জসীম উদ্দীন

জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯০৩ মৃত্যু : ১৪ মার্চ ১৯৭৬

মৃদুল হক

 

জসীমউদ্দীন শুনলেই আমাদের প্রথমে যে কবিতা মনে পড়ে সেটি হল ‘নক্সী-কাঁথার মাঠ’। “আজো এই গাঁও অঝোরে চাহিয়া ওই গাঁওটির পানে, / নীরবে বসিয়া কোন কথা যেন কহিতেছে কানে কানে।” কিংবা ‘কবর’ কবিতা– “এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে / তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।” ছোটবেলায় আমার এক দাদিমা বারবার এই কবিতাগুলো পড়ে শোনাতো। তখনো আমরা জসীমউদ্দীনের বাকি লেখাগুলোর কোনো হদিস জানি না। রূপাই-সাজুর কাহিনি শুনে বারবার শুধু ফাঁকা মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম যে-কোনো ফাঁকা মাঠেই বোধহয় ওরা আজো রয়ে গেছে! আমাদের প্রত্যেকের বড় হওয়ার দিনগুলিতে এরকম একজন কথক থেকে যায়, যার কাছ থেকে আমাদের গল্প শোনা শুরু হয়। তারপর কল্পনাশক্তির জাদুতে ঘুরে বেড়াতাম মাঠের পর মাঠ। জসীমউদ্দীন তেমনি এক অন্ধ দাদাজানের কথা বলেছেন প্রথম লিখতে শেখার, গল্প শোনার, কেচ্ছা শোনার দিনগুলিতে। বারবার বিভিন্ন লেখায় কবি এই অন্ধ দাদাজানের গল্প শুনিয়েছেন আমাদের। এই অন্ধ দাদাজানের ‘ছোটবেলায় চোখের অসুখ হয়। কোন বিদেশি হাতুড়ে কবিরাজ তাঁর চোখে লঙ্কা-বাটার প্রলেপ দিতে উপদেশ দেয়। বাপ-মা সরল বিশ্বাসে তাই তাঁর চোখে লেপিয়ে দেন। লঙ্কার ঝাঁজে শিশু চিৎকার করিয়া মাটিতে গড়াইয়া তিন-চারদিন দাপাইতে থাকে। তারপর চিরজনমের মতো তাঁর চোখ দুটি অন্ধ হইয়া যায়। এই দাদাজানের কোলে–পিঠে উঠিয়া আমি মানুষ হইয়াছিলাম। শিশু বয়সে চোখ দুটি হারাইয়া তিনি লেখাপড়া শিখতে পারেন নাই। কিন্তু তাঁর মন ছিল নানা রাজ্যের রূপকথা, করুণ কথা, শ্লোক আর ছড়ায় ভরা। শিশু বয়সে যেমন মাতৃস্তন্যে দেহের পুষ্টি হইয়াছিল, তেমনি মনের কুসুম ফুটিয়াছিল আমার এই দাদাজানের মুখে অসংখ্য রূপকথা, শ্লোক আর ছড়া শুনিয়া। … তাঁর লাঠিখানা ধরিয়া গ্রামের পথ দিয়ে যখন কোথাও যাইতাম, দুইপাশ হইতে বালক-বৃদ্ধ-যুবক যে যেখানে থাকিত, তাঁকে ডাকিয়া আহ্বান করিত– মোল্লাজী, আমাদের এইখানে একটু বসিয়া জান। বসা মানেই সেখানে বসিয়া কিছু আনন্দ বিতরণ করিয়া যাওয়া। এই বৃদ্ধ লোকটির নিজের নিজের কোনো সুখ-দুঃখ বা ভালো-মন্দ ছিল কি-না, তাহা বুঝিবার বয়স তখনও আমার হয় নাই, কিন্তু যেখানেই তিনি যাইতেন সেখানেই ছড়া, রূপকথা আর কহন কথার আনন্দের হাট লাগিয়া যাইত। কোনও কোনও দিন রাত্রে তিনি আমাদের উঠানে বসিয়া রূপকথা বলিতেন। ও-ধারে আমার মা, আমার চাচীরা বারান্দায় বসিয়া শুনিতেন। এ-ধারে আমার চাচারা, গাঁয়ের আরও লোকেরা বসিয়া যাইতেন। দাদাজান রূপকথা বলিতেন আর মাঝে মাঝে গান গাইতেন। আমারও তাঁর সঙ্গে গান ধরিতাম। তিনি কত রকম কাহিনি না বলিতেন। মধুমালার কাহিনী, রূপবান কন্যার কাহিনী, আব্দুল বাদশা, শুলেবাকাওলী, তাজন মুলুক, কহকণ্ড-পাখি আর কত শত কাহিনী। কতদিন কাহিনী শুনিতে শুনিতে আমার সেই অন্ধ দাদাজানের কোলে ঘুমাইয়া পড়িয়াছি। ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া রূপকথার সেই রাজকন্যা আর রাজকুমারদের স্বপ্নে দেখিয়াছি। আমার শিশু মনের কাব্য শক্তিতে এই রূপকথা অনেকখানি আদর মাখাইয়া দিত।” অন্ধ দাদাজান-এর থেকে রূপকথার গল্প শুনে কবি কেঁদে ভাসাতেন। অন্ধ দাদাজান বিভিন্ন রকমের কেচ্ছা শোনাতেন। কেচ্ছা বলার সময় তিনি আঙুলে তুড়ি দিয়া, দুই হাত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কণ্ঠস্বর কখনও বিলম্বিত লয়ে টেনে, কখনও দ্রুতলয়ে খাটো করে, কখনও ধমকের সুরে, কখনও আবেগমিশ্রিত সুরে, কখনও জোরে জোরে দাপটের সঙ্গে কখনও ফিসফিস করে মনে মনে কথা বলার মতো করে, কাহিনীর বিষয়বস্তুটিকে তিনি শ্রোতাদের মধ্যে জীবন্ত করে তুলতেন। জসীমউদ্দীনের কবি জীবনের প্রথম উন্মেষ হয়েছিল এই দাদার গল্প, গান ও কাহিনির ভিতর দিয়ে। এই অন্ধ দাদাজানের থেকেই শোনা গল্পের উপর ভিত্তি করে কবি মনে-মনে বিড়বিড় করে গান গাইতেন। কিন্তু অন্ধ দাদা বুঝেছিলেন তার গানের অন্তর্দৃষ্টি। কবির রচক-জীবনের আকুলি-বিকুলি এই অন্ধ দাদাজান-ই প্রথম বুঝেছিলেন।

 

দুই

 

ছোটবেলা থেকে গ্রাম ও তার পারিপার্শ্বিক সাধারণ তুচ্ছ, অকেজো মানুষ জসীমউদ্দীনের লেখার বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। এই গ্রামকেই কবি ‘মক্কা হেন পবিত্র স্থান’ বলে গণ্য করেছেন। এজন্যেই হয়তো অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত কবি সম্পর্কে বলেন― “একেবারে সাদামাটা আত্মভোলা ছেলে এই জসীমউদ্দীন। চুলে চিরুনি নেই, জামায় বোতাম নেই, বেশ বাসে বিন্যাস নেই। হয়তো বা অভাবের চেয়ে ঔদাসীন্যই বেশি। সরল শ্যামলের প্রতিমূর্তি যে গ্রাম তারই পরিবেশ তার ব্যক্তিত্বে, তার উপস্থিতিতে। কবিতায় জসীমউদ্দীন প্রথম গ্রামের দিকে সংকেত, তার চাষাভূষা, তার খেত খামার, তার নদী নালার দিকে। তার অসাধারণ সাধারণতার দিকে। যে দুঃখ সর্বহারার হয়েও সর্বময়। যে দৃশ্য অপজাত হয়েও উচু জাতের। কোনো কারুকলার কৃত্রিমতা নেই, নেই কোনো প্রসাধনের পারিপাট্য। একেবারে সোজাসুজি মর্ম স্পর্শ করবার আকুলতা। কোনো ইজমের ছাঁচে ঢালাই করা নয় বলে তার কবিতা হয়তো জনতোষিণী নয়, কিন্তু মনোতোষিণী।” যেমন―

“সাক্ষী থাকিও চন্দ্র সূর্য! সাক্ষী থাকিও 

আকাশের যত তারা, 

আজিকার এই গহন রাতের অন্ধকারেতে হইলাম ঘরছাড়া 

জনমের মত ছেড়ে চলে যাই শিশু বয়সের শিমূলতলীর গ্রাম 

এখানেতে আর কোনোদিন যেন নাহি কহে কেহ 

সোজন-দুলীর নাম।” 

― এ কবিতায় নেই কোনো ‘প্রসাধনের পারিপাট্য’, শুধু আছে এক অনন্ত বেদনা, দুঃখবোধ, ফিরে যাওয়ার আকুলতা। এই বেদনাময় উচ্চারণই কবির সম্পদ।

কোথায় যেন পড়েছিলাম ‘Memory, your personal museum, takes you into the realers of what is lost.’ জসীমউদ্দীনের ছেলেবেলার গল্পেও এরকম অনেক হারানোর গল্প আছে। সেই হারানোর তালিকায় বন্ধুর পাশাপাশি ‘সামান্য গাছও’ আছে। ‘জীবনকথা’ নামক স্মৃতিচারণায় সে-সবের উল্লেখ পাই―

“হিন্দুপাড়ার এক পাঠশালা আমার কাছে বড়ই আকর্ষণের বস্তু হইয়া উঠিল। হিন্দুদের বাড়িতে বাড়িতে নানারকম ফুলের গাছ। শীতকালে রক্তগাঁধা আর বড় গাঁধার রঙে আর গন্ধে উঠোনের অর্ধেকটা আলো হইয়া থাকে। গাঁদা ফুলের চাইতেও সুন্দর হিন্দু বউরা কপালভরা সিঁদুর পরিয়া উঠোনের ওপর সুনিপুণ করিয়া চালচিত্র আঁকিত। কার্তিক পুজো লক্ষ্মীপূজায় জোকার দিয়া শঙ্খ বাজাইত। বিবাহের উৎসবে ঢোল সানাই বাজিত। আমাদের মুসলমান পাড়ায় গান-বাজনা নাই। কারও বাড়িতে ফুলের গাছ নাই। ওহাবী আন্দোলনের দাপটে গ্রাম হইতে আনন্দ-উৎসব লোপ পাইয়াছে। আমি আমার হিন্দু বন্ধুদের বাড়ি হইতে চাহিয়া-চিন্তিয়া ফুলের গাছ, পাতাবাহারের ডাল আনিয়া বাড়িতে লাগাইতাম। গাছগুলিকে কতই না যত্ন করতাম। কিন্তু ফসল কাটার সময় আসিলে তাহার উপরে রাশি রাশি খড় মেলিয়া শুকানো হইত। কৃষাণদের অসাবধান পায়ের তলায় কত গাছের ডালগুলি ভাঙিয়া যাইত। আমি চিৎকার করিয়া কাঁদতাম। একটা ফুলের গাছ ভাঙার জন্য যে কেহ দুঃখ পাইয়া কাঁদিতে পারে একথা বাড়ির কেই-ই বুঝিত না।”

ছোটোবেলার বন্ধু বিনোদের কথার সূত্রেও কবি-মনের অমোঘ বেদনার কথা শুনতে পাই― 

“পাঠশালায় আমার এক বন্ধু ছিল বিনোদ। সে এখন রাজমিস্ত্রির কাজ করে। তাহাদের বাড়িতে একটি কালো তুলসীর গাছ ছিল। বিনোদ বলিত, এই কালো তুলসীর পাতায় অনেক অসুখ সারে। কারও যদি হাত-পা কাটিয়া যায়, ইহার রস ক্ষতস্থানে দিলেই রক্ত বন্ধ হইয়া যায়। কালো তুলসীগাছের আরও অনেক গুণপনার কথা সে বলিত। আজ তাহা মনে নাই। পাঠশালার ছুটির পরে বিনোদের বাড়ি যাইয়া এই তুলসীগাছটির পানে চাহিয়া থাকিতাম। লাল কালোতে মিশানো পাতাগুলি কতই সুন্দর। কাছে যাইয়া গন্ধ শুঁকিতে প্রাণ ভরিয়া যাইত। বিনোদকে বলিলাম, এই গাছের একটি চারা আমাকে দে। কিন্তু সে কিছুতেই আমার অনুরোধ রাখিল না। সেবার আমার স্লেট পেন্সিলের অর্ধেকটা ভাঙিয়া দিয়া বহু অনুনয়-বিনয় করিয়া তাহার নিকট হইতে একটি কালো তুলসীর চারা বাড়িতে আনিয়া লাগাইলাম। মুসলমান বাড়িতে তুলসীগাছ লাগাইয়া অনেকের কাছে সমালোচনার পাত্র হইলাম, কিন্তু আমার তুলসীগাছটি যখন বড় হইল তখন ওষধি হিসাবে তাহার পাতা লইতে এ-বাড়ি ও-বাড়ি হইতে যখন লোক আসিত, আমার বুক গর্বে ভরিয়া যাইত। আজও হাটের পথে বিনোদের সঙ্গে যখন দেখা হয়। এই কালো তুলসীগাছটির গল্প বলিয়া আবার আমরা ছেলেবেলায় ফিরিয়া যাই।” 

― যে জিনিস হারিয়ে গেছে আর চাইলেও ফিরে পাওয়া যাবে না কখনো এরকম হারানো বিষয়ের প্রতি জসীমউদ্দীন বেদনায় ভুগেছেন। সেজন্যই ‘জীবনকথা’য় ফুলের গাছের মৃত্যুতে কবি হাহাকার করেছেন কিংবা তুলসীগাছের স্মৃতিতে ‘ছেলেবেলা’ ফিরে এসেছে। আমাদের মনে পড়তে পারে বিভূতিভূষণের ‘তৃণাঙ্কুর’-এর কথা যেখানে মৃত মায়ের একটি সজনে গাছের রূপকে ফিরে এসেছে― ‘মায়ের পোঁতা সেই সজনে গাছটার কথা এত যে মনে হয় কেন? মনে হল, যে জীবনটায় আর কখনো ফিরবো না –যা শেষ হয়ে গিয়েছে, এই সজনে গাছটা এখনও কার ফিরবার আশায় সেই দিনগুলির মতো পাতা ছাড়ছে, ফুল ফোটাচ্ছে–ডাঁটা ফলাচ্ছে– কে এসে ভোগ করবে? বিভূতিভূষণের মতো জসীমউদ্দীনও আসলে তাড়িত হয়েছেন যে যুগটা হারিয়ে গিয়েছে তার প্রতি স্মৃতিকাতরতায়। এই স্মৃতিকাতরতার বেদনাই একজন কবির সম্পদ। এই বেদনায় এক ধরনের আনন্দ আছে। এই ‘Emotional sadnes’ একজন কবির মূলধন। যা কিছু নেই অথচ একদা ছিল সে-সব কিছু ফিরে পাওয়ার বাসনায় কবি কেঁদেছেন! সেজন্যই কবিরও যেন মনে হয় হারানো জীবনের দিকে চাহিয়া দেখিলে বুকের মধ্যে কেমন করিয়া ওঠে, কত কথা মনে পড়ে– জীবনের সে সব দিনকে আর একটিবারও ফেরানো যায় না? এই স্মৃতিকাতরতা মানে মনে-মনে ঘরে ফেরা। সেজন্যই বন্ধু বিনোদের সঙ্গে হাটের পথে আকস্মিক দেখা হয়ে গেলে সেই ‘কালো তুলসীগাছের গল্প বলিয়া আবার’ দু’জনে ছোটবেলায় ফিরে যেতেন। কবি লংফেলোর অনুভূতি যেন কবির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার― 

‘A feeling of sadness and longing 

that is not akin to pain

and resembles sorrow only

As the wist resembles the rain.’

 

 তিন

 

বাংলাদেশ ও বাঙালি জীবনে দেশভাগ একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দেশভাগের বেদনা ও হাহাকার কবির বিভিন্ন স্মৃতিচারণায় বারবার ফিরে এসেছে। কাজের সূত্রে কলকাতায় কোনও বন্ধুর বাড়ি এলে ফিরে যাওয়ার সময়কার আকুতি তাঁর বিভিন্ন গদ্যে ফুটে উঠেছে। যেমন ‘বাস্তুত্যাগী’ কবিতায় দেখি― 

“হিন্দু-মুসলমানের এ দেশ, এ দেশের গাঁ-র কবি 

কত কাহিনীর সোনার সূত্রে গেঁথেছে সে রাঙা ছবি। 

এ দেশে কাহারো হবে না একার, যতখানি ভালোবাসা,

যতখানি ত্যাগ যে দেবে, হেথায় পাবে ততখানি বাসা।

বেহুলার শোকে কাঁদিয়াছি মোরা, গংকিনী নদী স্রোতে,

কত কাহিনীর ভেলায় ভাসিয়া গেছি দেশে দেশ হতে।

এমাম হোসেন, সাকিনার শোকে ভেসেছে হলুদপাটা, 

রাধিকার পার নূপুরে মুখর আমাদের পার-ঘাটা।

অতীতে হয়ত কিছু ব্যথা দেছি পেয়ে বা  কিছুটা ব্যথা,

আজিকের দিনে ভুলে যাও ভাই, সেসব অতীত কথা। 

এখন আমরা স্বাধীন হয়েছি, নূতন দৃষ্টি দিয়ে, 

নতুন রাষ্ট্র গড়িব আমরা তোমাদের সাথে নিয়ে। 

ভাঙ্গা ইস্কুল আবার গড়িব, ফিরে এসো মাস্টার; 

হুংকারে ভাই তাড়াইয়া দিব কালী অজ্ঞানতার।

বনের ছায়ায় গাছের তলায় শীতল স্নেহের নীড়ে, 

খুঁজিয়া পাইব হারাইয়া যাওয়া আদরের ভাইটিরে।”

 

আমরা যারা দেশভাগের পরবর্তী সন্তান তারা জানিনা উদ্বাস্তু, শরণার্থী, ক্যাম্প ইত্যাদি শব্দের মানে। কিন্তু জসীমউদ্দীনের কবিতার হাহাকারের সামনে আমরা নতজানু হয়ে যায়। মনে হয়, ঘটনাপ্রবাহের সামনে অসহায় এক ‘ভিকটিম’ যেন ফিরে দেখছেন স্মৃতিকে। এই ঘর হারানোটা শুধু সত্যিকারের ঠাঁইহারাদেরই বিপন্ন করেনি, বলতে গেলে সমূহ বাঙালি জনতাই যেন বেঘর হয়েছে। দেশভাগের যন্ত্রণা এসব কবিতার মাধ্যমে তাপ পোহালেও এক অদেখা মনখারাপ ও বিষণ্ণতা আততায়ীর মতো জেগে থাকে আমাদের বিছানার পাশে। এ বিষয়ে এক চমৎকার গল্প পড়েছিলাম পাবলো নেরুদার ‘Memoirs’-এ। গল্পটি এরকম― আন্দালুসিয়ান কবি পেদ্রো গার্ফিয়াস বন্দী হওয়ার পর স্কটল্যান্ড এর এক প্রাসাদে নির্বাচিত হন। প্রাসাদের পাশের এক সরাইখানায় তিনি প্রতিদিন মদ খেতেন একা একা। অদ্ভুত দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকিয়ে থাকতেন তিনি। কারও কথা বুঝেন না। একদিন সরাইখানার মালিক ব্যাপারটা লক্ষ্য করলেন। পেদ্রোকে ডেকে আগুনের পাশে বসলেন দু’জনে, মদ খেতে খেতে গল্প করলেন অনেকক্ষণ। এরপর প্রতিরাতেই এটা তাদের নিয়মিত কাজে পরিণত হয়। পেদ্রো চিৎকার, গালিগালাজ আর লাফালাফি করে এম্পানিয়ার গৃহযুদ্ধের কথা শোনাতেন আর সরাইখানার মালিকও গার্ফিয়াসের মতো তাঁর পালিয়ে যাওয়া স্ত্রীর কথা থেকে শুরু করে নিঃসঙ্গ জীবনের অনেক কষ্টের কথা জানাতেন। এই দু’জনের বন্ধুত্ব কিন্তু ভাষার বাইরেই থেকে গেল, কারণ কেউ কারও ভাষা বুঝতেন না। তবুও এঁদের মধ্যে এক সম্বন্ধ গড়ে উঠেছিল, এক যন্ত্রণাকাতর মানুষের সঙ্গে আর এক বিধ্বস্ত মানুষের সঙ্গসুখ। বিদায়কালে দু’জনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে যখন পেদ্রোর সঙ্গে নেরুদার দেখা হয় এবং জানতে চায়― সরাইখানার মালিকের সঙ্গে তার কী কথা হয়? তখন পেদ্রো বলেন― ‘বিশ্বাস কর পাবলো, আমি তার একটি কথাও বুঝতাম না! আর তিনিও আমার কোনও কথাই বুঝতেন না! তবুও এটা আমরা উভয়েই অনুভব করতাম যে উনি আমাকে কিছু একটা জানাতে চাইছেন এবং আমিও তাঁকে কিছু জানাতে উদগ্রীব। এই ছিল আমাদের অকথিত বন্ধুত্বের সূত্র। জসীমউদ্দীনও তাঁর স্মৃতিকথায় ও কবিতায় যখন দেশভাগের হাহাকার ফুটিয়ে তোলেন তখন সেই নস্টালজিয়ায় আমরাও সমান অংশীদার হয়ে উঠি। চাক্ষুষ বাস্তবতায় সেই বেদনা প্রত্যক্ষত না হলেও জসীমউদ্দীনের যন্ত্রনাময় কলম যখন উচ্চারণ করে― ‘ভাঙা ইস্কুল আবার গড়িব, ফিরে এসো মাস্টার’ তখন দেশভাগের মধ্যেই যে ভায়োলেন্স, ধারাবাহিক ট্রাজেডি ও ট্রমা থেকে গেছে তার উত্তাপ ছুঁতে পাই। ব্যক্তির হাহাকার ও ইতিহাসের সংকট মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় পেদ্রো গার্ফিয়াস ও সরাইখানার মালিকের মতো, যেন সব যন্ত্রণার ভাষা এক, অভিন্ন!

 

চার

 

জসীমউদ্দীন শুধুমাত্র কবি, গ্রাম্যগান সংগ্রহকারী হিসেবেই সেসময় পরিচিত ছিলেন না। তিনি একাধারে প্রতিবাদী এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি চিলেকোঠার সেপাই ছিলেন না। সোনার খাঁচায় বসে দেশ শাসন ও সাহিত্য-সংস্কৃতির কথা বলা মানুষদের ঘৃণা করতেন। ‘ফকিরের বেশে খলিফা’ হয়ে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের খবর নিতেন। জসীমউদ্দীনের পুবের কথায় এরকম অনেক ঘটনার সাক্ষী থাকি আমরা– ‘আমি তখন দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র। ভারত পাকিস্তান দাঙ্গা। কে কোত্থেকে আসছে অজানা। বাড়ির কাছেই রেলওয়ে স্টেশন। আতঙ্কভরা এবং দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের ভিড়। প্রত্যেকে দিশেহারা। আব্বা রেলওয়ে স্টেশনে ছুটে গেলেন। ভীতসন্ত্রস্ত অসহায় মানুষদের নিরাপদে পৌঁছে দিলেন ঘন্টার পর ঘন্টা সময় নিয়ে। আমরা উদ্বিগ্ন। যখন বাড়ি ফিরলেন, নিজেই বিধ্বস্ত। ঘটনা একদিনের নয়। লিখলেন তিনি ‘ধামরাই রথ’ 

“পাকিস্তানের রক্ষাকারীরা পরিয়া নীতির বেশ 

এই রথখানি আগুনে পোড়ায়ে করিল ভস্মশেষ। 

শিল্পীহাতের মহা সান্তনা যুগের যুগের তরে, 

একটি নিমেষে শেষ করে গেল এসে কোন বর্বরে।”

 

লেখার আগে প্রাণে বেঁচে ঘরে ফিরেছিলাম। দাঙ্গাবাজরা তাঁকে ছুরিকাঘাত করলে এমন সময় সিদ্দিকবাজারের মাতব্বর দৌড়ে এসে বললেন, ‘তোরা করতাছস কি? এইটা তো আমাগো কবি সাব।’ 

বাংলাদেশের একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে কবিতা লিখেছেন―

‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যু পিছনে ও আগে 

ভয়াল বিশাল নখর মেলিয়া দিবস রজনী জাগে। আমরা চলেছি রক্ষা করতে মা-বোনের ইজ্জত, 

শত শহীদের লজ্জাতে জানানো আমাদের হিম্মত।’

 

এমনকি বঙ্গবন্ধুকে যেদিন হত্যা করা হয় সেদিন কবি প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছিলেন। কিছুদিন পর, দেশের গণ্যমান্যদের আক্রমণ জানালেন খোন্দকার মোনতাক। জানানো হলো কবিকেও। তিনি বললেন― ‘আমি খুনিদের সঙ্গে বসে চা খাব? না।’

জসীমউদ্দীন তাঁর স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ আমাকে দেখিলেই হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে আলোচনা করিতেন।’ এমনকি বন্দেমাতরম্ গানটি নিয়ে মুসলমানদের আপত্তির যথেষ্ট কারণ আছে সেকথাও রবীন্দ্রনাথ জসীমউদ্দীনকে বলেন। সাম্প্রদায়িক সমস্যা, ক্ষুদ্র মানসিকতা এসব নিয়ে কবি সবসময় ভাবিত ছিলেন। এ প্রসঙ্গে জসীমউদ্দীনের একটি স্মৃতিকথার উল্লেখ করা যেতে পারে যেখানে তিনি রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের সাম্প্রদায়িক চেহারাটি তুলে ধরেছেন―

“হিন্দু মহাসভার এক বক্তা আসিয়া শান্তিনিকেতনে ম্যাজিক লন্ঠন সহযোগে এক বক্তৃতা দিলেন। এখানকার নিত্য একঘেয়ে জীবনে ম্যাজিক লণ্ঠনের ছবি দেখা মস্ত বড় আকর্ষণের ব্যাপার। ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, শিক্ষকদের স্ত্রী-পুত্র সকলে আসিয়া একস্থানে জড় হইয়াছে। বক্তৃতার বিষয় ছিল, ‘বাঙলায় নারী নির্যাতন।’ 

জ্বালাময়ী বক্তৃতা সহযোগে বক্তা ছবির উপর ছবি দেখাইয়া চলিলেন। লুঙ্গিপরা মুসলমান গুণ্ডারা যুবতী হিন্দু মেয়েটিকে জোর করিয়া ধরিয়া লইয়া যাইতেছে। তাহার চিৎকারে আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ হইতেছে। একটি মেয়েকে টুকরো টুকরো করিয়া কাটিয়া ছালায় ভরিয়া মুসলমান গুন্ডারা নদীতে ফেলিয়া দিতে যাইতেছে, তেমনি নানারকম হৃদয়-বিদারক দৃশ্য। তারপর রাম-লক্ষণ ধনুর্বাণ লইয়া কি করিয়া রাবণকে সর্বাংশে নিধন করিতেছেন। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের দৃশ্য দেখাইয়া তারপর দেখাইলেন যে কি করিয়া ভীম-অর্জুন-নকুল-সহদেব দুর্যোধনকে নিধন করিয়াছিলেন। এই সব দেখাইয়া বক্তা তার শ্রোতৃমন্ডলী আহ্বান করিলেন, ‘হিন্দুগণ! প্রস্তুত হও। যেমন করিয়া ভীম-অর্জুন-নকুল দ্রোপদীর বস্ত্রহরণের প্রতিশোধ লইয়াছিলেন, যেমন করিয়া রাম-লক্ষণ সীতা হরণের পর রাবণকে সর্বংশে নিধন করিয়াছিলেন তেমন করিয়া আসুন আমরা মুসলমানদিগকে সর্বংশে নিধন করি।” 

– বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর সকলে যে যার মতো নিজ নিজ ঘরে ফিরে যায়, কিন্তু কবির মনে প্রচণ্ড রাগ ও বেদনা মিলেমিশে একাকার। রবীন্দ্রনাথের এই পবিত্র ভূমিতে হিন্দু মহাসভার বক্তা যে মিথ্যা নারী নির্যাতনের নামে একটি সম্প্রদায়কে একতরফা আক্রমণ করেন সেখানে কেউ কোনো প্রতিবাদ না করায় জসীমউদ্দীন খুবই হতাশ ও বিরক্ত হয়েছিলেন। পরদিন জসীমউদ্দীন এর উত্তর দিয়েছিলেন ―

“পৃথিবীতে এমন দেশ নেই যেখানে গুণ্ডা বদমাশ নেই। কিন্তু একজন মুসলমান গুণ্ডা একজন হিন্দু মেয়েকে হরণ করে নিয়ে গেছে এজন্য গোটা মুসলমান সমাজকে দায়ী করার কোন্ যুক্তি আছে বলতে পারেন? কাল কি শুনলেন বক্তার মুখে? রাম-লক্ষণ যেমন সীতা হরণের জন্য রাবণকে সর্বংশে নিধন করেছিল, দ্রৌপদী হরণের জন্য ভীম-অর্জুন দুর্যোধনকে নিধন করেছিল তেমনি মুসলিম ধ্বংসের জন্য বক্তা আপনাদের কাছে আবেদন জানালেন। এই যদি সমস্ত হিন্দু সমাজের মনোবৃত্তি হয় তবে কোন্ আকর্ষণের জোরে আমরা আপনাদের সঙ্গে এক হয়ে থাকব? আপনাদের হিন্দু সমাজে গুণ্ডা নেই? কলকাতার অসংখ্য প্রতিতালয়ে যারা দেহ ব্যবসার জন্য আসে তাদের এখানে কারা দিয়ে আসে? মুসলমানেরা না হিন্দুরা? 

দেশ ও মানুষকে ভালবেসেই সারাজীবন কেটেছে তাঁর। হিংসার বিরুদ্ধে, অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে, নির্যাতনের বিরুদ্ধে, অসাম্যের বিরুদ্ধে, অসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তিনি আপোষ করেননি কোনওদিন। অতএব, জসীমউদ্দীন মানে শুধুমাত্র পল্লীকবি নয়, একইসঙ্গে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বও বটে। সে কারণেই তিনি বলতে পারেন―

‘এ সোনার দেশে যতদিন রবে একটিও খান সেনা,

ততদিন মোদের যাত্রা মুহূর্তে থামবে না।’

 

কবিতা