এ মাসের জাতক

অদ্বৈত মল্লবর্মণ

জন্ম: ১ জানুয়ারি, ১৯১৪  মৃত্যু: ১৬ এপ্রিল, ১৯৫১

 

বিশ্বামিত্র চৌধুরী

 

“কাচড়াপাড়া হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে পড়ে আছি। যুদ্ধ করছি রাজরোগের সঙ্গে। পাশের বেডের রোগী সকলের প্রিয় আমাদের বর্মণদা। ছিপছিপে চেহারা। চোখ দুটোতে কোন্‌ সুদূরের দৃষ্টি। কথা বলেন ধীরে ধীরে সদা হাসি মুখে। দুরন্ত রোগের অসহ্য জ্বালার কোন প্রকাশ কোনদিন দেখিনি বর্মণদার চোখেমুখে। বই পড়া আর চিঠি লেখা—প্রতিদিনের তাঁর বাঁধা রুটিন।” স্মৃতিকথায় অমর মুখোপাধ্যায়। “প্রতিদিনই গোছা গোছা চিঠি” লিখতেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। মৃত্যুপুরী থেকে কার কাছে এইসব লেখালেখি? কোন আপনের কাছে ভাসিয়ে দেওয়া সেইসব শব্দযান?

না, একটা ছাড়া সেই মৃত্যুপুরী থেকে অদ্বৈত’র লেখা ‘গোছা গোছা’ চিঠির দ্বিতীয়টির হদিশ মেলেনি আজও। বড়ই অবহেলায় বুঝি-বা মহাশূন্যে মিলিয়ে গেছে তাঁর অনন্ত মৃত্যুব্যথাগুচ্ছ, ঠিক যেমনটি তিনি বাতাসে মিলিয়ে গেছেন একদিন, অজান্তে, অলক্ষ্যে, জলের দাগ মিলিয়ে যাবার মতোই।

“আমি এখনও হাসপাতালেই আছি। আরও কতদিন থাকিতে হইবে তাহার কোনও নিশ্চয়তা নাই। যতদূর মনে হয় আমি আরও এক বৎসর এই হাসপাতালেই থাকিতে পারিব। তারপর কোথায় যাইব ভগবান জানে।” ২৮ বৈশাখ ১৩৫৭ ( ইং মে ১৯৫০) তে গোকর্ণঘাটে ভ্রাতুষ্পুত্র চন্দ্রকিশোর-কে কাঁচড়াপাড়া যক্ষ্মা হাসপাতালের বি-৩ ওয়ার্ড থেকে অদ্বৈত’র লেখা চিঠি। তাঁর স্বদেশ তখন ঘোর বিদেশ। পোস্টকার্ডে ইংরেজি বড় হরফে অনন্তর হাতে লেখা ‘EAST PAKISTAN’! এমনটা লিখতে হাত কাঁপছিল কি তাঁর? রাজরোগে নয়, হঠাৎ দেশভাগের যন্ত্রণায়? অমরবাবু পাশের বিছানায় শুয়ে তেমন কিছু কি লক্ষ করেছিলেন কখনও? দেখেছিলেন কি পোস্টকার্ডের শরীর দু-একফোটা অশ্রু? তখন হঠাৎ-ই সবকিছু ওলট-পালট হয়ে-যাওয়া-মুহূর্তে লাখ লাখ উদ্বাস্তুদের ভিড়ে অদ্বৈতও বুঝি ষষ্ঠীতলার চিলোকোঠায় ‘পাকাপাকি’ উদ্বাস্তু। সেইসব উদ্বাস্তুদের ভিড়ে তিনি কি ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন ক্রমশ? হাসপাতালে আর-এক বছর থাকার কথা উল্লেখ পাই চিঠিতে। তারপর ‘ভাগবান জানে’! তিনি কি তবে জেনে ফেলেছিলেন তাঁর অমোঘ করুণ পরিণতি?

অনন্ত সেদিন বলল, ‘কল্যাণ আমার মরবার ইচ্ছে ছিল না। আমার যে অনেক কাজ বাকি, লেখা বাকি। যাত্রা যে সবে শুরু করেছিলাম।’

সেদিন আর ওকে মিথ্যা আশা দিলাম না। বললাম, ‘তুমি নিজের দোষেই তো এমন করলে। এভাবে আত্মবলি দিয়ে ক’জনের উপকার করা যায়। পরোপকারের এই অবৈজ্ঞানিক পথ তুমি কেন নিতে গেলে। প্রকৃতির নিয়ম তো একটা কথা আছেতাকে যদি তুমি না মানো, সে তার প্রতিশোধ নেবেই।’

                                                                            

হ্যাঁ, প্রকৃতি শোধই নিল।

পাঠক আর প্রকৃতির মতো প্রিয় বন্ধু ও শত্রু বুঝি আর কেউ-ই নয়! ঠিক তার পরের বছর ১৬ এপ্রিল ১৯৫১ তে অদ্বৈত সেই শব্দযান ছেড়ে মৃত্যুযানে চড়ে কলকাতার ষষ্ঠীতলার বাড়ি থেকে চলে যান। নীরবে জ্বলতে থাকে ক্ষীণকায় ‘শিখার রুমাল’। কোথায় গেলেন অদ্বৈত? ভগবান জানেন কি আদৌ সে-খবর? তিনি কি কখনও সেই মৃত্যুপুরী থেকে গোপনে ভগবান-কে চিঠি লিখে জানতে চেয়েছিলেন তাঁর আসন্ন বাসস্থান? জীবন আর মৃত্যুর মাঝে এ ভীষণ এক গোলমেলে প্রশ্ন! 

অদ্বৈত’র কথা উঠলেই ‘তিতাস’-এর কথা ওঠে, তাঁর উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। কথা ওঠে ‘তিতাস’-কে নিয়ে ১০ মার্চ ১৯৬৩ তে উৎপল দত্তের মিনার্ভায় নাটক, ‘যা অন্তত শতরজনী অভিনীত হয়’; কিংবা কথা ওঠে ১৯৭৩-এ স্বাধীন বাংলাদেশে (ভারতে এর প্রচার সীমাবদ্ধ ছিল) ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর, যা, বলা বাহুল্য, গোটা বিশ্বে এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। কোনও সন্দেহ নেই, ‘তিতাস’-কে নিয়ে সাধারণের মধ্যে এই এক দশকে ( ১৯৬৩-১৯৭৩) আগ্রহ তুঙ্গে। ছাপা অক্ষরের চাইতে স্থির বা চলমান দৃশ্যের প্রতি আমাদের মস্তিষ্কের পক্ষপাতিত্ব অনেক অনেক বেশি। অগত্যা জনভিড় ও শোরগোল সেদিকেই। এক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি নিশ্চয়ই। 

 ১৩৫২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ থেকে ১৩৫২ বঙ্গাব্দের মাঘ পর্যন্ত মোট সাতটি সংখ্যায় মাসিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় ‘তিতাস’ ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হতে থাকে, এবং সপ্তম কিস্তিতে লেখা হয় ‘ক্রমশঃ’, কিন্তু তারপর ‘তিতাস’ আর ছাপা হয় না। হ্যাঁ, কারণ ছিল। এই সীমিত পরিসরে সে-কথা আপাতত উহ্য থাকুক। চিন্তকেরা গ্রন্থিত ‘তিতাস’-এর বিভিন্ন সংস্করণের পাণ্ডুলিপির সঙ্গে ‘মোহাম্মদী’-র তিতাসের পাণ্ডুলিপির মধ্যে তুলনা করে সিদ্ধান্ত দেন, পূর্বের তিতাস ছিল নেহাতই ‘খসড়া’। এর মধ্যেই ‘তিতাস’-এর পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যাবার বিষয়টি বাতাসে ভাসে, যা আজও শোনা যায়। অচিন্ত্য বিশ্বাসের ভাষ্যে, “এই মিথ্যা গল্পটি কে প্রথম গড়েন জানি না— অদ্বৈতের অগ্রজ সুহৃদ, প্রকাশক, পুঁথিঘরের সত্ত্বাধিকারী, অধ্যাপক সুবোধ চৌধুরীর কিছু দায় ছিল নিশ্চয়ই।” ‘তিতাস’ গ্রন্থিত হয় ১৯৫৬ তে, অনন্তর মৃত্যুর পাঁচবছর পর। তাঁর কাঁচরাপাড়া যক্ষ্মা-হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নিয়েও মতান্তর আছে ঢের। তবু সুনীল দাসের সিদ্ধান্ত অদ্বৈত’র ১৯৪৮ তে ভর্তি না-ধরে ১৯৫০-এর প্রথম দিকে তাঁর ভর্তি ধরে নেওয়া হয়। আর এই যক্ষ্মা-হাসপাতালে যাবার আগে ও সুস্থ হয়ে ফিরে তিনি ‘তিতাস’-এর নতুন পাণ্ডুলিপি নিয়ে মেতে থাকেন। পুনরার অসুস্থ হলে, সেখানে তাঁকে পুনরায় ভর্তি করাতে হয়। এবারে মাঝে মাঝে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে এসে পাণ্ডুলিপিটি সম্পূর্ণ করতে থাকেন।

 ‘তিতাস’-ই কি তবে অদ্বৈত’র ‘রাজহংস-সংগীত’ (Swan-song)? গ্রিকপুরাণ অনুসারে সারাটা জীবন প্রায় নীরব থাকার পর মৃত্যুর ঠিক আগে রাজহাঁস সুন্দর এক গান ধরে। রূপক অর্থে, আজীবন অনালোকিত ও অপ্রতিভ থাকার পর বিদায়ের পূর্বে জ্বলে ওঠা, চমকে দেওয়া। তবে কি তিনি টের পাচ্ছিলেন মৃত্যুপোকা ধীরে ধীরে খুবলে নিচ্ছে তাঁর প্রাণ? কিংবা টের পাচ্ছিলেন শৈশব থেকে তাঁর মেধার প্রতি চরমতম সামাজিক অবহেলা? বুঝতে পারছিলেন কি স্বদেশ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা আত্মীয়-বন্ধু-স্বজনদের সাহায্য করতে-করতে ফুতুর হয়ে যাওয়া জীবনকে?

অদ্বৈত মল্লবর্মণের জীবনাশ্রয়ী গল্প নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘যাত্রাপথ’। গল্পটি ‘জনসেবক’-পত্রিকার পুজো সংখ্যায় ভাদ্র ১৩৫৯ বঙ্গাব্দে (ইং ১৯৫২) প্রকাশিত হয়, অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর একবছর পর। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ তখনও গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। প্রথমে গল্পটির নাম ছিল ‘যাত্রী’, পরে হয় ‘যাত্রাপথ’। গল্পটিতে অদ্বৈত’র নাম অনন্ত মালো। ‘তিতাস’-এও বালকের নাম ছিল অনন্ত।  নরেন্দ্রনাথ মিত্র-কে যেন এখানে আমরা জোসেফ কনরাডের ‘দ্য লেগুন’ গল্পের ‘হোয়াইট ম্যান’-এর ভূমিকায় দেখি, আর আর্সাৎ যেন অনন্ত মালো। তাহলে আর্সাৎ-এর স্ত্রী ডায়ামেলেন? অদ্বৈতের জন্মতারিখ, তাঁর মায়ের নাম কিংবা ‘তিতাস’-এর পাণ্ডুলিপিটি হারিয়ে যাওয়া মিথকথার মতোই তাঁর প্রেমিকারাও আলোআঁধারিতে আচ্ছন্ন। কারা তাঁরা? তাঁদের কেউ কি ‘যাত্রাপথ’-এর লক্ষ্মী, গীতা কিংবা ‘তিতাস’-এর ‘এক কায়স্থের কন্যা’? অথবা সে কি বাস্তবের কল্পনা দে রায়, যার স্বামী সন্দেহ করেই নিরুদ্দেশ হল? কল্পনা দেবীর পুত্র শৈলেন রায় সাক্ষাৎকার-মুহূর্তে অকপটে এই তথ্য অচিন্ত্য বিশ্বাস-কে দিয়েছেন। তাঁর কথায় এ নিছক তাঁর বাবার ‘সন্দেহ’। অদ্বৈতও এ-নিয়ে ছিলেন ঘোর নীরব। আর এখানেই দেখি ডায়ামেলেন নয়, অকালে ঝরে গেলেন অনন্ত মালো, গল্প ও বাস্তব থেকে।

‘তিতাস’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হল, অবশ্যই তাঁর মৃত্যুর পর। আখ্যাননির্ভর কিন্তু প্রথাগত উপন্যাস থেকে সরে আসা যৌগিক প্লটে লেখা ‘তিতাস’ শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়দের মতো উপন্যাসের সনাতন মতে বিশ্বাসী সমালোচকেরা চিমটি কাটতে ছাড়লেন না। কিংবা চিন্তার সংকীর্ণতার কারণে কোথাও যেন তাঁরা আটকে গেলেন। তবু শত চর জেগে উঠলেও ‘তিতাস’ পাঠকমনে বইতে থাকল অবিরাম। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোকর্ণঘাটের মালোপাড়ার বাসিন্দা অনন্ত মালো থুড়ি অদ্বৈত মল্লবর্মণ, যা ভদ্রলোকের কাছে গাবুরেপাড়া, অর্থাৎ শ্রমজীবীদের এলাকা। শ্রমিকদের প্রতি আজও ভদ্রলোকের এই বিদ্রুপ রয়েছে। তাহলে একশো বছর আগে এই বিদ্রুপ কেমন ছিল? একশো নয়, একশো পাঁচ। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার গেজেট অনুসারে অদ্বৈতের জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯১৪। কবি মতিউল ইসলাম সেই গেজেট ছাত্রাবস্থায় দেখেছিলেন, সে-কথা তিনি জানিয়েছিলেন শান্তনু কায়সার-কে। হতে পারে তা জানুয়ারি নয়, মে জুন কিংবা নভেম্বর। হতে পারে তা ১৯১৪ নয়, ১৯১৩ বা ১৯১৫। স্কুলে ভর্তির সময় ১ জানুয়ারি ১৯১৪ করে দিয়েছেন কেউ, সম্ভবত বিদ্যালয়ের কোনও শিক্ষক।  

ঘরের এক কোণে মুখ নিচু করে বসেছিল অনন্ত। মাস্টারমশাই গিয়ে তার পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘হারামজাদা, তোর হাতের জল খেলাম না কেবল তুই তাই দেখলি। আর খাতা শ্লেটে তোর হাতের লেখা দেখে আমি যে তোকে কোলে তুলে নিয়ে চুমু খেয়েছিলাম তা তুই এরই মধ্যে ভুলে গেলি। তোর ঘরের মধ্যে এক গ্লাস কেন এক কলসী জল এনে দে আমাকে, আমি তাই খাব। কিন্তু সমাজের সামনে কি করে খাই। তাহলে আমাকে যে পতিত করবে। কারো বাড়িতে পুজো-আর্চা করতে দেবে না। জানিস তো, যজমানী না করলে খালি মাস্টারীতে পেট ভরে না।

দারিদ্র, পারিবারিক অশিক্ষা, সামাজিক বর্ণবৈষম্য প্রভৃতি বৈরীর সঙ্গে কুস্তি লড়ে অন্তত কলেজ পর্যন্ত পৌঁছনো এবং শেষে সেই কলেজ ত্যাগ, এমনকী পূর্ববঙ্গও ত্যাগ।  ১৯৩৪-এ অদ্বৈত চলে আসে কলকাতায়। আমৃত্যু সেখানেই থাকে। এরই মাঝে আছে প্রিয় নারীর প্রতি ইচ্ছে-অনিচ্ছের দ্বন্দ্ব, পত্রিকা দপ্তরে অমানুষিক শ্রম, সীমাহীন দানশীলতা ও শেষমেশ হেরে যাওয়া শরীর। সাগরময় ঘোষের প্রচেষ্টায় যক্ষ্মা-হাসপাতালে ভর্তি হয় অদ্বৈত। একসময় ‘নবশক্তিতে’ সাগরময় ছিলেন অদ্বৈতর সহকারী, পরে অদ্বৈত ‘দেশ’-এ হন সাগরময়ের সহকারী।  

কবিতা লিখে আত্মপ্রকাশ করলেও কবিতা কখনও অদ্বৈত-কে উচ্চস্থান দিতে পারেনি। দিয়েছে ‘তিতাস’-ই। কিন্তু শুধু তাই নয়, তাঁর অন্য দুটি উপন্যাস ‘রাঙামাটি’ ও ‘শাদা হাওয়া’ কিন্তু উৎকৃষ্টমানেরই। এমনকী তাঁর এযাবৎ পর্যন্ত পাওয়া পাঁচটি ছোটগল্পের মধ্যে ‘কান্না’ ও ‘স্পর্শদোষ’ বিশ্বমানের। ‘স্পর্শদোষ’-এ কাগজকুড়ুনি ভজার খাবারের দখলদারি নিয়ে কুকুরের দিকে কুকুরের মতো চার হাত-পায়ে খেঁকিয়ে যাওয়া আর কুকুরের ভয় পেয়ে পালানো, আর শেষে সেই কুকুরটি দুর্ঘটনায় মারা গেলে ভজার কোলে তুলে নেওয়া দৃশ্যটি যে-কোনও আফ্রিকাদেশের আধুনিক গল্পকে মনে করায়। ‘কান্না’ গল্পে পাঠকের মনে অদ্বৈত চরম প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন। কুরূপা স্ত্রীর মৃত্যুতে কেন কান্নায় ভেঙে পড়ল গুরুদয়াল? স্ত্রীর মৃত্যুই তো চাইছিল এতদিন সে। গল্পকারের ভাষ্য:

গুরুদয়াল আঁখির জলে ভিজিয়া ভিজিয়া যেন বলিতে থাকে, মরিলে তো কিন্তু আর ক’টা দিন আগে কেন মরিলে না।

সত্যিই কি তাই?’  

তাই তো? সত্যিই কি তাই? কারণ এই কুরূপা স্ত্রীকে ফেলে তো সে ওই বিধবার বিবাহরাতে যেতে পারেনি, সে যে-কারণেই হোক না কেন। তাহলে কান্নার মনস্তাত্বিক ব্যাখ্যাটা কী?

তাই শুধু ‘তিতাস’-এ নয়, আমাদের তো ডুব সাঁতার দেওয়া দরকার অদ্বৈতর অন্য দুটি উপন্যাস ও পাঁচটি গল্পে; এছাড়া একটি অনূদিত উপন্যাস ও বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ-আলোচনায়।

        মহানগরে হঠাৎ আগত ভজার মতো উদ্বাস্তুরা যখন পথেঘাটে দুটো খাবারের জন্য হাহাকার করছে, ঠিক তখনই এক বৈশাখী রাতে অদ্বৈতের চিরবিদায়! তখন কি অদ্বৈত’র ‘গোছা গোছা’ চিঠির প্রাপকেরা বৈশাখী ঝড় উঠতে দেখেছিল সেই রাতে আচম্বিতে? ঝড়েই কি উড়ে ‘গেল গোছা’ গোছা চিঠি? খসে পড়ল বাক্য-অক্ষর-বর্ণ কলকাতার পথে-ঘাটে? অক্ষর বর্ণে ভজারা বুঝি বোঝেনি অদ্বৈত’র চিরবিদায়। তখনও তাঁরা সামান্য খাবারের জন্য ঘেউ ঘেউ করে যায়।

       তবু মৃত্যুর পর অদ্বৈত’র স্মরণসভায় লেখক-পাঠকের ঢল নামেনি। তাঁরা তো নেহাত হাতেগোনা দশ-বারোজন ছিল না। অদ্বৈত আসলে ভজাদের লেখক ও লোক ছিল। অনালোকিত একজন, মুষ্ঠান্নে নির্লিপ্ত একজন। আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগের ঘটনা, ১৮২১ সাল, ‘সোয়ান-সং’ লেখার পর প্রিয় বন্ধুকে যক্ষ্মা-আক্রান্ত জন কিট্‌স জানিয়ে গেল সে যেন তাঁর অ্যাবি-স্টোনে লেখে, ‘এখনে একজন মানুষ শুয়ে আছে যার নাম জল দিয়ে লেখা’। ঠিক পঞ্চাশ-পচ্চান্ন বছর পর হল তার উলটোটা। মহাকবিরা বুঝি এমনই হন, নিজেকে নিয়ে কেবলই মহাজাগতিক ঠাট্টাতামাশায় মেতে থাকেন! বিদেশী সাহিত্যে অনুরাগী অদ্বৈত নিশ্চয়ই কিট্‌সের এই ঠাট্টাটা জানতেন। 

অতবড় লাইব্রেরী হলে মাত্র জনকয়েক জমেছে। এদের বেশির ভাগই অনন্ত’র বিভিন্ন অফিসের সহকর্মী বন্ধু। সভাপতি ঘড়ি দেখলেন, সঙ্গে সঙ্গে আমরাও। ছটা বেজেছে। কিন্তু গুণতিতে তখনো বারজনের বেশি লোক হয়নি।

কিন্তু তাতে কি? মহাকালের ঠাট্টাটা আছে না! তাই তো তিনি নিজের আকাঙ্খার বিষয়ে নির্বিকার।

 

রবিবার সন্ধ্যার পরে আমরা গেলাম। গিয়ে দেখিঘরটা অন্ধকার। অনন্ত চুপচাপ গম্ভীরভাবে বসে আছে।

বললাম, ‘ব্যাপার কি অনন্ত, তোমার উপন্যাস কি অন্ধকারেই পড়া যাবে নাকি আজ?’

আমাদের সাড়া পেয়ে অনন্ত আলো জ্বালল। আমরা চম্‌কে উঠে দেখলামটুকরো ছেঁড়া কাগজের এক বিরাট স্তূপ অনন্ত সামনে করে বসে রয়েছে।

বললাম, ‘একি অনন্ত।’

অনন্ত একটু হাসল, ওই তো উপন্যাস।’

খানিকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে থেকে বললাম, এ দশা হল কি করে।’

অনন্ত জবাব দেওয়ার আগেই মলুঙ্গী তিন-চার বছরের একটি ছোট ছেলের কান ধরে টানতে টানতে পাশের ঘর থেকে বেরোল।

‘ওই করেছে ছোট কর্তা, এ ওরই কীর্তি।’

অনন্ত ধমক দিয়ে বলল, ‘ফের তুমি ওর গায়ে হাত তুলেছ দিদি? দেখ তো ওর গায়ে তিল ফেলবার জায়গা আছে নাকি আর?’

চেয়ে দেখলাম ঠিকই। ছেলেটির সর্বাঙ্গ লাঠির দাগ কালো হয়ে উঠেছে।

অনন্ত ওকে সস্নেহে কোলে তুলে নিয়ে বলল, “তুমি ঠিক করেছ মামু, তুমি ঠিক করেছ। ভাবীকালের হাতে আমাদের অনেকের মূল্যই তো এই

হ্যাঁ, ভাবীকালের হাতে আমাদের অনেকের মূল্য এমনই।

এই তো অনন্ত মালোর গল্প, কিংবা গল্প হলেও সত্যি।

 

( বাঁকা-হরফে উদ্ধৃত ‘যাত্রাপথ’-এর বিশেষ-বিশেষ অংশ। সমস্ত উদ্ধৃতাংশের বানান অপরিবর্তিত।)

ঋণ:

১. অচিন্ত্য বিশ্বাস সম্পাদিত ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচনাসমগ্র’, দে’জ, ২০০০

২. অদ্বৈত মল্লবর্মণ, অচিন্ত্য বিশ্বাস, সাহিত্য অকাদেমি, ২০১৪

৩ জন্মশতবর্ষে অদ্বৈত মল্লবর্মণ, শান্তনু কায়সার

৪ উপন্যাস প্রসঙ্গে, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর ভূমিকা, দে’জ, ২০১৮

৫ নরেন্দ্রনাথ মিত্র ‘যাত্রাপথ’, গল্পমালা, আনন্দ, ১৯৯৯