সাক্ষাৎকার

“কবিতা বিষয় ছেড়ে মূর্ছনার দিকে চলে যাক ধীরে ধীরে”

সত্তরের বলিষ্ঠ কবি মলয় গোস্বামী’র সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবিতা আশ্রমের প্রতিনিধি তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়

আজও এত বছর বয়সেও, এত লেখার পরেও আপনি নিয়মিত লেখেন। এই বয়সেও গান গান, ছবি আঁকেন প্রবল উদ্যমের সঙ্গে। এত লেখার, শিল্পযাপনের রসদ কোথা থেকে আসে? বয়সের কারণে একটুও ক্লান্তি কি গ্রাস করে না?

মলয় গোস্বামী: আসলে লেখার আনন্দই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমি তো জানি, আমি আর কিছুই পারি না, কেবল লেখা ছাড়া, তাই লিখি। মনের আনন্দেই লিখি। এই যে আনন্দ, একটা লেখার আনন্দ, আনন্দের যে বিপুল শক্তি, এটাই তো আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ‘মাথা ঘোরে, চারিদিকে কাকপক্ষি ওড়ে।’ এটা লিখলাম তো, লিখেও আমার আনন্দ হল। ধর, বাড়ি থেকে বলল বাজারে যেতে,  আমি বললাম, একটু লিখছি, লিখেই যাব। আর লিখতে লিখতে বাজারের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, বাড়িতে এই নিয়ে চেঁচামেচি। ঘরের সবাই বলছে, কী সব লেখো! আমি ওসব নিয়ে ভাবছিই না। আমার আনন্দ হচ্ছে একটা লেখা লিখতে। ভালো লাগছে এটা বলতে যে লিখলে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি এসে আমাকে পূর্ণ করে দিচ্ছে। অনেক রাতে সবাই ঘুমোলে আমি টর্চ জ্বেলে লিখছি। লিখতে লিখতে ঘুমিয়ে পড়লাম হয়ত। আর সকালে জেগে উঠেই আমি গত রাত্রের লেখার খাতা খুলি। ‘রাত্রে যা কালো লিখি দিনে দেখি সাদা।’ দেখি, রাত্রে যা লিখলাম, সকালে, দিনের আলোর সামনে কেমন দেখাচ্ছে, একটু দেখি তো! এইটুকুই লেখার আনন্দ। এটুকুই আমাকে বাচিয়ে রেখেছে। সংসারে আমি ব্যর্থ, স্বামী হিসেবে ব্যর্থ, বাবা হিসেবে ব্যর্থ, তবু লেখার কাছে এলে আমি শিশুর মতো সহজ হতে পারি। কবিতা লিখে আমার অনেক টাকা হয়নি, বড় বাড়ি হয়নি, প্রতিষ্ঠা হয়নি, কিন্তু অনাবিল আনন্দ হয়েছে। এই শক্তিই আমাকে লেখায়।

এই যে এত ক্ষুধার্ত, অভিমানী জীবনে এত আনন্দ, এত স্বপ্ন কোথা থেকে আসে?

মলয় গোস্বামী: কোথা থেকে আসে জানি না। মনে হয় ভালবাসা থেকেই আসে। লিখি বলেই না এত মানুষ ভালবাসে আমাকে। আমি লেখার নীচে তারিখ দিয়ে রাখি। আর ভাবি, যখন আমি থাকব না, এই তারিখ ধরে ধরে আমাকে যারা ভালবাসে, তারা তো আমাকে মনে করতে পারবে। মাঝেমাঝে মনে হয়, বনগাঁতে থাকি, কত লোক আমাকে ভালবাসে, কেন বাসে? কবিতা লিখি বলেই তো! তাহলে, যদি কবিতা না লিখতে পারতাম, তবে কি এত মানুষ ভালবাসত? এটা যেই ভাবি, আমার ভেতরে বাঁশির সুর জেগে ওঠে। এই সুর, এই এত কাছের মানুষের ভালবাসা, এটাই আমাকে স্বপ্ন দেখায়। লিখতে বলে। আর ক্ষুধার্ত, অভিমানী জীবন… এসব নিয়ে আর কী বলি, এতটা বয়েস হয়ে গেল…আসলে, ওই যে বললাম, আনন্দ… আর হ্যাঁ, ছোটবেলাটা। যাঁদের ছোটবেলাটা ছোট, তারা চিরদিন ছোট মন নিয়েই বেঁচে থাকে, আমাদের ছোটবেলাটা তো বিশাল। তার ব্যপ্তি নিয়ে কত বলব… সেসব দিনের কথা বলে ফুরোবে না। তো এই ব্যপ্ত, বিরাট ছোটবেলাই মনে হয় আমাকে এমন অদ্ভুত শক্তি জোগায় আজও। কবিতা লেখার কাজ সবাই যতই সহজ ভাবুক, আসলে তুই যতই সহজ করে লিখবি বলে ভাবিস, পাঠকের কাছে তো ব্যাপারটা সহজ নয়। আর ওই যে অনেকে আছেন, বলেন, ‘না লিখে পারি না, তাই লিখি,’ আমি বলি, কে বাপু লিখতে বলেছে, না লিখে পারো না যখন, লিখো না। আসল কথাটা হল ওই যে বারবার বলছি আনন্দ। পড়ে আনন্দ, এমনকি নিজের লেখা পড়ে কবিরই যদি পাঠকের মতো আনন্দ হয়, তবেই না লিখে শান্তি। আর কী জানিস, একদিন, হঠাৎ শুনছি, কে বলল, ‘নিতাই ভাল নেই।’ তো আমার মাথায় ধাক্কা মারল। লিখলাম লাইনটা। পড়ে একজন বয়স্ক লোক, আমার চেনা, খোড়াতে খোড়াতে এসে বলল, মলয়, এ কী লিখেছ? যেদিকে তাকাই, মনে পড়ে, ‘নিতাই ভাল নেই’। আর কান্না পায়… মানে, বলছি, এই যে আমি সহজ কথাই লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পাঠক ভেবে নিল অন্য আঙ্গিকে। আর এই যে অফুরান ভালবাসার জোয়ার এক একটা লেখা লিখে, পড়িয়ে পেলাম, এরাই বাচিয়ে রাখল আমাকে।

আপনার সেই ব্যপ্ত ছোটবেলাটা কি বনগাঁতেই কেটেছিল?

মলয় গোস্বামী: না। আমার জন্ম তো নবদ্বীপে। ওখানেই বাবা-জ্যাঠাদের মদনগোপালের প্রতিষ্ঠা। নবদ্বীপের গা-লাগা উত্তর শ্রীরামপুর-এ জন্ম আমার। নবদ্বীপ বলছি, কিন্তু ভৌগলিক দিক থেকে ধরলে ওঁটা কিন্তু বর্ধমানে। বাবা তখন নবদ্বীপেই  থাকেন আর জ্যাঠা থাকেন দাদনহাট। বনগাঁ থেকে বাবার এক পরিচিত খবর দিলেন, ট্যাংরা কলোনিতে একটা রিফুউজি স্কুল আছে, বাবা পড়াবেন কিনা। বাবা রাজি হলেন। আমরা তখনও নবদ্বীপেই থাকছি। খুড়তুতো, পিসতুতো ভাইবোনেরা ছুটছি এদিক-সেদিক। বাবা ট্যাংরা থেকে গাড়াঁপোতা মাইনর স্কুলে যোগ দিলেন। পরে আমরা এলাম গোবরাপুরে। আমাদের মাটির নিজস্ব বাড়ি বানানো হল। তবে বাবা থিতু হলেন না। সেখান থেকে বাবা গেলেন বৈরামপুরে। আমাদেরও বাসা নিয়ে যেতে হল সেখানে। তারপর কালুপুর পাঁচপোতা হয়ে বাবা বনগাঁর ঘোষ ইনস্‌টিট্যুশনে এলে কলেজপাড়ায় ১০ টাকা ভাড়ায় আমাদের বাসা নেওয়া হল। মানে, বলছি, এই যে বাসাবদল, নতুন পরিবেশে নিজেকে রেখে দেখা, এ আমার পেছন ছাড়ল না। পরে আমিও তো কলকাতায়, মধ্যমগ্রামে, এমনকি বনগাঁতেও কত বাসা বদলেছি। পাখির মতো খড়কুটো মুখে করে এই যে বাসা বদলের দিনগুলো, সেসব অভিজ্ঞতা আমাকে পরে অনেক সমৃদ্ধ করেছে।

এই বাসাবদলের দিনগুলোর মধ্যেই একদিন কি লেখালেখি হঠাৎ করে আপনার গোছানো জামা-কাপড়, বইখাতার মধ্যে, স্বপ্নের মধ্যে হানা দিল?

মলয় গোস্বামী: গোছানো মানুষ আমি কবেই বা ছিলাম যে গোছানো এটা-সেটার মধ্যে লেখা হানা দেবে? আমি তো কবেই লিখেছি, ‘অচেনা জামা’র ভূমিকায়, ‘আমার জীবন সাজানো-গোছানো নয়। বলা যায় — সাজাতে পারিনি। … কত কবিতা রাগ ক’রে চলে গেছে! কত কবিতা নুঞ্জুখুঞ্জু হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে। কত কবিতা অজ্ঞাতসারে হারিয়ে ফেলেছি।’ যাক সে কথা। গোবরাপুরে আমাদের বড় বাড়িতে, ভাইবোনেরা মিলেমিশে থাকি, সেখানে বাড়িতেই একটা আলাদা সাংস্কৃতিক পরিবেশ। বাবা কবিতা লেখেন, মার কবিতা ছাপা হচ্ছে দৈনিক বসুমতিতে। নানান পত্রপত্রিকা আসছে বাড়িতে। গান-বাজনা, বাঁশি বাজানো, এসব চলছে। পাড়ার ছোটদের নিয়ে কলেজপাড়ায় এসে আমি তখন নাটক লিখি আর নাটক করি, গান গাই। ছোট ছোট গল্প লিখি মজার আর আমার ভাই মৃণ্ময় সেগুলো কপি করে রাখে খাতায়। তবে কবিতা তখন লিখি না। একদিন চন্দ্রগ্রহণের দিন, বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে কবিতা লিখেছি, ‘হে বঙ্কিমচন্দ্র, তুমি কি আকাশের চন্দ্র…’ পড়ে বাবা  বললেন, তোমার আর কবিতা লিখতে হবে না। সে নিয়ে কী হাসাহাসি… ৭০ এর দশকে আমার গল্প লিখেই শুরু হয়েছিল। ৭২-এ, মনে আছে, বাদল সরকারের ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটক করতে গিয়ে আমার জীবনবোধটাই পুরো পালটে গেল। পালটে গেল শিল্প সম্পর্কে সমস্ত ধারণা। তখন পাড়ায় পাড়ায় স্টেজে স্টেজে প্রচুর রবীন্দ্রসংগীত গাইছি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরের সেই সময়। কিন্তু ওই নাটকটা করতে গিয়ে আমার সমস্ত বিশ্বাস বদলে গেল। হঠাৎ করে যেন কবিতার দরজা আমার সামনে খুলে গেল। একটা নতুন আকাশ, যাকে নতুন করে বুঝতে পারছি। এরকমটা আগে হয়নি। পরে তো বাদল সরকারের সঙ্গে আলাপ করলাম, বলেও ছিলাম এসব। মানে সব ওলটপালট করে দিল আমার। আমি কেমন যেন আক্রান্ত হলাম।

আর আপনার প্রথম কবিতার বই, ‘সময়ের স্মৃতিতে ছুঁড়ি অলৌকিক জাল’? সেটার গল্প?

মলয় গোস্বামী: হ্যাঁ। সেটারও একটা গল্প আছে। ৭৯ সালে। আমি থাকি পিসতুতো দাদার বাসায়, চিড়িয়া মোড়ে। ২০ নম্বর দমদম রোড। দারা ছেলেমেয়েদের পড়াতে আসত পুলীন সাহা। ও শুনেছে আমি কবিতা লিখি, বলল, আপনার একটা বই করি? বই তো করব, তখন, আমার মনে আছে, হাত ভেঙেছে, হাসপাতালে শুয়ে ইথারের ঘোরে আমি প্রলাপ বকছি,আমার একটা কবিতার বই হলে হত… সেই ভাঙা হাত নিয়ে গোবরডাঙায় ভরতি হলাম বিএড পড়তে। তো, বই যে হবে, টাকা কই? পুলীন বলল, টাকা ও দেবে। টেমার লেনের সাহা পাবলিশার্স করবে বই। আমি চালচুলোহীন বাউন্ডুলে, বনগাঁয় এসে বিশ্বনাথ মৈত্রকে ধরলাম, আমার বইটার ব্যবস্থা করে দিন। তো এইভাবেই অগোছাল ভাবে সব হল আর কি!

আপনার কাব্যগ্রন্থগুলির নামকরণ এত মায়াময়, অথচ তাদের শীর্ণকায়, বিলুপ্ত দশা। এ কি একরকম আত্মহননের প্রবপণতা নয়?

 

মলয় গোস্বামী: আমি তো এরকমই। যারা আমায় কাছ থেকে ভালোবেসে দেখেছে, অবাস্তব অসংসারী বলে মৃদু স্নেহমাখানো ভর্ৎসনা করেছে, তাঁরা জানে আমি একেবারেই অগোছালো। অনেকে বলে আমার নাকি প্রতিভা আছে। আমি হেসে অবিশ্বাস করেছি। কারণ আমার সংসার তো তা বলে না! যাই হোক, যদি প্রতিভা থেকে থাকে তাহলে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা অনুযায়ী বলতে চাই—প্রতিভার গৃহিনীপনা আমার নেই। মাঝে মাঝে ভাবি, এ জীবন ফুঃ!… তবে এই ষাটোত্তীর্ণ  বয়সে ওইসব শীর্ণ বিলুপ্তদশা কাব্যগ্রন্থগুলি দেখে চোখে জল আসে! মনে হয় আমার সন্তানকে ঠিকমতন খেতে দিতে পারিনি বলেই ওঁরা বিলুপ্ত দশায় চলে গেল! তবু তোরা বললি, এই-ই ভালো।

 

সেই প্রথম কবিতার বই থেকেইথেকে আপনার একটার পর একটা পরিবর্তন দেখছি আমরা। সে কবিতার ছন্দ, আঙ্গিক হোক, কী বইয়ের নাম। কিংবা ধরুন আপনার কবিতায় বারবার এসেছে ‘অলি’ নামে এক রহস্য।

মলয় গোস্বামী: হ্যাঁ। প্রথম বইতে ছিল দেবযানী বলে আমার মানসপ্রতিমা। পরে দেখি আমার এক বন্ধু লিখছে দেবযানী নিয়ে। আমি ঠিক করলাম আর লিখব না ওই নামের কাউকে নিয়ে। এই সময়, আমার শিক্ষক, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংবাদিক হীরক, আমার বন্ধুর বাবা, একদিন শুনি, হীরকের মা-কে ডাকছে ‘অলি’ বলে। কী ব্যাপার? এরকম নাম হয় নাকি? উনি বললেন, আসলে ওঁর নাম অঞ্জলী, কিন্তু ওই মাঝখানের ‘ঞ্জ’-টা কেমন বোঝা–বোঝা লাগে। আমি তো অবাক! এই তো আমার প্রিয় নাম। পরের বই থেকে তাই আমার দেবযানী বদলে গেল অলিতে। আসলে এসব বলছি মানে এটা বোঝাতে, যে আমি যা দেখেছি, যা বুঝেছি, সেটুকুই লিখেছি। জীবনের রস দিয়ে লিখেছি। বাবা বলতেন, কবিতায় মিথ্যে বলতে নেই। বলা যায় না। খারাপ কথা কবিতায় বলা যায় না। এই ব্যাপারটা প্রথম বই থেকেই আমার পরের সমস্ত বইগুলোতেই আমি মেনে চলেছি। চালের থেকে কাঁকড় বাছা কঠিন। ঠিক তার উলটো, কবিতা থেকে খারাপ শব্দ, খারাপ চিন্তা, খারাপ স্বপ্ন, মানে যা কিছু খারাপ, বাদ দেওয়া কিন্তু সহজ। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, জীবনের ফটোগ্রাফ তো সাহিত্য নয়। ফলে পুরো বাস্তবকে আমি কীভাবে কবিতায় রূপ দেব? পুরো বাস্তবটাই তো জীবন নয়। আজকাল জাদুবাস্তবতার কথা খুব শুনি। আমার গল্পে, কবিতায়, উপন্যাসে এরকম জাদুবাস্তবতার ব্যবহার আছে। সেখানে কুকুর কথা বলে, মানুষের সঙ্গে মানুষের ভাষায় কথা বলে। এটা জাদু? না। আমাদের পুরাণেই তো আছে এরকম কত উদাহরণ। আজ সবাই মার্কেজ, রুশদি লিখেছে বলে জাদুবাস্তব, জাদুবাস্তব বলে হা-হুতাশ করছে। কিন্তু রামায়ণ, মহাভারতে এরকম জাদুবাস্তবের উদাহরণ কত রয়েছে। বদলের কথা আর কত বলি। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে কাটালাম এতবছর। কতবার তো ভেবেছি, এই বনগাঁ ছেড়ে চলেই যাব। গেছিও তো। কিন্তু আবার কীসের টানে ফিরে এসেছি। একটা জীবন আমার পেটে গামছা বেঁধে কেবল লেখার পরে মানিসিক তৃপ্তি নিয়ে কেটে গেল।

কবিতারসেই তৃপ্তি কেমন? কেমন সেই কবিতা? কীভাবে দেখেন তাকে?

মলয় গোস্বামী: রহস্য নিয়ে আর কী বলব? আমি লিখছি, স্বপ্নের প্রজাপতি আর প্রজাপতির স্বপ্ন। এর মধ্যে কোনটা আসল? রূপের মধ্যে অরূপের খোঁজ। এটাই তো আসল। না? এটাই তো কবিতা। একটা গান, ধর, বড়ে গুলাম আলি গাইছেন মল্লার, কী মোটজার্ট-এর সোনাটা। সুর জানি না। কিন্তু শুনছি। সুরের মূর্ছনাটুকু থেকে যাচ্ছে। মনে হল, মনের মধ্যে বৃষ্টি পড়ছে। এটাই তো সব। মনের মধ্যে কে ডাকল। এই ডাকটাই আমাদের টানে। আমি হয়ত আমাদের মদনগোপালকে মাঝরাতে জেগে উঠে বলতে চাই, আমার সঙ্গে যাবি? কিন্তু লিখছি কী? না, আমি পাশবালিশকে জড়িয়ে ধরে বললাম, যাবি? এই তো কবিতার রহস্য। এখন, এই চল্লিশবছর লেখার পরে দেখি, সবেতেই কবিতা। মাকে বাড়ি ফিরে বললাম, মা ভাত দাও। বলেই মনে হল, আরে! মা তো নেই। তাহলে? লাইনটা তো কবিতা হয়ে গেল! আমি দেখেছি, সবাই ভেতরে ভেতরে একটা আঁকুপাঁকু নিয়ে লিখছে। এই আঁকুপাঁকু কীসের? নাম করার? নাহ্‌। সে আকাঙ্ক্ষা থাকলে কবিতা আসবে না। এত বছর পরে বুঝি, মনের আকাঙ্ক্ষারনিবৃত্তি না ঘটলে প্রকৃত কবিতা আসে না। এখন তো কেবল আনন্দ হয়। লিখলেই। ভালবাসার মানুষকে দেখলেই চোখে জল আসে। ভাল কিছু দেখলেই আনন্দ হয়। আর লেখার কথা? ধর, মনের ভেতরে কবিতা এখন জেগে উঠল, আর তুই তাকে ধরার চেষ্টা করছিস। এই তোর মস্ত ভুল হয়ে গেল। মনের ভেতরের রহস্যকে ধরার চেষ্টা করলে হবে না। আসল কবি সে-ই যে নিজে কবিতাকে ধরেনি, কবিতা যাকে ধরেছে।

আমার কবিতায় মাঝেমাঝেই সংলাপ এসে কেমন যেন করে ওঠে। আমি বাধা দিয়েও তাদেরকে ঠেকাতে পারি না। সঙ্গে রয়েছে আমার ছোট্ট বেলা থেকে টেনে নেওয়া সংগীতচর্চা এবং বাদ্যযন্ত্রচর্চা। এবং কবিতাতেও ঢুকে পরছে সংগীতের নানা ব্যঞ্জনা এবং ছন্দ। মিলিয়ে মিশিয়ে যেন ঘনঘোর। নাটক ও বাদ্যযন্ত্রের শৃঙ্খলা ও সংযম এসে কবিতাকে সাহায্য করতে আরম্ভ করে। এই শৃঙ্খলা ও সংযম থাকলে কবিতার রূপলোক বহুগুন শক্তি ধারণ করে। এবং আমরা তো এটা জেনেছি যে সমস্ত কলাকেই শেষ পর্যন্ত সংগীতের দিকে চলে যেতে হবে। বিষয়টিকে বুঝতে হবে। বলতে চাই—বাণী, বিষয় সব ছাড়িয়ে সংগীত একেবারে শেষে এক সৌন্দর্যময় অনুভবে গিয়ে পৌঁছায়। কবিতাকেও এইদিকে যেতে হবে। তাই লিখে ফেলি, “তবে বলো দেখা হলো পাতালযামিনী”। কবিতাকে যে আমি চেষ্টা করি এক সাঙ্গীতিক অনুভবের দিকে নিয়ে যেতে, যেখানে বিষয়বক্তব্য প্রয়োজনহীন হয়ে যাবে। পেরেছি কী পারিনি, তা অন্য ব্যাপার। হয়তো পারিনি। কিন্তু এই কবিতা-ভাবনা এসেছে আমার সংগীতচর্চার  কারণেই, আসলে দেখো, সংগীতে কিন্তু বুদ্ধি ও জ্ঞানের ব্যাপারটি নেই। শুধু অনুভূতি, অনুভব। মনে হয়েছে আমার, এই বিষয়টিই কবিতার পরম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এখন মনে হয় কবিতা বিষয় ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণ মূর্ছনার দিকে চলে যাক…। এই সমস্ত ভাবনাই এসেছে আবার সঙ্গীতচর্চার জন্যে। আর আমি যে নানারকম ছন্দে লিখে থাকি, এই ব্যাপারটিকে সাহায্য করেছে আমার বাদ্যযন্ত্রচর্চা।  কখনও কখনও আমি আমার একটি কবিতাকে পরে গল্পের রূপ দিয়েছি। কখনও কখনও আমার উপন্যাসের বীজকে ধরতে চেয়েছি একটি ছোটো কবিতায়। সমস্ত কলা একাকার হয়ে আমার কবিতায় প্রবেশ করেছে। আর কবিতাও তাদেরকে নিজের করে নিয়েছে। কী জানো, একজন শিল্পীর কাজ হল সবকিছুকে, এই চারপাশের এত খারাপ, এত ভণ্ডামি, তবু, শেষপর্যন্ত জীবনকে একটা সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাওয়া। আমার এই বিশ্বাস থেকেই আমি গল্পে কোনও খারাপ চরিত্র রাখতে পারিনি। চেষ্টা করেছি, কিন্তু দেখলাম, সেই খারাপ লোকটাও শেষপর্যন্ত ভালই হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এটুকুই করে যেতে চাই।

একটা সময় কলকাতায় থেকেছেন। চাকরি করেছেন নামকরা কাগজের অফিসে। আজকাল আর কেন যান না সেখানে? কী সেই অভিমান?

মলয় গোস্বামী: হ্যাঁ। অভিমান-ই বলতে পারিস। কী জানিস, প্রকৃত নাগরিকদের মধ্যে গুণীর কদর আছে। কিন্তু কলকাতা শহরের বৌদ্ধিক মহল তো নিয়ন্ত্রণ করে বাইরে থেকে কলকাতায় গিয়ে বাস করা লকেরা। তারা গুণীর কদর জানে না। তাদের কেবল ভেতরের আঁকুপাঁকু। এখন বাইরে থেকে সেখানে গিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে আমার একটু আপত্তি আছে। সেটা করতে গেলে অনেক আপোষ করতে হবে। সেসব আমার পোষায় না। নিজেকে ছোট করতে পারব না আর। তারচেয়েও বড় কথা কী, ওই যারা সব সমাজের বড় বড় পদ, সমাজের অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের থেকে খারাপ লিখতে হবে তোকে। তাদের কাছে মাথা নিচু করে চলতে হবে। তা নাহলে তোকে তারা কেন মেনে নেবে যদি তুই তাদেরকেই ছাড়িয়ে যাস?

 

প্রায় চল্লিশ বছর কবিতাচর্চা করছেন। কবিতার ভাষা ও আঙ্গিকের কত-না বদল হল এর মধ্যে। এ-প্রসঙ্গে নিজেকে কোথায় রাখবেন আজ?

 

মলয় গোস্বামী: দেখবি মোটামুটি দশ বছর পরপর কবিতার ভাষা পালটে যাচ্ছে। আঙ্গিক কিন্তু এত দ্রুত পালটাচ্ছে না। আমার কবিতাতেও তাই দেখছি। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিবর্তন করলে কবিতার সৌন্দর্য ব্যহত হয়। সময়ই এই পালটাবার কাণ্ডারী। আমি এর মধ্যে নিজেকে কোথায় রাখব, এই ভেবে কখনও মাথা খারাপ করিনি। তবে মনে হয়েছে, এবং আমার কবিতাকে লক্ষ্য করে দেখেছি আমি অধিকাংশ কবিতাতেই একটা ছবি প্রবেশ করিয়ে দিই। চল্লিশ বছর আগেই আমি একথা বুঝতে পেরেছিলাম, ছবির ভাষা সর্বজনীন এবং অপরিবর্তনীয়। ধরা যাক – দা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’ আজও একই ভাষায় উপভোক্তাদের সামনে আসীন। অতএব ভাষা ও আঙ্গিক পালটালেও কবিতার মধ্যে উৎকীর্ণ ছবিটি কিন্তু জীবিত থাকবে। কতটা থাকবে কতটা পেরেছি বা পারিনি তা অন্য ব্যাপার।

এখন একা একা গান গাই। বাঁশি বাজাই। চাইলে কি অনুষ্ঠান করতে পারি না? গানের? বাঁশির? করি না কারণ, এখন এসব কেবল আমার নিজের আনন্দের। এই বাঁশির কথা আর কী বলি, একটা মেয়ে আমাকে খুব ভালবাসত। আমি তো বাঁশি বাজাই। বন্ধুরা বলে ওর কথা। আমি উদাসীন। মজা করে বলতাম, তোমার বাড়ি একটা বাঁশি পুঁতে দেব। মেয়েটা কেঁদেই ফেলল। বলল, ওই বাঁশিই আমাকে খেল।

এই যে বাঁশি পুঁতে দেব, এটাও তো একটা রহস্য। নাকি? পাঠক খুঁজবে। কেন বাঁশি পোঁতার কথা এল। পাশবালিশকে কেন বলছেন কবি, আমার সঙ্গে যাবে? এই সামান্য অবসর দিতেই হবে তোকে। সব আলগা করে দিলেও হবে না। আমি তো ছবিকে শরীর দিই মাত্র। চাই সহজ করে লিখতে। লিখলাম, ‘তুমি এসেছ, আমার আনন্দ।’ সত্যিই আনন্দ। পছন্দের কেউ এলে আমার আনন্দ হয়। জীবনে কবিতা লিখে আক্ষরিক অর্থে কিছুই হবে না তোর। আমারও হয়নি। এমনিতেই তো কবিতাই আমার শত্রু। আমার সংসার বলে। আত্মীয়রা বলেন। সংসার বলে, “তুমি কবিতা লিখে কী পেলে? কী দিলে ছাইভস্ম ছাড়া?” আমি তখন বিমূঢ় হয়ে যাই। সত্যিই তো আমি কিছু দিতে পারিনি স্ত্রীকে, সংসারকে, সন্তানকে! তেমন করে তো প্রকাশ্যে ভালবাসতেই পারিনি! মনেমনে তো খুব ভালবাসি। কিন্তু ভালবাসার প্রকাশ তো কিছু জাগতিক মাধ্যমেই করতে হবে। তখন বুঝি কবিতাই আমার শত্রু। তবু যখন কেউ ঘরে থাকে না, তখন আমার হাজার হাজার কবিতার গায়ে হাত বুলোই। বলি খুব নিচু স্বরে, “তোরা আমার শত্রু, কিন্তু তোদেরকে ফেলে দিতে পারি না, পুড়িয়ে দিতে পারি না কেন বলতে পারিস?”তবু, আমি জীবনে যা দেখিনি, তা নিয়ে আমি লিখিনি। বার্চ গাছ দেখিনি, তাই বার্চ গাছ আমার কবিতায় আসে না।

 

একজন কবিতাপ্রয়াসী তরুণের প্রতি আপনার বার্তা বা প্রত্যাশাকী?

 

মলয় গোস্বামী: হাঃ হাঃ। বার্তা?… আমি বার্তা পেলাম, কঠিন অংক এক কষতে দিলাম!… বার্তা দেওয়ার মূর্খামির মধ্যে আমি নেই।

তবে কবিতা প্রয়াসী তরুণেরা যদি কিছু না মনে করেন তাহলে দু-একটা কথা আমি বলতে পারি। নিজের মতন লেখাই ভাল। অশিক্ষিত পটুত্বের দিন নেই। ছন্দ জেনেই তবে তা পরিত্যাগ করা উচিত।

“ বাক্যং রসাত্মকং কাব্যং”- বলেছেন আমাদের দেশের ত্রয়োদশ শতাব্দীর বিশ্বনাথ। বুঝতে হবে বাক্যটি  রসপূর্ণতা পেলে তবেই তা কাব্য হবে। রসই আসল। কবিতা লিখতে হলে সংগীতশিল্পী হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে সংগীত সম্পর্কে বেশ গভীর ধারনা থাকা প্রয়োজন। বাক্যের ধ্বনিকেই ধরার প্রয়াস রেখে যেতে হবে। মস্তিষ্কের যন্ত্রপাতি দিয়ে কবিতা লেখার চেয়ে হৃদয়ের আলোয় অনুভবকে ধরা বেশি প্রয়োজন। এই যে বলছি—এও কিন্তু বার্তা নয়।

কবিতা প্রয়াসী তরুণদের কাছে আমার প্রতাশ্যা আপনাদের কবিতা পড়ে যেন কিছু সময়ের জন্যও নতুন আলোর সন্ধান আমি পাই। আমি বিশ্বাস করি আমাদের তরুণ কবিরাই কবিতার অন্য এক পৃথিবীর সন্ধান দেবেন, যা আজও আমরা পাইনি। তবে আপনাদের কাছে একটা অনুরোধ করব, আপনারা যেন কবিতার কাছে আপনাদের একাকিত্বকে গভীরভাবে নিবেদন করেন। এর মূল্য সুগভীর।

 

এখন কোন ধরণের লেখা লিখতে চান?

 

মলয় গোস্বামী: ওই যে বললাম, আনন্দের কথা। আর মায়াময় লেখা। এগুলোই লিখে যেতে চাই।এখন তো, এই বয়সে সারা পৃথিবীর মায়া এসে জোটে আমার কাছে। যেন কেউ আসে, মনে হয়। এই আসার ছবি মনের মধ্যে ফুটে ওঠে। আর কী জানিস, এত বছর পরে মনে হয়, পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই আজও ভাল-টুকু আছে। ভালবাসা আছে। মায়া আছে। আমি চাই কবিতাকে আবরণ, আভরণহীন করে তুলতে। আভরণগুলো না বেশি হয়ে গেলে, বা অতিরিক্ত হলে আসলের রহস্যটা নষ্ট হয়ে যায়। মানে, একটা মেয়েকে আমার ভাললাগত ওর গলার একটা তিলের জন্য। একদিন দেখি কেমন বড় বড় গয়না পড়ে এসেছে। আর ওই তিলটা ঢেকে গেছে গয়নায়। আমি বলি, ওই তিলটাই তো ভাল ছিল। কী দরকার ঢাকার? কবিরা কিন্তু কবিতাকে ওই গয়নায় মুড়ে ঝলমলে বানাতে চায়। এটা সহজ। আমি লিখেছিলাম, ‘ঊর্ণনাভের বুননঘরাণা।’ আমি সেই ঘরাণা চাই। চাই মায়া। একজীবনের মায়া। ছোট্ট একটা মায়া থাক লেখায়, যা কবিতার সব আভরণ, আবরণকে ছাড়িয়ে যাবে।