প্রবন্ধ

 

‘আমি অপেক্ষা করছিলাম বইটা আপনাকে দিয়ে যাবো বলে’

সুদীপ বসু

 

 

 

           আধুনিক মার্কিন সাহিত্যের অভিনব ঘরাণার ডাকসাইটে ঔপন্যাসিক পল অস্টারের প্রথম উপন্যাসটির (সিটি অফ গ্লাস) জন্ম হয়েছিল একটি নিরীহ নির্ভেজাল ফোনকল থেকে। তাও আবার ভুল নম্বরে। তাঁর ব্রুকলিন শহরের বাড়িতে। ১৯৮০-এর  বসন্তের এক শেষবিকেলে।

যিনি ফোন করেছিলেন তিনি খুব সাদামাঠাভাবে জিজ্ঞেস করলেন এটি পিঙ্কারটন এজেন্সির (একটি বিখ্যাত মার্কিন গোয়েন্দা এজেন্সি) অফিস কিনা। পল অস্টারও খুব স্বাভাবিকভাবে জবাবে বললেন ‘না’ এবং ফোন রেখে দিলেন। ডুবে গেলেন লেখার কাজে। পরের দিন বিকেলে ঠিক ওই সময়ে আবার ফোন। একই কন্ঠস্বর। একই ভুল নম্বরে। একই প্রশ্নঃ ‘পিঙ্কারটন এজেন্সির অফিস? এটা কি পিঙ্কারটন এজেন্সির অফিস?’ পলের দিক থেকে উত্তরও একই। কিন্তু ফোনটা রেখে দিয়ে তিনি যখন আবার লেখায় মন দিতে যাবেন হঠাৎ তাঁর মনে হল যদি আমি হ্যাঁ বলতাম! যদি বলতাম হ্যাঁ আমি পিঙ্কারটনেরই একজন দুঁদে গোয়েন্দা! যদি কেসটা হাতে নিতাম! তাহলে হয়তো জীবনের ঘটনাপরম্পরা আমূল পাল্টে যেত। সিদ্ধান্ত নিলেন এর পরেরবার ফোনটা এলে সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।

কিন্তু ফোনটা আর কোনদিনই এল না। কেবল একটা স্থায়ী ছাপ রেখে গেল মনে। একটা সম্ভাবনা রেখে গেল। একবছর পর যখন অস্টার ‘সিটি অফ গ্লাস’ লিখতে বসলেন তদ্দিনে এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনাটা অন্য রূপ পেয়ে গেছে তাঁর মাথার ভিতরে। এবং একটা গল্পের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। গল্পটা এরকম – কুইন নামে একজন লোক একদিন একটি ফোনকল পেল। অচেনা কন্ঠস্বর পল অস্টারের খোঁজ করছে। প্রাইভেট ডিটেকটিভ পল অস্টার। বাস্তব ঘটনার মতোই কুইন (Quinn) বলল যে নম্বরটা ভুল। পরের রাতে-ও একই ফোন এল। একই জবাব দিল কুইন। কিন্তু তৃতীয় রাতে সে খেলাটা ধরে ফেলল। গম্ভীর গলায় পরিচয় দিল হ্যাঁ সে-ই পল অস্টার। আর এই বিন্দু থেকেই এই বিখ্যাত উপন্যাসটি তাজ্জব বাঁক নিল। উপন্যাস তো এগিয়ে চলল তার নিজের তাড়নায়, উন্মাদনায়, জটিল রহস্যময় পথে। এবং শেষও হ’ল একদিন। এরপর বেশ কিছু সময় কেটে গেছে। অস্টার তখন অন্য লেখার কাজে হাত দেওয়ার জন্য পড়াশুনায় তথ্যানুসন্ধানে ব্যস্ত। এমন সময় একদিন তাঁর কাছে হঠাৎ একটি ফোন এল, কুইনের খোঁজ করে। চমকে গেলেন অস্টার। কুইন তো তাঁর প্রথম উপন্যাসের চরিত্র। জিজ্ঞেস করলেন কুইন বানানটা বলুন তো। অর্থাৎ কোন কুইনকে চান Quinn না Queen? ফোনের কন্ঠস্বর স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল সে কুইনকেই (Q-u-i-n-n) চায়। আকস্মিক ভয়ে-দ্বিধায় অপ্রস্তুত অস্টার ‘রং নাম্বার …. এখানে ও নামে  কেউ থাকে না’ বলে ফোন কেটে দিলেন। শিহরণ খেলে গেল তাঁর সারা শরীরে।

কেবল এই একটিই নয় এমন আশ্চর্য সমাপতন (নাকি দৈবঘটনাচক্র) তাঁর জীবনে অনেকবারই ঘটেছে। আরো বেশি ঘটেছে তাঁর চেনাপরিচিত বা বন্ধুদের জীবনে। সেসব চমকদার কাহিনী সবিস্তারে লিখে-ও রেখেছেন তিনি।

আর একটি গল্প (সত্যি ঘটনা) তাঁর এক বন্ধুকে জড়িয়ে। বলা ভাল, ওই বিশেষ বন্ধুত্বকে জড়িয়ে। বন্ধুটির নামের আদ্যাক্ষর ‘জে’। অস্টার লিখছেন তাঁর সারা জীবনের গাড়ি চালানোর ইতিহাসে মাত্র চারবার চাকা ফেঁসে গেছে (তা-ও আট-ন’ বছরের পরিসরে এবং তিনটি আলাদা আলাদা দেশে) এবং প্রত্যেকবারই গাড়িতে তাঁর সওয়ারি ছিলেন এই বন্ধু ‘জে’। প্রথমবার, তখন তাঁরা ছাত্র, বাবার স্টেশনওয়াগনটা নিয়ে দুজন বেরিয়েছিলেন ঘুরতে। শীত শেষ। কেবেক অঞ্চলে সবে পৌঁছেছেন। টায়ার গেল ফেঁসে। তবে সেবার সঙ্গে আপৎকালীন ব্যবস্থা থাকায় তেমন সমস্যা কিছু হয়নি। কিন্তু সত্যিকারের সমস্যা হ’ল ওইদিনই ঘন্টাখানেকের ভেতর দ্বিতীয় টায়ারটি ফেটে যাওয়ায়। সেই কুয়াশাচ্ছন্ন শৈত্যের ভেতর অপেক্ষা করতে হ’ল ঘন্টার পর ঘন্টা।

এর পর চার পাঁচ বছর কেটে গেল। অস্টার তখন প্রথমা স্ত্রী লিডিয়া ডেভিসের (ছোট গল্পের বিষ্ময় প্রতিভা) সঙ্গে ফ্রান্সে থাকেন। একটা বড় বাড়ির কেয়ারটেকারের কাজ নিয়ে অবিশ্বাস্য দারিদ্র্যের ভেতর দিন গুজরান করছেন। এমন সময় সেই পুরানো বন্ধু ‘জে’ এসে উঠলেন তাঁদের বাড়ি। সন্ধ্যে নাগাদ দুই বন্ধু বেরিয়েছেন গাড়ি নিয়ে। ফেরার পথে, ঘোর সন্ধেবেলা, মিশকালো শহরতলির রাস্তা ধরে চলতে চলতে আবার, আবার সশব্দে টায়ার বিস্ফোরণ। অবাক হলেও এই ঘটনাটিকে কাকতালীয় বলেই মেনে নিলেন অস্টার। কেবল একমাত্র ‘জে’-এর উপস্থিতিতে বারবার এই বিপত্তির সঙ্গে বন্ধুবিচ্ছেদের কোনও কষ্টকল্পিত সম্পর্ক আছে কিনা (একটা প্রচলিত কুসংস্কার) এমন সন্দেহের ছায়া একঝলকের জন্য খেলে গেল তাঁর মনে। শেষ ঘটনাটি ঘটল আরো চার বছর পর। তখন তিনি স্ত্রী লিডিয়া ও ছেলে ড্যানিয়েলের সঙ্গে নিউ ইয়র্কে থাকেন। ‘জে’ বেড়াতে এসেছিলেন। রাতের খাবার কিনতে ‘জে’-কে পাশে বসিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়েছেন মাত্র। গাড়িটা তখনও বড় রাস্তায় ওঠেনি, সশব্দে টায়ার ফেঁসে গেল। পল অস্টার জানাচ্ছেন, নিছক সমাপতন কিনা কে জানে, এর পর থেকেই ‘জে’-এর  সঙ্গে তাঁর দেখাসাক্ষাৎ ক্ষীণতর হতে লাগল। একসময় দশ বছরেও একবারও দেখা হল না। একসময় কারোর ফোন নম্বর-ই আর কারোর মনে রইল না। মনে রাখার ইচ্ছেটুকু-ও রইল না।

এবার আরেকটি গল্প। সমাপতনের। ছোট্ট  কিন্তু আশ্চর্য। এ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অস্টারের এক প্রিয় বন্ধু ‘আর’। তাঁর মুখেই শোনা। বন্ধুটি একটি বিশেষ বইয়ের খোঁজ করছিলেন বেশ কিছুদিন ধরে। হানা দিচ্ছিলেন বিভিন্ন চেনাপরিচিতের বাড়িতে, লাইব্রেরিগুলিতে পাগলের মতো সংগ্রহ করছিলেন ক্যাটালগ। দিবারাত্র ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন এক বইয়ের দোকান থেকে অন্য আর এক বইয়ের দোকানে। বইটির অনুসন্ধান একসময় উন্মাদনার পর্যায় পৌঁছে যাচ্ছিল। ঠিক এই সময় ঘটনাটি ঘটল। সেদিন বিকেলবেলা বন্ধুটি গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনের ভেতর দিয়ে শর্টকার্ট করে ভ্যান্ডারবিল্ট অ্যাভেনিউমুখী সিঁড়ির ধাপ বেয়ে উঠছিলেন হঠাৎ নজরে এল মার্বেলের রেলিঙে হেলান দিয়ে একটি মেয়ে ওই চরম ব্যস্ততার মধ্যেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে একটা বই পড়ছে এবং কাকতালীয়ভাবে বইটি বন্ধু ‘আর’-এর খোঁজের বইটি থেকে আলাদা কিছু নয়। ‘আর’ এতটাই ঘাবড়ে গেলেন যে তিনি সরাসরি অচেনা মেয়েটিকে বলেই বসলেন ‘ম্যাডাম, যদি কিছু মনে না করেন, বিশ্বাস করুন, এই বইটাই আমি সব জায়গায় হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি। ’

মেয়েটি কিন্তু ঘাবড়াল না। বলল ‘অসাধারণ বই। আমি এইমাত্র পড়া শেষ করলাম।’

বলতে পারেন এই বইটা কোথায় কিনতে পাবো? এ বইটা আমার জীবনের অনেক কিছু। বিশ্বাস করুন। ’ বন্ধুটি বললেন।

‘এই কপিটা তো আপনার জন্যেই।’ মেয়েটি বলল।

‘কিন্তু এটা তো আপনার কপি।’

‘ছিল। হ্যাঁ আমার কপি ছিল।’ মেয়েটি খুব শান্ত গলায় কেটে কেটে বলল। ‘কিন্তু এখন তো আমার পড়া শেষ হয়ে গেছে। আমি এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম বইটা আপনাকে দিয়ে যাবো বলে।’

এবার অস্টারের নিজের জীবনের একটা তাজ্জব-করে-দেওয়া ঘটনা শোনাই। তাঁর শ্যালিকা তখন গিয়েছিলেন তাইওয়ান। চিনাভাষা শেখার লোভে। জীবিকা হিসেবে তিনি তাইপেই-এর অধিবাসীদের ইংরেজি শেখাতেন। তখন-ও অবশ্য অস্টারের বিয়ে হয়নি। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী সিরি তখন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। একদিন তাঁর শ্যালিকার সঙ্গে তাঁর এক মার্কিন বান্ধবীর কথাবার্তা হচ্ছিল। এই বান্ধবীটিও তাইপেই এসেছিলেন চিনাভাষা শিখতে। কথপোকথনটি এইরকমঃ

শ্যালিকা        –    ‘আমার বোন নিউ ইয়র্কে থাকে।’

বান্ধবী            –    ‘আমারও।’

শ্যালিকা        –    ‘আমার বোন থাকে আপার ওয়েষ্ট সাইডে।’

বান্ধবীটি         –    ‘আমারও।’

শ্যালিকা        –    ‘আমার বোন থাকে আপার ওয়েস্ট সাইডের ৩০৯ নং রাস্তায়।’

বান্ধবী            –    ‘বিশ্বাস করো। আমার বোন-ও ওখানেই থাকে।’

শ্যালিকা        –    ‘ও থাকে ৩০৯ নং রাস্তার ১০৯ নং বাড়িতে’।

বান্ধবী            –    ‘আশ্চর্য আমার বোনও তো ও বাড়িতেও ….’

শ্যালিকা        –    ‘আমার বোন থাকে তিনতলায়।’

বান্ধবী            –    (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) ‘আমি জানি ব্যাপারটা পাগলামির দিকে চলে যাচ্ছে কিন্তু আমার বোন-ও ও বাড়ির তিনতলাতেই থাকে।’

অস্টার   অবাক হয়েছেন এই ভেবে যে তাইপেই-তে যখন দুটি স্বল্পপরিচিতা মেয়ে নিজেদের বোনেদের নিয়ে অবাক আলোচনায় মগ্ন, তখন সম্পূর্ণ অজান্তে, পৃথিবীর অপর পারে, অন্তত দশ হাজার মাইল দূরে, একই শহরের, একই রাস্তার, একই গলির, একই বাড়ির, একই তলায় দুটি ভিন্ন ঘরে সেই দুই পরস্পরপরিচিতিবিহীনা বোন হয়তো ঘুমিয়ে কাদা। তাঁরা জানেনই না পৃথিবীর অপর প্রান্তে এই আশ্চর্য সমাপতন তাঁদের দুই দিদিকে কেমন বুরবাক বানিয়ে দিয়েছে।

লিডিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় ১৯৭৪-এ। ১৯৭৭-এ ছেলে ড্যানিয়েলের জন্ম। ১৯৭৮-এ লিডিয়ার সঙ্গে সব সম্পর্কের অবসান ঘটে। সে যা হোক যে ঘটনার কথা বলছি সেটার সময় আনুমানিক ১৯৮০। ছিন্ন সম্পর্ক কিন্তু দুজনেই থাকেন ব্রুকলিনে। কয়েকটা বাড়ির ফারাকে। ছেলে ড্যানিয়েল কখনো বাবার কাছে কখনো মা’র কাছে থাকে। একদিন ভোরবেলা অস্টার লিডিয়ার বাড়ির নীচে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন ছেলে ড্যানিয়েলকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে স্কুলে পৌঁছে দেবার জন্য। তাঁর স্পষ্ট মনে আছে সেই দৃশ্য। হঠাৎ দোতলার একটা জানলা খুলে গেল। দেখলেন লিডিয়া গরাদ দিয়ে মাথা গলিয়ে তাঁকে কিছু একটা কিনে আনবার আদেশ দিয়ে একটা মুদ্রা (ডাইম) ছুঁড়ে দিলেন ওপর থেকে। মুদ্রাটি হাওয়ায় পাক খেতে খেতে নীচের দিকে পড়তে পড়তে হঠাৎ গাছের ডালে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল মাটিতে আর অদৃশ্য হয়ে গেল। নীচু হ’য়ে গাছপালা শিকড়বাকড় ইটপাথর সরিয়ে অস্টার অনেক খুঁজলেন ডাইমটিকে, কিন্তু সে চিরতরেই হারিয়ে গিয়েছে। সেদিনই বিকেলবেলা এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে শ্যে স্টেডিয়ামে মরশুমের প্রথম বেসবল টুর্ণামেন্ট দেখতে গেছেন অস্টার। বন্ধুটি গেছেন টিকিট কিনে আনতে। তিনি মাঠ থেকে একটু দূরে একটা জনহীন ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে সবে একটা সিগারেট ধরিয়েছেন, হঠাৎ চোখে পড়ল অদূরেই পায়ের কাছে একটা মুদ্রা (ডাইম) পড়ে আছে। ডাইমটি কুড়িয়ে নিলেন অস্টার। পকেটে পুরলেন, এবং প্রায় অকারণেই কোনও যুক্তিবুদ্ধির রেয়াত না করেই একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে এটি সেই সাত সকালের হারিয়ে যাওয়া ডাইম, তাঁকে অনুসরণ করতে করতে এতদূর এসেছে।

এবারের গল্পটা যুদ্ধের। অন্তত যুদ্ধকেন্দ্রিক। দিশাহীন অস্ত্রচালনা মানুষের জীবনে যে বিপন্নতা ডেকে আনে তার হাত থেকে এক ব্যক্তিমানুষের অলৌকিক রেহাইয়ের গল্প – একবার নয় বারবার। সময়সারণি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ তিন চার মাস। পটভূমি যুগোশ্লাভিয়া। গল্পটা পল অস্টার শুনছেন এক বন্ধুর মুখ থেকে।

বন্ধুটির কাকা ছিলেন সার্বিয়ান সৈন্যবাহিনীর সদস্য, যাঁরা বীরবিক্রমে নাৎসি শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। একদিন ভোরবেলা জার্মান সৈন্যরা ঘেরাও করল তাঁদের আর সরাসরি চালান করে দিল সুদূর একটি পরিত্যক্ত খামারবাড়িতে। চারদিকে ধূধূ বরফের রাজত্ব আর মর্মান্তিক তুষার। তাঁরা নিজেদের ভেতর শলাপরামর্শ করে ঠিক করলেন পরিণতি যাই হোক তাঁরা একদিন খামারবাড়ির দরজা ভেঙে পালাবেন। একজন একজন করে, লটারিতে অস্টারের বন্ধুর কাকার নাম এল তিন নম্বরে।

কথামতো পরদিন সকালে প্রথমজন দরজা ভেঙে তুষারপ্রান্তরের ভেতর মরিয়া দৌড় লাগাল। হঠাৎ মেশিনগানের আওয়াজ উঠল। অলক্ষ্যে থাকা চৌকিদারদের বুলেট ছিন্নভিন্ন করে দিল প্রথমজনকে। তা সত্ত্বেও দ্বিতীয়জন পালাতে গেল। আবার মেশিনগানের দিগন্তকাঁপানো শব্দ। আবার বুলেট বৃষ্টি। দ্বিতীয়জনও মাঝরাস্তায় লুটিয়ে পড়ল। তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে বন্ধুটির কাকা অবধারিত মৃত্যুর মুখোমুখি খামারবাড়ি থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এলেন। ছুটতে শুরু করলেন বরফঢাকা রাস্তা ধরে। হঠাৎ পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা। তারপর সারা শরীর জুড়ে প্রচন্ড গরম একটা অনুভূতি। তারপর চরাচর অন্ধকার করে জ্ঞান হারানো।

যখন জ্ঞান ফিরল তখন টের পেলেন তিনি একটা কৃষকের গাড়ির ভেতর শুয়ে আছেন। গাড়িটা একটা ঘোড়া অথবা গাধা টেনে নিয়ে চলেছে। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখতে পেলেন একটা মানুষের মাথার পিছনদিক। কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়েছেন কি তাকাননি হঠাৎ একটা জোরালো বিস্ফোরনের শব্দ হল আর মাথাটা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উড়ে গেল। হ্যাঁ উড়েই গেল। যেখানে পিছন দিক থেকে একটা গোটা মানুষকে দেখা যাচ্ছিল সেখানে দেখলেন একটা মুন্ডুহীন ধড় গাড়ির আসনে বসে আছে। গাড়িটা চলছে। বিস্ফোরণের শব্দ বাড়তে লাগল। আর কিছুক্ষণের মধ্যে শতশত মানুষের কোলাহলে চারদিক যেন ভরে গেল। জিপগাড়ি, যুদ্ধের ট্যাঙ্ক আর রুশ সৈন্যে যেন উপচে পড়ছে জায়গাটা। একজন রুশ কমান্ডার ঘোড়ার গাড়িটার কাছে এগিয়ে এসে বন্ধুটির কাকার রক্তাপ্লুত পা-টা দেখে আঁতকে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে অস্থায়ী হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে সেই ঘুপশি ঘরে, আর্মিডাক্তার পা-টা পরীক্ষা করে জানালেন এক্ষুনি ওটি কেটে বাদ দিতে হবে। কাকা ভদ্রলোক চিৎকার করে উঠলেন, ‘পা কাটবেন না। আর যাই করুন দয়া করে আমার পা কাটবেন না।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা। কয়েকজন মিলে তাঁকে বিছানায় চেপে ধরল আর রুশ ডাক্তার যন্ত্রপাতি নিয়ে তাঁর পায়ের চামড়াটা ছাড়াতে সবে উদ্যত হয়েছেন সেই মূহুর্তে কাছেই কোথাও আবার একটা প্রচন্ড বিস্ফোরণ হ’ল যার জেরে গোটা বাড়িটাই ছাদ থেকে ভেঙে পড়ে ধুলিস্যাৎ হ’য়ে গেল।

এবারে-ও মৃত্যু-ই অনিবার্য ছিল কিন্তু পল অস্টারের বন্ধুর সেই কাকা এবারও নিশ্চিন্তে জেগে উঠলেন একটা পরিচ্ছন্ন ঘরের শ্বেতশুভ্র বিছানায়, এক পরমাসুন্দরী নার্সের সাহচর্যে। মেয়েটি তাঁকে স্যুপ খাইয়ে দিচ্ছিল। আর তাঁর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি হাসছিল। পায়ে হাত দিয়ে তিনি দেখলেন তাঁর সেই বুলেটবিদ্ধ পা-টি অটুট রয়েছে। যন্ত্রণাও আর তেমন নেই। এত ঝঞ্ঝার পর এভাবে নিজেকে খুঁজে পেয়ে তিনি ভাবলেন হয়তো স্বর্গের-ই কোনও জাদুকক্ষে তাঁর পুনর্জাগরণ হয়েছে।

‘প্রিয় রবার্ট, তোমার ১৫-ই জুলাই এর (১৯৮৯) চিঠিটির উত্তরে এটুকুই শুধু বলার যে অন্যান্য লেখকদের মতোই আমি আমার লেখা নিয়ে মাঝে মাঝেই এমন চিঠি পাই।’ এই চিঠিটির-ই পরবর্তী অংশে অত্যন্ত কঠিন ভাষায়, জটিল বাক্যগঠনে, ফরাসী দার্শনিকদের উদ্ধৃতি ব্যবহার করে, নিজের প্রতি শীর্ষচুম্বী উচ্চধারণা ও আত্মতৃপ্তি প্রকাশের ভেতর দিয়ে পত্রলেখক সমসাময়িক উপন্যাস সম্বন্ধে তাঁর একটি কলেজপাঠ্য বই সম্পর্কে ওই জনৈক রবার্টের স্বাধীন চিন্তাভাবনার প্রভূত প্রশংসা করেছেন। এই চিঠিটির প্রাপকের নাম রবার্ট মরগ্যান, সিয়াটেল, ওয়াশিংটন। কিন্তু ওই ঠিকানায় কোনও রবার্ট মরগ্যানের হদিশ না পেয়ে চিঠিটি নিয়মানুযায়ী ফেরৎ আসে প্রেরকের ঠিকানায়, যেটি আশ্চর্যজনকভাবে পল অস্টারের বাড়ি। আশ্চর্যজনক এই কারণে বললাম, যে চিঠিটি পেয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা গালে হাত দিয়ে চিন্তা করেও অস্টার মনে করতে পারলেন না কবে কোন কালে তিনি এই চিঠি লিখেছিলেন। চিঠি খুলে বোঝা গেল যে এই চিঠিটা কখনোই তাঁর লেখা নয় কেননা ওই ভাষা বা ভঙ্গীমা তাঁর নয়। ওই বিষয়টা-ও তাঁর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক নয় এবং সবচেয়ে বড় কথা হাতের লেখাটাই তাঁর নয়। তবে হ্যাঁ শাদা লম্বাটে খামের মাথায় বাঁদিকে বসানো প্রেরকের ঠিকানাটা তাঁর-ই, হাতে লেখা নয়, কাগজের ওপর টাইপ করে সেঁটে দেওয়া। বোঝা গেল কেউ একজন খামখেয়ালে-ই হোক বা মজা করেই কোনও মনগড়া রবার্ট মর্গ্যানের মনগড়া ঠিকানায় চিঠিটি পাঠিয়ে আসলে সেটা তাঁকেই পৌঁছে দিয়েছে। উদ্দেশ্য বোঝা গেল না, বিরক্তিরও উদ্রেক করল। কিন্তু এই চিঠিটি সারাজীবন কাছছাড়াও করতে পারলেন না অস্টার।

এমনই আজব ঘটনায় ভরা তাঁর জীবন। কখনো প্রত্যক্ষভাবে কখনো চোরাপথে তাঁর লেখাতেও ছায়া ফেলেছে তারা। আর তাঁর চিন্তার দুনিয়াকে করে তুলেছে অনন্য। অননুকরণীয়। কিন্তু ঘটনাগুলো আসলে কী দৈবযোগাযোগ নাকি নিয়তি নির্দেশ নাকি স্রেফ কাকতালীয় ব্যাপার স্যাপার।

সে যাই হোক, চমকদার তো বটেই। এবং বেশ মজাদার।