত ভাবে গ্রহণ অরা হল।

বাধ্যতামূলক প্রব্রজন বা উদ্বাস্তু হয়ে মানুষের ভিন্ন আস্থানার উদ্দেশ্যে ছুটে চলার ঘটনার প্রাচীন উদাহরণ সেদিনের মধ্যপ্রাচ্যে দেখা যায়, ঘটনাক্রমে আজকের দিনেও সেই অঞ্চলেই উদ্বাস্তু হয়ে ভিটাচ্যুতির ঘটনা মর্মান্তিক বাস্তবতা হয়ে দেখা দিচ্ছে। মিশর, সিরিয়া ও আরব অঞ্চলের মধ্যবর্তী ভূমধ্যসাগরের পারের ভূখন্ডটি চিরকালই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের তিনটি প্রধান ধর্মের সূচনা ক্ষেত্র এটি, ইসলাম, খ্রিস্টান ও জুডাইজম। যুগ যুগ ধরে নানা মতের ও রাষ্ট্রের সংঘাতে রক্তাক্ত হয়েছে এই অঞ্চল। মানুষ প্রাণ বাচাতে দেশান্তরী হয়েছেন। খ্রিষ্ট্রিয় প্রথম শতকে রোমান সম্রাট টাইটাসের নির্মম অত্যাচারের বলি হয় স্থানীয় ইহুদিরা। এক চতুর্থাংশ ইহুদিকে হত্যা করা হয়,  অনেককে ক্রীতদাস করে রোমে নিয়ে যাওয়া হয়। গৃহচ্যুত ইহুদিরা ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপের নানা দেশে। বাধ্যতামূলক প্রব্রজনের এটি এক নির্মম উদাহরণ। এর পরের মর্মান্তিক উদাহরণ আফ্রিকার মানুষেরা, ইউরোপীয় ভাগ্যান্বেষীরা আফ্রিকা থেকে মানুষদের ক্রীতদাস করে চালান করে দিতে শুরু করে আমেরিকা, লাটিন আমেরিকা ও ইউরোপের নানা দেশে। সভ্যতার যাবতীয় শর্ত লঙ্ঘন করে এই মানুষদের জন্তুর মতো নিজ গৃহ থেকে বলপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৮২১ থেকে ১৮৩০, এই এক দশকের প্রত্যেক বছর গড়ে প্রায় ৮০/৮৫ হাজার কালো মানুষকে ক্রিতদাস করে চালান করা হয় আমেরিকা, লাটিন আমেরিকা সহ নানা দেশে । এই মানু্ষদের ‘উদ্বাস্তু জীবন’এর বর্ণনা সভ্যতার সবচেয়ে নির্মম আখ্যান, যা সত্যি  ও বাস্তবে ঘটেছিলো । প্রায় তিন শতাব্দী ধরে এই অমানুষিক ঘটনা ঘটে চলে ইউরোপিয় ‘সভ্য’দের হাতে । ১৮৬৫তে আব্রাহাম লিংক্কনের উদ্যোগে দাস প্রথা আইনি ভাবে নিষিদ্ধ হয়। আজ আমেরিকা ও লাটিন আমারিকার অধিকাংশ অধিবাসী আফ্রিকা ও এশিয়ার উপনিবেশ থেকে, তাদের নিজ ভিটে থেকে উচ্ছেদ করা মানুষের বংশধর, একদিন বলপূর্বক যাদের ভূমিচ্যুত করা হয়েছিলো।

ডিজিটাল বিশ্বের উপহার পরিবার ভেঙ্গে মানুষের একক হয়ে যাওয়া। মানবাত্মার  ক্রমবর্ধমান বিপন্নতা, পূঁজি ও ভোগবাদ যেমন মানুষকে নিঃসঙ্গ করছে, তেমনি মানবিকতার মোড়ক মুক্ত করেছে রাষ্ট্রের লালসাকে। গত শতকের দু’দুটো সভ্যতাঘাতী বিশ্বযুদ্ধ অতিক্রম করে আসা মানুষ আশা করেছিলো এবার হয়তো শান্তি কায়েম হবে, কল্যানকামী রাষ্ট্রর হাতে বিশ্ব কিছুটা স্বস্তিতে থাকবে । কিন্তু বাস্তব চেহারাটা হয়ে উঠছে আরো ভয়ানক, পুঁজির দ্বন্দে পিচু হটছে মানবিক সুস্থিতি, আহ্বান করে আনা হচ্ছে  আরো ভয়ানক এক সময়কে।  জাতিস্বত্ত্বার নামে খণ্ডীকরণ, ধর্মীয় জিঘাংসায় সদা ব্যাপ্ত ধ্বংসের দুন্দুভি গোটা সভ্যতাকে এক মানবিকাতা বিহীন ধূসর প্রান্তরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যুযুধান অপশক্তির দাপটে মানুষ হারাচ্ছে তার অস্তিত্বের শেকড়, তার বিশ্বাসের জমি। সীমান্তের খড়ির গন্ডি মানুষকে রাষ্ট্রহীন করছে, আজকের সময়ে  সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে উঠছে সীমান্ত রেখাকে নিয়ে। যে রেখার দুপারে জমা হচ্ছে সব হারানো মানুষের কান্নার নক্সিকাথা।

আমাদের, এই ভারতীয় সমাজের সবচেয়ে গভীর ক্ষত দেশ ভাগ, ফল স্বরূপ শেকড় থেকে উৎপাটিত কোটি কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়া। এই ‘উদবাস্তু জীবন’এর ক্ষত আজও স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যরাতের সূর্যোদয়ের  অভিঘাতে  ‘উদ্বাস্তু’ হয়ে যাওয়া সেই সব মানুষের  সবচেয়ে দুঃসহ স্মৃতি, যে যন্ত্রণা এই প্রজন্মও বহন করছে। কিন্তু, এর বিপরীতে এটাই সময়ের বাস্তবতা যে মানুষের স্মৃতি সততই উদ্বায়ু, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ফিকে হয়ে আসে। এই ধুসর স্মৃতির সখাত সলিলে নিমজ্জিত ভাঙ্গা ভূমির বাংগালির সামনে আজ চক্রব্যূহের ফাঁদ। এই ফাঁদে পড়ে আজ সে বিস্মৃত তার হাজার বছরের ঐতিহ্য। সে আজ হিন্দু বা মুসলমান। তার স্মৃতি থেকে বিস্মৃত হয়ে গেছে দেশভাগ, দাঙ্গার তাজা রক্তে স্নাত ভূমি, বাস্তুহীনতার অভিশাপ তাড়িত সে ধর্মের নামে আত্মঘাতী চক্রব্যূহে আবার ঢুকে পড়েছে। জাতীয়তার আবেগে বিপন্ন মানবিকতার দগ্ধ প্রান্তরে ক্রমশ পথ হারাচ্ছে এক প্রজন্মের উদ্বাস্তু,  প্রবল হয়ে উঠছে দিশাহীন বাঙ্গালী ভেতরের আন্তর্বিরোধ ও কেন্দ্রীকতার অপরতার নির্মাণ।

স্বাধীনতার তীব্র আন্দোলনের সামনে অসহায় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রশক্তি দেশ ভাগের দুর্যোগ নামিয়ে এনেছিলো। ক্ষমতা দখলের মৌতাতে মগ্ন জাতীয় নেতৃত্ব তখন বিভাজন  প্রতিরোধের থেকে ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছানকে বেশি জরুরী মনে করেছিলেন। অপ্রধান হয়ে পরে ব্রিটিশ শক্তির বহুমুখী ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার লড়াই। সূক্ষ্ম ভাবে শাসক সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে ত্বরাম্বিত করার জন্য বাংলা ও পাঞ্জাবকে বেছে নেয়। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জমি এখানেই শক্ত ছিলো সবচেয়ে, তাই এখানেই আঘাত হানলো তারা। ১৯৪৬এর গ্রেট ক্যালকাতা কিলিং, ১৯৪৯এর দাঙ্গার নৃশংস গণহত্যা,  হাজার বছরের অবিভক্ত দুই জাতিকে ভেঙ্গে টুকরো করে ফেলার চক্রান্ত তখন মুখ্য হয়ে উঠলো।  বাংলার বিভাজনের ফলে পৃথিবীর পাঁচটি বৃহৎ ভাষাগোষ্ঠীর অন্যতম বাঙ্গালি বিচ্যুত হলো তার ইতিহাস-সংস্কৃতি-সাহত্যের ধারবাহিকতা থেকে। মানুষের ভূমিচ্যুত রাষ্ট্রচ্যুত হওয়ার থেকে কম বেদনার নয় এই চ্যুতি। দেশ ভাগ স্মৃতিচ্যুত আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষত। বিভক্ত জার্মানি এই ক্ষতের উপসম ঘটিয়ে এক হয়েছে, কারণ তাদের ভৌগলিক সীমান্তের কাঁটাতারে সংস্কৃতির বিভাজন ঘটাতে পারেনি। এই বিভাজনের অনুঘটক ধর্মের পরিচিতিকে সবার উপর তুলে ধরে, যেটা আমাদের বাংলায় করা হয়েছে, চতুর ভাবে। আমাদের বিভাজন রেখা আমাদের মনে স্থায়ী ফাটল হয়ে আছে। তাই আমরা মননের ভূমিতেও চির উদবাস্তু। ব্যক্তি আমি বায়লজিকালি ভারতে জন্মালেও আমার চেতনায় উদবাস্তু স্বত্ত্বার ছায়া বহমান। বহু প্রজন্মের ভিটা থেকে উৎপাটিত মানুষকে একটি সীমান্ত চিহ্ণ দিয়ে উদ্বাস্তু অভিধায় অভিহিত করা হয়। নতুন স্বভূমির স্বপ্নকল্পের মোহে ধর্মীয় পরিচিতির করাল গ্রাসে নিমজ্জিত বাঙ্গালির অধিকাংশ  জনতা সেই ভয়ানক মাহেন্দ্রক্ষণে দেশ ছেড়ে চলে এলেন। কেউ পূব থেকে পশ্চিমে কেউ পশ্চিম থেকে পূবে। চিরকালের মতো উৎখাত হলেন সাত পুরুষের ভিটা থেকে, নিরাপদ দূরত্বের  আসন থেকে চেহারা পালটানো শাসক নির্বিকার চিত্তে এই মহা বিপর্যয় দেখলেন। আর কোটি কোটি বাঙ্গালি উদবাস্তু হয়ে এলেন বা গেলেন। একটা হিসাবে দেখা যাচ্ছে যে প্রায় এককোটি বারো লক্ষ মানুষ পশ্চিম প্রান্তে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন,  ৪৭ লক্ষ হিন্দু ও শিখ পশ্চিম পাকিস্থান থেকে ভারতে আসেন, ৬৫ লক্ষ মুসলমান ভারত থেকে পাকিস্থানে গিয়েছিলেন। ৩৩ লাখ মানুষ পূব প্রান্তে আদান প্রদান হয়েছিলো, এদের মধ্যে ২৬ লক্ষ হিন্দু পূর্ব পাকিস্থান থেকে এসেছিলেন, ৭ লক্ষ ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্থানে আশ্রয় নেন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের,  বাঙ্গালি কোথায় স্থায়ী ঠিকানা হবে, দন্ডকারণ্য নাকি আন্দামান, নাকি সুন্দরবন আথবা এই বাংলাতেই নতুন শেকড় খুজে নেবেন তারা!  উদ্বাস্তু শিবির, রিফিউজি ক্যাম্প থেকে পিলপিল করে অসহায় মানুষ খুজতে থাকলেন মাথা গুজে বাঁচার নুন্যতম আস্থানা। এক ভয়ানক ও হৃদয়বিদারক আখ্যান রচিত হলো কোটি কোটি মানুষের এই প্রব্রজন অভিযাত্রায়। এখনো বেচে থাকা সেই সব মানুষের নিকটস্থ হলে সেই চাপা কথার আওয়াজ শোনা যায়। যে কথা ধরে রেখেছে আমাদের সাহিত্য, আমাদের থিয়েটার, আমাদের চলচ্চিত্র। তবুও প্রকৃত বাস্তবতার তুলনায় তা খুবই নগন্য। বাংলা ও বাঙ্গালির  অধিকাংশের উপর নেমে আসা এই বিপর্যয়ের চিত্র ও অনুভব আমাদের চেতনায় সেভাবে ছাপ রেখেছে কি? নব প্রজন্মের সামনে আজ সেই রক্তস্নাত অতীতের এটাই জিজ্ঞাসা।

ভারতবর্ষকে দ্বিখন্ডিত করার বেশ কয়েক বছর আগে ইউরোপের গ্রিস ও তুরষ্কের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী এক বিপুল সংখ্যক মানুষকে দেশান্তরিত হয়ে উদ্বাস্তু জীবন অতিবাহিত করতে হয়েছিলো। ১৯২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের লুসানে গ্রিক ও তুর্কি জনগনের প্রত্যর্পণ চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী ২০ লক্ষ মানুষ স্থানান্তরিত হন। এই ‘কনভেনশ্যান কনসার্নিং দ্য এক্সচেঞ্জ অফ গ্রিক এন্ড টার্কিশ পপুলেশানস’ অনুযায়ী ১৫ লক্ষ এয়ানাটোলিয়ান গ্রিককে তুরস্ক ছাড়তে হয়, অন্যদিকে ৫ লক্ষ মুসলিমকে গ্রিস থেকে চলে আসতে হয়। এই চুক্তির পেছনে ক্ষমতাশীল শক্তির স্বার্থ ছিলো, দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন জনতা, ধর্মীয় পরিচিতিতে।

ঔপনিবেশিক শাসনের থেকে মুক্তির সোপানে পৌছে যাওয়া  আমাদের এই স্বাধীন ভারতবর্ষই নয়, তথাকথিত উন্নত বিশ্বের লোভের ও আগ্রাসনের পরিণতিতে রাষ্ট্রসীমা ও ধর্মের আধিপত্যকামী আগ্রাসনের বলি হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বভূমিচ্যুত হয়েছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে এক ভয়ানক পাশবিক আবস্থায় দিনযাপন করছেন বা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছেন গোটা বিশ্বেই।  আজকের ডিজিটাল সভ্যতার যুগেও এই ইতিহাস আদিম হিংস্রতার থেকে কম নয়। মধ্যপ্রাচ্য এর নির্মম উদাহরণ। ইরান, ইরাক, সিরিয়া সহ মধ্যপ্রাচ্যে  যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে রাখার নব্য সাম্রাজ্যবাদীদের অবরোধী কৌশল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময় থেকে একের পর এক আভ্যন্তরীণ  সংঘাত, সীমান্ত সংঘর্ষে বিপর্যস্ত এই অঞ্চলের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। অমানবিক এই লড়াই ক্রমাগত প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে, এর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন, হচ্ছেন। দেশ হারানো আতঙ্কিত এই উদবাস্তু স্রোত আজ ইউরোপের দরজায় কাড়া নাড়ছে। জীবন বাজি রেখে লক্ষ লক্ষ মানুষ ছোট ছোট জলযানে করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছেন প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে। ২০১৫ এর প্রথম আট মাসে ইউরোপের দেশগুলোতে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ দেশ ত্যাগ করে প্রবেশ করেছে বলে দাবি করছে তারা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তাদের মানবিক আচরণের উদাহরণ তুলে ধরে বিশ্ব গণমাধ্যমের বেশির ভাগ অংশ জুড়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে।

সমুদ্র সৈকতে বালুর উপর মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা আইলান কুর্দি একটি উদাহরণ মাত্র নয়, একটি প্রতীক, উদ্বাস্তু বিপন্নতার। পশ্চিমি গণমাধ্যমে  আরো একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা তুলে ধরা হয়েছিলো। বুদাপেস্ট থেকে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার মাঝখানের একটি ব্যাস্ততম হাইওয়েতে একটি পরিত্যাক্ত ট্রাক উদ্ধার করা হয়। সেই ট্রাকের মধ্যে গাদাগাদি করে পড়েছিলো ৭১ জন সিরিয়’র মৃতদেহ। দেশ ত্যাগ করে তারা অস্ট্রিয়ায় আসছি্লেন বাঁচবার তাগিদে। ঠিক সেই দিনেই আর একটি খবর প্রকাশিত হয়, লিবিয়ার নৌবাহিনী ভূমধ্যসাগরের থেকে একটি জলযান উদ্ধার করেছে, যার মধ্যে ১০৫ জনের মৃতদেহ পড়ে ছিলো। এই মানুষেরা  নিজেদের জীবন হাতে নিয়ে উপচে পরা নৌকায় ইউরোপের ‘স্বপ্নভূম’এর দিকে রওনা দিয়েছিলেন। শুধু নিরাপদ আশ্রয়ের খোজে দেশ থেকে পালানো ‘উদবাস্তু’ই নয়, তিন বছর আগের হিসাবেই দেখা যাচ্ছে যে সিরিয়ার সীমান্তবর্তী দেশগুলোতে যে সমস্ত উদবাস্তু শিবির করা হয়েছে তাতে ১কোটি ১৬ লক্ষ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।  সংখ্যাটা ইউরোপে আশ্রয় নেওয়া মানুষের থেকে অনেক অনেক বেশী।

রাষ্ট্রসংঘের উদ্বাস্তু সংক্রান্ত বিভাগ UNHCR তাদের প্রতিবেদনে জানাচ্ছে ২০০৫ সালে ৩৭.৫০ মিলিয়ান উদ্বাস্তু সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৪ সালে ৫৯.৫০ মিলিয়ান হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক শিকড় হারানো মানুষের অধিকাংশই ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্থান, ইয়েমেন এবং সিরিয়া থেকে উৎপাটিত মানুষ।  জীবন বাজি রেখে এই বিপুল সংখ্যাক মানুষের ঢল বিশ্ব বিবেকের সামনে এক রূঢ় বাস্তবতা। আমরা দেখবো যে পশ্চিমী  মিডিয়া এই সংবাদ কেবল তথ্য আকারে পরিবেশন করছে, কিন্তু এই সংঘাতের কারণ ও তার নিরসনের ভাবনা কারো মধ্যে নেই। উদাসীন বিশ্ববিবেক সমস্যার শেকড়ে যাওয়ার প্রশ্নে আশ্চর্য নিস্পৃহ।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধত্তর সময়ের একটা পর্বকে ‘এজ অব রিফিউজি’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিলো। ইউরোপ সহ বিশ্বের একটা বিরাট অংশ বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে আয়, ফলে নানা দেশ থেকে উদ্বাস্তুর স্রোতের ঢল নামে। বিশ্বযুদ্ধের পর সেই সমস্যার কিছুটা সমাধান হয়। এরপর ইহুদিদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্র ইজরায়েল গঠনের প্রশ্ন আসে, নানা যায়গা দেখে ও বিচার করে সম্পূর্ণ জাতীস্বত্বার নিরিখে একটি দেশ স্থাপন করা হয়। এর ফলে জন্ম নেয় প্যালাস্টাইন সমস্যা, শরণার্থী  হন অজস্র মানুষ।

এশিয়ায় উত্তর ও দক্ষিণে  কোরিয়ার বিভাজনের ফলে আবার উদ্বাস্তু সমস্যা দেখা দেয়।  এই ‘এজ অব রিফিউজি’র আধ্যায়কে পেছনে ফেলে দিয়েছে মধ্য প্রাচ্যের উদ্বাস্তু স্রোত। ৯/১১ র পর মার্কিন আগ্রাসনের চেহারাটা আরো নগ্ন হয়ে ওঠে। গত এক দশকে তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকায় আটটি যুদ্ধ সংঘটিত হয় ওই অঞ্চলে। প্রতিরোধী সাদ্দাম থেকে শুরু, এর পর একে একে সিরিয়া, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান, ইরান, যুদ্ধের পাশাপাশি তীব্র অনাহার ও বিপর্যয় নেমে আসে।  এসেই আঞ্চলের মানুষের জীবনে। দেশ ছেড়ে পালান লক্ষ লক্ষ মানুষ, অনেকেই অনাহারে মারা যান । হানাহানির যাবতীয় পরম্পরাকে ছাড়িয়ে যায় সিরিয়ার ঘটনা । সিরিয়ায় পশ্চিমী গণ মাধমের তথ্যই জানা যাচ্ছে যে মৃতের সংখ্যা প্রায় তিন লক্ষ। যে সিরিয়া এক সময় ওই অঞ্চলের সমৃদ্ধতম দেশ ছিলো, চার বছর ধরে চলা যুদ্ধে তা আজ নিঃস্ব রিক্ত । আড়াই কোটি মানুষের দেশ সিরিয়ার ৭৬ লক্ষের বেশী মানুষ ভিটেমাটি থেকে উদ্বাস্তু হয়েছেন।

সিরিয়ার আগে মার্কিন দাদাগিরির ফলে জনহত্যার উদাহরণ ইরাক। ১৯৯৯ থেকে ২০০৩, চার বছর ইরাকে মার্কিনী হানাদারি চলে। এর পর আরো ১৩ বছর অর্থনৈতিক প্রতিরোধ, মার্কিন সহযোগী হয় ব্রিটেন, ফ্রান্স, অটালি ও স্পেন। জ্বালানি তেলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মজুত ভাণ্ডার ইরাক। সাদ্দাম হুসেইন সেদেশের তেলের খনি গুলোর জাতীয়করণ করেন। ফলে সাদ্দাম অপসারণ জরুরি ছিলো পশ্চিমী শাসকদের কাছে। পারমানবিক যুদ্ধাস্ত্র ইরাক মজুত করেছে এই অভিযোগে মার্কিনি হানা সেই দেশে, ২০০৩ এর ২০ মার্চ। এর আগে যদিও রাষ্ট্রসংঘ প্রতিনিধিরা সেখানে তদন্তে গেলেও তেমন কোনো প্রমাণ পায়নি। ৭ এপ্রিল ইরাক দখল ও সাদ্দামের ফাঁসি। ২০০৪ সালে সি আই এ জানায় ইরাকে গণ বিধ্বংসী অস্ত্র রাখার খবর ভুল ছিলো। অথচ সেই আগ্রাসী যুদ্ধের তান্ডবের পর শুরু হয় আভ্যন্তরীন সঙ্ঘাত, ইতিহাসের স্বর্ণধ্যায়ের ঐতিহ্য বহনকারী ইরাকে জাতি দাঙ্গার ইতিহাস ছিলো না, যুদ্ধের বিপন্নতা সেই দাঙ্গার আমদানি করলো। ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হতে থাকলো মানুষ, সভ্যতার আঁতুড়ঘরে মানুষ উদ্বাস্তু হতে থাকলো। যুদ্ধ পরবর্তি সময়েই  অভ্যন্তরীণ দাঙ্গার বলি দশ লক্ষ মানুষ, লক্ষ লক্ষ শিশু শিক্ষা অঙ্গনের বাইরে।

সোভিয়েত পতন পরবর্তী বিশ্বের বড়দাদা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার দখলদারি কায়েম রাখতে মরিয়া। এর ফলে প্রত্যক্ষ ভাবে সে যুদ্ধের মদত দিয়ে চলেছে নানা ভনিতায়। তালিবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে আফগানিস্থান, পাকিস্থান অঞ্চলে প্রাণ হারিয়েছেন অজস্র মানুষ। সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহার পরবর্তীকালে আফগানিস্থানের মানুষের সামনে বিপদ আরো ভয়ানক হয়ে দেখা দেয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন।  এক সময় মার্কিন মদতেই জন্ম নিয়েছিলো আল-কায়দা। ১৯৯৬তে উগ্র ধর্মীয় আধিপত্যবাদী তালিবানদের দখলে যায় রাজধানী কাবুল। এই তিন দশকে আফগানিস্থান ছিলো শরণার্থী তালিকায় শীর্ষে। আটের দশকে ৩৫ লক্ষ উদ্বাস্তু ছিলো পাকিস্থানে, ২০ লক্ষ ইরানে। এই শতাব্দীর শুরুতে মার্কিন ভূমিকায় ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্থানে তাঁদের অপারেশান চালায়। আবার উদ্বাস্তুর স্রোত নামে। ১৫ লক্ষাধিক মানুষ দেশ ত্যাগ করে পাকিস্থানে আশ্রয় নেয়, ১০ লক্ষ ইরানে।

গত দশক থেকই পশ্চিম দুনিয়া প্রত্যক্ষ ভাবে ক্ষমতায়নে নাক গলালো সিরিয়ার মতো লিবিয়াতেও। মার্কিনি শক্তির সাথে হাত মিলিয়ে ন্যাটোর অন্যান্য শরিকেরা আক্রমণ হানলো লিবিয়ায়। তছনছ হয়ে গেলো সুন্দর দেশটা। ভূগর্ভস্থ তেল সম্পদের জন্য সমৃদ্ধ এই আফ্রিকান দেশের ২০ লক্ষ মানুষ দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হলেন। এই বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তু আশ্রয় নিলো তিউনিশিয়া, সুদান সহ পার্শ্ববতী দেশগুলোতে। যে দেশের মানুষের গড় আয়ু আফ্রিকার সর্ব্বোচ্চ ছিলো সেই দেশ লিবিয়ার সাড়ে চার লক্ষ মানুষ আজ উদ্বাস্তু হয়ে আস্থানাহীন হলো। ২০ লক্ষ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন তিউনিশিয়ায়। এই মুহুর্তে সুদানে আশ্রয় নিয়েছেন সবচেয়ে বেশি মানুষ। রাষ্ট্রসঙ্ঘের হিসাবেই সেই সংখ্যা ২২ লক্ষ ৫০হাজার।

শুধু আফ্রিকা নয় মার্কিন ও ন্যাটোর যুদ্ধ উন্মাদনার আগ্রাসনের বলি  সাবেক সোভিয়েত ইউক্রেন। ইউরোপের সবচেয়ে উর্বর দেশ ইউক্রেন, আয়োতনে ২য় বৃহত্তম। ইউক্রেনের সংকৃতিও সমৃদ্ধ। সেই দেশের থেকে যুদ্ধ উন্মাদনার বলি হয়ে ২৬ লক্ষ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন রাশিয়ায়।

আমরা মায়নামার সরকারের প্রত্যক্ষ ভূমিকায় জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা উদবাস্তু সমস্যা দেখছি। সেনা বাহিনীর পেশীশক্তির সামনে অসহায় মানবিকতার পতন। যে সু চি’কে শান্তির দূত ভেবেছিলো বিশ্ব সেই সু চি’র সেনা নির্মন হত্যালীলা চালালো সেখানে। লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা জীবন বাজি রেখে স্থল ও জলপথে আশ্রয় নিয়েছে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে। এই রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু আজ একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে সেখানে।

সাম্প্রতিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক ও সামাজিক সমস্যা শরণার্থী সমস্যা মুলত রাষ্ট্র কর্তৃক আগ্রাসী ভূমিকার ফল। লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজ ভূমিচ্যুত হয়ে, শেকড়চ্যুত হয়ে এক অনিশ্চিত আগামীর সামনে, দিশাহীন।

সাম্প্রতিক ভারত

সবশেষে যে জিজ্ঞাসাটা আমাদের সামনে উঠে আসছে তা হলো, আবার কি আমরা, ভারতবর্ষের এই পূর্বাঞ্চলের মানুষ শেকড় চ্যুত হবো? আবার কি বিপন্ন হবে আমাদের সংহতি চেতনা? ধর্মিয় পক্ষপাতদুষ্ট শাসকের হাতে সাধারণ নাগরিকের অধিকার ও জীবন কখনও নিরাপদ থাকেনা। আমাদের দেশেও আজ মানুষের সামনে সেই বিপন্নতা এসেছে।  দেশের উত্তর পূর্বের জন বৈচিত্র ও ভিন্নতা সবচেয়ে বেশি, স্বাভাবিক ভাবেই বিরোধের আগুন ছড়ানোর সুযোগও বেশি । এই বৈচিত্রকেই পাখির চোখ করে ইতিপূর্বে ব্রহ্মপূত্র অঞ্চলে একের পর এক জাতি দাঙ্গা সংঘটিত করানো হয়েছে। সম্প্রতি এই বিরোধের আগুনকে উস্কে দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি। ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট বিদেশিদের চিহ্নিত করার জন্য নাগরিক পঞ্জি নবীকরণের আদেশ দেয়।  আসাম চুক্তিতে লেখা ছিলো ১৯৭১এর ২৪ মার্চের পর যারা এদেশে এসেছেন তারা বিদেশি বলে গণ্য হবেন। এর আগে ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত আসাম আন্দোলনে ওই অঞ্চলের জীবন জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। আসাম চুক্তি উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাসকে পর্ব বিভাজন করেফেলে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগ্রামী অসাম্প্রদায়ীক ঐতিহ্য ফিকে হয়ে গিয়ে সেখানে ভাষা গোষ্টি ও জনগোষ্টির অস্তিত্বের প্রশনকে মূখ্য করে তোলা হয় । ভৌগলিক অবস্থানের কারনে আসাম সহ উত্তর পূর্বে প্রব্রজনের ঘটনা ঐতিহাসিক কাল থেকেই ঘটে চলেছে । হিমালয়ের সীমান্ত অতিক্রম করে আসা মঙ্গলয়েড, বোড়ো জনগোষ্টির বিস্তার, সন্নিহিত অঞ্চলের বাংলা  ভাষাভাষী, দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে আসা অহম জনজাতীর মিলন ক্ষেত্র এই ব্রহ্মপূত্র অববাহিকা । ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও পরবর্তীতে মার্কিন কূটকৌশলে এখানে প্রব্রজন ও ভূমিপুত্রের সংঘাতকে লালন করা হয়েছে। এখানে সেই ইতিহাস চর্চার অবকাশ নেই, শুধু সাম্প্রতিক চেহারাটা তুলে ধরলে দেখা যাবে লক্ষ লক্ষ মানুষকে আবার শেকড়হীন করে উদ্বাস্তু করার কাজ চলছে এবং তা রাষ্ট্রীয় মদতে।  ১৯৭৯ সালে আসাম আন্দোলনের আরম্ভের পর থেকেই বিদেশি বিতরণের দাবী তোলা হয়। ১৯৮৩তে ইন্দীরা গান্ধী আসাম আন্দোলনকারীদের আন্দোলনকে নস্যাৎ করে পার্লামেন্ট ও রাজ্য বিধানসভায় একসাথে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেন। এতে আন্দোলনকারীরা মরিয়া হয়ে ওঠে, ‘বিদেশি’ ছুতোয় আসলে আক্রমণের অভিমুখ গুড়িয়ে দেওয়া হয় বাঙ্গালিদের বিরুদ্ধে। ফেব্রুয়ারীর ১৮ তারিখে এই হিংসা আছড়ে পরে নেলী’তে। এক রাতে ২০০০ র উপর বাংলা ভাষীকে হত্যা করা হয়, দুধের শিশুরাও নিস্তার পায় নি। এদের অধিকাংশ ছিলো বাংলাভাষী ক্ষেত মজুর ও কৃষক। এই সময়ই একে একে সিলাপাথার, মংগলদৈ, ডিগবয় সহ বিভিন্ন যায়গায় হত্যা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।  অভিযোগ যে এই সময় আর এস এস এর প্রভাব এই আন্দোলনের পেছনে সক্রিয় ছিলো ।

১৫ আগস্ট আসাম চুক্তি হয়, ঠিক হয় ২৪ মার্চ ১৯৭১এর পরে আসা মানুষদের বিদেশি বলে চিহ্নিত করা হবে এবং বহিষ্কার করা হবে। আরো একটি ঘটনা এই আন্দোলনের বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় ঘটে, আসামীয়া জাতীয়তাবাদ দুর্বল হতে থাকে, ক্ষমতা বাড়তে থাকে ধর্মীয় রাজনীতির শক্তির। পাশাপাশি কার্বি, বোড় ও অন্য জনজাতিগুলোর স্বাধীকার আন্দোলন প্রসারিত হতে থাকে।

আসাম থেকে যে নতুন ভাবে উদ্বাস্তুর জীবনে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে নাগরিকদের তা নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর নানা স্ববিরোধী ভাষ্য রয়েছে। কিন্তু বাস্তবিকই কত জন বহিরাগত তা নিয়ে সঠিক কোনো তথ্য কারো কাছেই নেই। জাতীয় নাগরিক পঞ্জির নামে এক জটীল ও অবাস্তব গণনার সামনে নাগরিকদের মুখোমুখি করানো হয়। প্রথমে ৪০ লক্ষ মানুষকে তালিকার বাইরে রাখা হয়, দুই দফা তালিকা ঘোষণার পর দেখা যাচ্ছে ১৯ লক্ষ মানুষের জন্য কোনো দেশ নাই, রাষ্ট্রহীন নাগরিক তারা। এদের একটা বড় অংশ হিন্দু ধর্মীয়। এদের ঠিকানা হলো নব্য কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্প ‘ডিটেনশান ক্যাম্প’। এই ‘বিদেশী’দের মধ্যে রোয়েছেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির সন্তান-সন্ততি, কারগিল যুদ্ধের সেনা, বংশপরাম্পরায় এদেশে থাকা অধ্যাপক, চাকুরীজিবী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্যও। কয়েকটি উদাহরণ নিলে বাস্তব চিত্রটা পরিষ্কার হবে । জিয়াউদ্দিন আলি আহমেদ ও তার স্ত্রী বিদেশি বলে চিহ্নিত হয়েছেন, অথচ বংশ পরম্পরায় তারা এদেশে আছে, ৫ম রাষ্ট্রপতির বংশধর। গৌতম পাল, ৫০ বছর বয়স, জন্ম আসামে, সবজি বিক্রেতা, তার ভাই বোনের নাম এন আর সি-তে নাম নেই। কনিষ্ক লস্কর, ৬৫, বিহারে জন্ম, আসামে শিক্ষকতার কারনে আসেন, এখানেই অবসর নেন, উনি ও তার দুই সন্তান তালিকায় জায়গা পাননি। সাফিউদ্দিন আহমেদ, ৩৬, আসামে জন্ম, স্কুল শিক্ষক, সপরিবারে তালিকার বাইরে। এই রকম অজস্র মানুষের জন্য ডিটেনশান ক্যাম্প প্রতীক্ষা করছে। ইতিমধ্যে ৪৭ জন এই ক্যাম্পের আমানবিক পরিবেশে মৃত্যুকে গ্রহণ করেছেন, মৃত্যুর পর প্রমাণিত নথিতে প্রশাসন মানছে  তাঁরা ভারতীয় ছিলেন।

এন আর সি থেকে সি এ সি, বিদেশি চিহ্নিতকরণের নামে এও এক ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি। যে রাজনীতির বলি হয়েছেন সাধারণ মানুষ। আবার লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভূমিচ্যুত করার হৃদয়হীন রাজনীতির পাশা খেলা। বিশ্বের ইতিহাসের রক্তাক্ত  অধ্যায়ে জুড়েছে বাংলা চ্যাপ্টার, সৌজন্যে ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট শক্তি। অশান্ত আসামের মাটিতে  দাঁড়িয়ে একদিন সম্প্রীতির ভাঙ্গা সুতো জুড়তে গান ধরেছিলেন আসাম গর্ব ভূপেন হাজারিকা, ‘সংখ্যালঘু কোনো সম্প্রদায়ের / ভয়ার্ত মানুষের না-ফোটা আর্তনাদ / যখন গুমড়ে কাঁদে / আমি যেন তার নিরাপত্তা হই”। আজ সেই মন্ত্র উচ্চারণে অযুত কন্ঠ গেয়ে উঠুক।