অনুবাদ কবিতা

শরণার্থী বিষাদ

ডব্লিউ এইচ অডেন 

 

অনুবাদ: বঙ্কিম লেট 

 

ধরো, এক কোটি লোক বসত করে এই শহরে

কেউ অট্টালিকায়, কেউ-বা বাস করে কোটরে   

তবু আমাদের কোনও দেশ নেই, প্রিয়, দেশ নেই! 

 

এক সময় আমাদের দেশ ছিল…মনোরম গ্রাম

মানচিত্র খুঁজে দ্যাখো, খুঁজে পাবে আজও তার নাম

সেই দেশে আমাদের প্রবেশ নিষেধ, প্রিয়, প্রবেশ নিষেধ! 

 

রাষ্ট্রদূত বলে টেবিল চাপড়িয়ে কত:   

যদি পাসপোর্ট না থাকে, সরকারীভাবে তোমরা সব মৃত !” 

যদিও আমরা এখনও বেঁচে আছি, প্রিয় , আজও বেঁচে আছি! 

 

আমাদের গ্রামে গির্জা প্রাঙ্গণে একটা পুরানো ইউগাছ আজও বেড়ে ওঠে   

প্রতিটি বসন্তে তাতে নতুন কুসুম ফোটে  

পুরানো পাসপোর্ট, প্রিয়, কুসুম নাহি ফোটায়, কুসুম নাহি ফোটায় !    

 

এক সমিতির কাছে যাই; তারা বসতে দিলেন চেয়ার

 বললেন বিনম্র সুরে ,আসছে  বছর  আসুন আবার      

কিন্তু আমরা আজ, প্রিয়, কোথায়-বা যাই ? কোথায়-বা যাই ! 

 

প্রকাশ্য সভায় দেখি, মঞ্চে উঠে বললেন বক্তাটি : 

যদি থাকতে দিই, ওরা চুরি করবে আমাদের রোজকার রুটি !” 

ওঁর বাণ তোমাকে আর আমাকে, প্রিয়, তাক করে ছোড়া !     

 

 

আমি ভেবেছিলাম হয়তো আকাশে আকশে বজ্রের ধ্বনি  

ইউরোপ জুড়ে হিটলার হাঁকে, “ওরা অবশ্যই মরবে জানি!

হায়, প্রিয়, আমরা ওঁর হৃদয়ে ছিলাম,ওঁর হৃদয়ে ছিলাম ! 

 

পিন-আঁটা জামা পরা, দেখি, এক কুকুর লোমওয়ালা 

দেখি, বেড়াল এক ভিতরে এল, দরজা ছিল খোলা

কিন্তু ওরা কেউ, প্রিয়, জার্মান ইহুদী  ছিল না, ইহুদী ছিল না !  

 

পোতাশ্রয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম জেটির উপরে 

দেখলাম মাছেরা সাঁতার কাটছে ওরা স্বাধীন 

দশ ফুট দূরে, প্রিয় শুধু দশ ফুট দূরে 

 

বনের ভিতর হাঁটি, দেখি গাছে গাছে পাখি 

ওরা সুখে গান গায় পাখিদের রাজনীতিক নাই

ওরা কেউ, প্রিয় মোর, মনুষ্য নয়, মনুষ্য নয় ! 

 

স্বপ্নে দেখি সহস্র মেঝেওয়ালা বাড়ি 

হাজারটি জানালা, হাজার দুয়ারী 

কিন্তু সে-সব একটিও, প্রিয়, আমাদের নয়, আমাদের নয় ! 

 

তুষারপাতের ভিতর বিস্তীর্ণ সমতলে  দাঁড়াই 

দশ হাজার সেনানী  এদিক-ওদিক ছোটে 

তোমাকে আর আমাকে, প্রিয়, ওরা খুঁজে বেড়ায়, প্রিয়, খুঁজে বেড়ায় ! 

 

   

 

 

 

জ্বলন্ত শহরে লীলাসঙ্গীত 

ওসেন  ভুয়ং

 

অনুবাদ: বঙ্কিম লেট 

 

(দক্ষিণ ভিয়েতনাম, এপ্রিল ২৯,১৯৭৫ : সাইগন (বর্তমানে হো চি মিন সিটি) আক্রমণের সময় সেনাবাহিনির রেডিও আরিভন বারলিন-এর হোয়াইট ক্রিসমাসগানটি বাজিয়েছিল অপারেশন ফ্রিকোয়েন্ট উইন্ড’-এর  সংকেত-বার্তা হিসেবে। অপারেশন ফ্রিকোয়েন্ট উইন্ড’-এর উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকান নাগরিক এবং ভিয়েতনামি উদবাস্তুদের হেলিকপ্টারে করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া)       

 

 

ছাতিম ফুলের পাপড়ি রাস্তায় ছড়ানো  

কিশোরীর পোশাকের টুকরোর মতো।  

 

উজ্বল হোক দিন,খুশির হোক দিন…’   

 

যুবকটি পেয়ালায় শ্যাম্পেইন ঢেলে

 মেয়েটির ঠোঁটের কাছে তুলে ধরে।  

বলে, “খোলো”  

                  মেয়েটি ঠোঁট খোলে ।  

                                                 

 বাইরে, একজন সৈনিক সিগারেটটা ছুড়ে ফেলল     

চকবাজার যেই আকাশ থেকে পাথর পড়ার মতো

পদধ্বনিতে ভরে গেল।  

সবার ক্রিসমাস       

সাদা হোকওই ট্র্যাফিক  পুলিশটির মতো 

যিনি বন্দুকের খাপ খুলছেন।   

                                                      

মেয়েটির সাদা পোশাকের প্রান্তে

 যুবকটি  হাত বোলাচ্ছে। 

 

 যুবকটির চোখ কালো ।

                          মেয়েটির চুল কালো ।

                                      একটাই মোমবাতি 

  তাদের দুজনের ছায়া : দুটো পলতে । 

 

মোড়ে একটা মিলিটারি ট্র্যাক ছুটে যাচ্ছে

ট্র্যাকের ভিতর শিশুগুলো    

                             ভয়ে চিৎকার করছে। 

একটা সাইকেল ছিটকে  পড়ল  

একটা দোকানের জানালার ভিতর ।  

ধুলো উড়ছে,

রাস্তার কালো একটা কুকুর হাঁপাচ্ছে।  

ওর পিছনের পা দুটো   

                         থেঁতলে লেপ্টে গেছে 

      ‘সাদা ক্রিসমাসেরজৌলুসের উপর।

 

বিছানার পাশে টেবিলে ম্যাগ্নলিয়ার মঞ্জরি ফুটছে

 যেন প্রথমবার কোনও গোপন কথা শুনে ফেলেছে ।

 

গাছের মগডাল ঝিকমিক করে আর শিশুরা শোনে’, 

পুলিশের বড়কর্তা 

মুখ থুবড়ে পড়ে আছে রাস্তায়,

চাপ-চাপ কোকাকোলায়।      

তার বাবার ছবি, হাতের তালুর মতো ছোট  

                      তার বাঁ কানের পাশে ভিজে যাচ্ছে। 

 

গানটি বিধবার মতো শহরে চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে।  

               ‘একটা সাদা… একটা সাদা…আমি স্বপ্ন দেখছি

 তুহিন আলোয়ানের

                                             

 যেটা ওই বিধবার ঘাড় থেকে খসে পড়ছে।   

 

জানালায় চড়বড় করছে তুষারপাত।                                                                     

  গোলাগুলিতে  ছিন্নভিন্ন বরফ   

 রক্তিম আকাশ। 

বোমারু-যানের ফিতের হিম ছিটকে ছিটকে লাগছে 

                     শহরের দেয়ালগুলোতে। 

 

একটা হেলিকপ্টার 

নাগালের বাইরের মানুষগুলোকেও তুলে নিচ্ছে।  

 

শহর এতই সাদা যে কালির আঁচড়ের জন্যে প্রস্তুত।

                                                    

 রেডিও বলছে, পালাও  পালাও পালাও।

 

একটা কালো কুকুরের উপর ছাতিম ফুলের পাপড়ি 

 কিশোরীর ছিন্নভিন্ন পোশাকের মতো 

 

উজ্বল হোক দিন, খুশির হোক দিন। মেয়েটি কিছু বলছে,  

কিন্তু ওরা দুজনেই শুনতে পাচ্ছে না। 

ওদের হোটেলের ভিত্তিভূমি কাঁপছে ।বরফের বিছানা 

                                                  ভাঙছে ।

 

প্রথম বোমাটা দুজনের মুখ আলোকিত করল;

যুবকটি বলে, “চিন্তা করো না ,  

আমার ভাইরা যুদ্ধে জিতেছে

                                আর আগামী কাল…

                          

                               সব বাতি নিভে গেল।

 

আমি স্বপ্ন দেখছি । আমি স্বপ্ন দেখছি…

 শুনছি স্লেজ-ঘণ্টি তুষারে তুষারে বাজছে …

 

নীচের চকবাজারে : একজন নান  পুড়তে ,পুড়তে      

 নীরবে ছুটছে তার ঈশ্বরের দিকে

 

যুবকটি বলে, “ঠোঁট খোলো!”  

                             মেয়েটি ঠোঁট খোলে