নবনীতা দেবসেন

জন্ম: ১৩ জানুয়ারি, ১৯৩৮  মৃত্যু: ৭ নভেম্বর, ২০১৯

রজতকান্তি সিংহচৌধুরী

 

 

নবনীতা দেবসেনের কবিতা ঋজুকম্র ব্যক্তিত্বের মতোই মেদুর, তবুও ছায়াসঞ্চারী। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর দৃপ্ত পদসঞ্চার এবং বিশ্বসাহিত্যের অলিন্দ-নিলয়ে তার অবাধ বিচরণের ব্যস্ততা হয়তো তাঁর কবিতার তটিনীকে তন্বী রেখেছে। প্রবন্ধ, রম্যরচনা, ভ্রমণ-সাহিত্য, গল্প, উপন্যাস, নাটক, সাহিত্য-আলোচনার পর্বত-নগর-প্রান্তর-সৌধ-অরণ্যানীর ফাঁকে ফাঁকে তাঁর কবিতার সুতনুকা স্রোতস্বিনী প্রবহমান। আবহমান বাংলা কবিতার পাঠকের কাছে তা এক আঁজলা শ্রোত্রপেয়।

 

মন্ত্র পুনরুক্তি প্রবণতার বিপদ থেকেও এই শ্রীময়ী সুশীর্ণতা তাঁর কবিতাকে রক্ষা করেছে, বলা চলে। ‘সুতনুকা নদী শুকিয়ে হলো কি বালির চড়া’-র মতো পরিপ্রশ্ন সেখানে অবান্তর। বরঞ্চ, ‘সোনার হরিণ হারালে কি চলে – ক্লান্তি মাটি / বৃষ্টির মুখ চেয়ে বসে আছে থান চারাটি।।’(‘সোনার হরিণের ছড়া’, প্রথম প্রত্যয়, ১৯৫৯) –অনুচ্চকিত আশাবাদ এখানে প্রাসঙ্গিক।

 

যে শুশ্রূষু আরোগ্যে তাঁর প্রাণের স্রোতের দিয়া দেদীপ্য, তাকে আবহমান বাংলা কবিতার পাঠক আমরা অনায়াসেই প্রেম বলে চিনে উঠতে পারি:

“শুধু তুমি সুস্থ হবে।

আমি দিয়ে দেবো আমার কোজাগরীর চাঁদ

শাদা দেয়ালের ময়ূরকণ্ঠী আলো,

দিয়ে দেবো বিগত বছরের মরা পাখির মমতা,

আর আগামী বছরের কলাগাছটির স্বপ্ন,

……………

শেষ হেমন্তের বুড়ো সবুজ পাতারা

আসন্ন মৃত্যুর খসখসে গলাতে বলেছে,

তুমি সুস্থ হলেই ওরা আবার ফিরবে।”

(‘আরোগ্য’, প্রথম প্রত্যয়, ১৯৫৯)

 

সেই প্রণয়ের আরোগ্য আরও মূর্তিমতী হয়, কবিতাটি যত এগোতে থাকে, ‘আসুক ওরা ফিরে আসুক, যারা চিরকাল/ শুধুই চলে যাচ্ছে, এখান থেকে অন্যখানে/ উৎপাটিত একগুচ্ছ কচি সবুজ দূর্বার মতো/ তুচ্ছ উষ্ণ কাতর/ আমি তোমার যন্ত্রণা মুছে নেবো/ তার বদলে আসুক তোমার কাঙিক্ষত আরোগ্য।’ যে শুশ্রূষা কবিতার আজন্ম সহচর, তারই মায়াজাল যে আস্তীর্ণ হতে থাকে এই কবিতার শরীরে, সত্তায়।

 

“এক কবির গর্ভে আরেক কবির ঔরসে আমার জন্ম। অক্ষরের জগৎটাই যার ভিটে-মাটি, ঘর-সংসার, সে আর কবিতা লিখবে না কেন! যেমন আমার গাছে চড়া, বৃষ্টিতে ভেজা, কাগজের নৌকা গড়া, তেমনই আমার কবিতা লেখা। কবিতা আমার জীবনে আক্ষরিক অর্থেই সহজ। একা বাড়ির একলা শিশু, কবিতা আমার সঙ্গী আশৈশব।”—কবির এই স্বগোক্তি থেকে সহজেই বোঝা যায় নবনীতা কবিতা-যাপনেই থেকেছেন।

‘শূন্য-গগন-বিহারী ভাবকে ভাষার মোহন মরণে বিদ্ধ করে ফেলতে জানে যে বিচিত্র ছলনা’, নবনীতা দেবসেনের কাছে, ‘তারই নাম কবিতা’। তাই অপূর্ব অনুভবে দেখি মধুর রস মিশে যায় বাৎসল্য রসের পূর্ণতায়: ‘তুমি/ আমার কোলের শিশু হয়ে আমায় বরণ করো/ আমাকে হরণ করো/ পূরণ করো।’

 

তীব্র নারীপ্রমের অবুঝ সংরক্ততায় সিক্ত তাঁর কবিতা। নারীহদয়ের এই সুতীব্র আবেগঘন প্রেম ‘প্রেম – ২’ শীর্ষক কবিতায়:

“কুসুম, ধান্যের রয়েছে কাল

কুকুর-বেড়ালেরও ভাদ্রমাস

আমাকে করেছিস হাড়ির হাল

হন্যে হয়ে মরি বারোটা মাস।

 

তেষ্টা ছাতিফাটা, ক্ষান্তি নেই

আমূল জ্বলে যায় স্বস্তি, সুখ

তোমাকে ছাড়া নেই শান্তি নেই

অতল জলধারা তোমার মুখ।

 

তাকাও, চোখে হোক চোখের স্নান –

পেতেছি দ্বারে ক্ষুৎ-তৃষ্ণ ঠোঁট।

ক্ষুধার্তকে দিবি অন্নপান

বাড়িয়ে আন তোর জিষ্ণু ঠোঁট!”

 

আবার নারীর অভিমান স্বাক্ষর রাখে ‘মনিব সমীপেষু, বিনয়ী নিবেদন’ নামের কবিতাটিতে।

পুরুষ-মালিককে তাঁর নিবেদন:

“অনেক দিন হলো গ্রীষ্মে বর্ষায়

রয়েছি পদতলে বিনীত শতদল

পায়ের ছোঁয়া দিয়ে ফুটিয়ে চলে যাও

পাপড়ি খসে পড়ে সেদিকে চোখ নেই?”

 

ভারতজোড়া রামায়ণ-কথার বিপুল বৈচিত্র নবনীতার আগ্রহ ও গবেষণার বিষয়। দেশব্যাপী এই বিচিত্র রামকথার আভাস আমরা পাই ‘সীতার পাত্র সন্ধানে’ কবিতায়। মৈথিলী রামকথা অবলম্বনে লেখা এই কবিতায় সীতাকে দেখি প্রকৃতই মাটির কন্যা রূপে। জনক রাজার রানির বয়ান, “উঠোনটাকে লেপতে গিয়ে যেই/ আঁচলখানি খসল মেয়ের হায়!/ অমনি খেয়াল হল আমার, এই/ ডবকা মেয়ে আর ঘরে মানায়?”—এই অনায়াস শব্দ-ছন্দ-দক্ষতা, এই মেধা-মনীষিতা নবনীতার কবিতায় ওতপ্রোত।

 

আবহমান বাংলা কবিতার পাতায় তিনি তার নির্জন স্বাক্ষর রেখে গেছেন। আমাদের মিতকথনের উপান্তে গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজার মতো তাঁরই কবিতার কয়কটি স্বৰ্গছোঁয়া দ্বিধা-থর্ থর্ চরণ স্মরণ করি:

 

“কাছে থাকো, ভয় করছে, মনে হচ্ছে

এ মুহূর্ত বুঝি সত্য নয়, ছুঁয়ে থাকো।

শ্মশানে যেমন থাকে দেহ ছুঁয়ে একান্ত স্বজন

এই হাত, এই নাও, হাত।

এই হাত ছুঁয়ে থাকো, যতক্ষণ

কাছাকাছি আছো, অস্পৃষ্ট রেখো না।

ভয় করে। মনে হয় এ মুহূর্ত বুঝি সত্য নয়।”

 

তাঁর কবিতা সহজেই অনুভূতির কাছাকাছি আসে। বাস্তবের গা ঘেঁষে থাকে তাঁর কবিতার অপরূপ সব চিত্রকল্প! আবহমান বাংলা কবিতায় তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।